ট্রাম্প-বাইডেন শেষ বিতর্ক

আগের সংবাদ

শিক্ষায় ফেরার চেষ্টা

পরের সংবাদ

দুর্নীতির খবর: বিচক্ষণ সায় প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২০ , ১০:৩৮ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০২০ , ১০:৩৮ অপরাহ্ণ

বড় বড় প্রকল্পে বিশাল বিশাল চুরির খবর ফাঁসে তাৎক্ষণিক বিব্রতকর অবস্থা হলেও সরকারের মোটাদাগে লোকসান হয়নি। বাধা দিলে বা আটকাতে চাইলে বরং বড় ক্ষতি অনিবার্য হতো। সব প্রতিষ্ঠানেই দুর্নীতি হয় প্রকৃত তথ্য গোপনের মধ্য দিয়ে। সেটা প্রকাশ হলে দুর্নীতি-চুরিতে বাধা পড়ে। আটকাতে চাইলে আরো বেশি প্রকাশ পায়। বিকৃতও হয়। কারণ তথ্যের ধর্মই হচ্ছে প্রকাশ পাওয়া। গোপন না থাকা। সুযোগ পেলেই সামনে চলে আসে। সেই বিবেচনায় দুর্নীতির খবর প্রকাশে গণমাধ্যমের প্রতি উদার মানসিকতায় বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

দুর্নীতির কোনো তথ্য ধামাচাপা থাকুক, তা চান না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর সরকার সমালোচনায় পড়ে, সরকারি দলের লোকদের দায়ী করা হয় এই বাস্তবতাও জানেন তিনি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) রজতজয়ন্তীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা জানান। সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ উল্লেখ করে এই দর্পণটাকে স্বচ্ছ রাখার তাগিদ এসেছে তার বক্তব্যে।
উপরোক্ত কথাগুলোর মধ্যে গণমাধ্যমের প্রতি তার আস্থা এবং সহিষ্ণুতার ছাপ মেলে। এর বিপরীতে আরেক বাস্তবতা হলো সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমগুলো একটা নিদানকাল পার করছে। করোনার জেরে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলো অস্তিত্ব ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টায় কাহিল। সাংবাদিকদের ঝুঁকি বেড়েছে। যোগাযোগ কমেছে। সোর্সের কার্যকারিতা কমে গেছে। কখনো কখনো ক্রস চেকের সুযোগও থাকছে না। এতে তথ্যপ্রবাহে নির্ঘাত বাধা পড়ছে। গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের জন্য এটা নতুন অভিজ্ঞতা। কষ্টের মাঝেও প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের কাছে কঠিন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। সেই পরীক্ষায় পাস করে উতরে উঠতে হচ্ছে। করোনা ঝড় বাদ দিলেও বিশ্বজুড়ে নানা বাস্তবতার শিকার গণমাধ্যম। সংবাদপত্র জগতে এ বাস্তবতাটা আরো কঠিন। সরকারি বিজ্ঞাপন কমতে কমতে ‘নাই’ হওয়ার দশায়। ডিজিটাল মাধ্যমের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপন থেকে সংবাদমাধ্যমের আয় কমার শুরু। আর বিজ্ঞাপনই সংবাদপত্রসহ সংবাদমাধ্যমের আয়ের বৃহত্তম বা প্রধান উৎস। এর মাঝেই এলো করোনার হানা। তার ওপর পাওয়া যাচ্ছে না সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে জমে থাকা বকেয়া বিল। পত্রিকাগুলোর অফিস ভাড়া, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বেশ কিছু পত্রিকা বাধ্য হয়েছে জনবল কমাতে। কিন্তু বাদবাকি খরচ কমানোর পথ নেই। এরই মধ্যে কয়েকটি পত্রিকা প্রিন্ট সংস্করণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
গোটা বিশ্বের পরিস্থিতিটা কম-বেশি এমনই। দেশে দেশে বহু পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে এই করোনার তোড়ে। চাকরি হারিয়েছেন হাজার হাজার সাংবাদিক। নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বাংলাদেশসহ কোনো দেশে সংবাদপত্রশিল্পকে টিকিয়ে রাখার বিকল্প এখনো আবিষ্কার হয়নি। সরকারকে বিবেচনায় নিতেই হবে এ শিল্প ও পেশাটির বিশেষত্ব সম্পর্কে। সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যমকে এমনি এমনি জাতির আয়না বলা হয়নি। আয়নায় নিজের চেহারা প্রতিবিম্বিত হয়। দেশ, জাতি, সমাজ এমনকি সমকালীন বাস্তবতার প্রতিবিম্ব পড়ে গণমাধ্যমে। সংবাদপত্র যে প্রকৃত পক্ষে ‘ফোর্থ স্টেট’ এ ধারণাটিও মূলত শতাব্দী পুরনো। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গ্যালারিতে উপস্থিত সংবাদপত্র প্রতিনিধিদের লক্ষ করে রাষ্ট্র কাঠামোতে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বোঝাতে এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন, তারা এই রাষ্ট্রের ‘ফোর্থ স্টেট’। তাই চলমান জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিহার্য। সংবাদপত্র পৃথিবীকে মানুষের মুঠোর মধ্যে দিয়েছে। একই সঙ্গে করেছে দায়বদ্ধও। সেই দায়বদ্ধতা থেকে পিছু হটার সুযোগ নেই কোনো গণমাধ্যমেরই। নিজ দেশের সঙ্গে অন্য দেশের এবং গোটা বিশ্বের করোনার ভয়াবহতা তথ্য দিতে হচ্ছে তাদের।
এই কঠিন সময়ে মিডিয়াকে বন্ধু না ভাবলে, সহায়ক মনে না করলে ঝুঁকি বাড়বে এই বোধ রাখতেই হবে। কোনো সরকারের পক্ষেই সব তথ্য জানা সম্ভব নয়। তা তথ্যের জন্য সরকারের নিজস্ব বিভাগ থাকলেও। সচরাচর রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনো সরকারই দুর্নীতির তথ্য আটকে রাখতে চায়। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি সেটা চান না। সত্যি বলে থাকলে এর একটা সুফল তিনি পাবেনই। পাচ্ছেনও।
বড় বড় প্রকল্পে বিশাল বিশাল চুরির খবর ফাঁসে তাৎক্ষণিক বিব্রতকর অবস্থা হলেও সরকারের মোটাদাগে লোকসান হয়নি। বাধা দিলে বা আটকাতে চাইলে বরং বড় ক্ষতি অনিবার্য হতো। সব প্রতিষ্ঠানেই দুর্নীতি হয় প্রকৃত তথ্য গোপনের মধ্য দিয়ে। সেটা প্রকাশ হলে দুর্নীতি-চুরিতে বাধা পড়ে। আটকাতে চাইলে আরো বেশি প্রকাশ পায়। বিকৃতও হয়। কারণ তথ্যের ধর্মই হচ্ছে প্রকাশ পাওয়া। গোপন না থাকা। সুযোগ পেলেই সামনে চলে আসে। সেই বিবেচনায় দুর্নীতির খবর প্রকাশে গণমাধ্যমের প্রতি উদার মানসিকতায় বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয় করোনার ভ্যাকসিন কেলেঙ্কারি, ক্যাসিনো কাণ্ডসহ নানা ঘটনায় এ খরা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে পাঠক, দর্শক, শ্রোতা মহলে। কোনো প্রচার মাধ্যমই এ সংক্রান্ত আগাম তথ্য দিতে পারেনি। সম্রাট, খালিদ, পাপিয়া, সাহেদ, সাবরিনাদের র‌্যাব বা পুলিশ ধরার পর তারা খবর দিয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্রিফিং বা প্রেস রিলিজ প্রচার করেছে। গণমাধ্যমের এ দৈন্য অডিয়েন্সের নজর এড়ায়নি। তারা এক সময় দেখেছেন, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অ্যাকশন বা অভিযানে যায়। কিন্তু হালে দেখা যাচ্ছে অভিযানের পর সংশ্লিষ্টদের ব্রিফিং অনুযায়ী ধরপাকড়ের তথ্য প্রকাশের ঘটনা। এ ধরনের একটি ঘটনা নিয়েও কোথাও আগাম খবর আসেনি। এক্ষেত্রে সরকার বা কোন মহল থেকে বাধা ছিল? এখন পর্যন্ত সেই ধরনের তথ্য নেই। বরং আগাম তথ্য থাকলে পরিস্থিতি এতদূর নাও গড়াতে পারত। দুষ্টচক্র হয় দমে যেত, নইলে আরো আগেই ধরা পড়ত।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়