রৌমারীর সীমান্ত দিয়ে ধানের বীজ পাচার

আগের সংবাদ

এবার জায়েদ খানের সদস্যপদ স্থগিত

পরের সংবাদ

মার্চের আগে স্কুল কলেজ খোলা নয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২০ , ৮:৫৩ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০২০ , ৯:০০ অপরাহ্ণ

আসন্ন শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে এমন আশঙ্কাই করছে বিশেষজ্ঞ মহল। আমরাও ভাবছি শীতেই হয়তো করোনা তার দ্বিতীয় ছোবল শানিয়ে নিয়ে আমাদের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। শীত আসতে খুব বেশি দেরিও নেই। তাই শঙ্কা ও আশঙ্কার এক প্রকার দোলাচল আমাদের মনের মধ্যে সর্বদাই সক্রিয়। এই দোলাচল উপেক্ষা করার যৌক্তিক কিংবা বৈজ্ঞানিক কোনো সমাধান এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। তাই অপেক্ষার কোনো বিকল্পও দেখছি না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সে অপেক্ষা যে মধুর নয় তা জেনেও অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ব্যাপারে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কাম্য নয়, হতেও পারে না। তাই দ্বিতীয় ঢেউ পার করার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সব মহল সিদ্ধান্ত নেবে আশা করি।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউজনিত আশঙ্কার আভাস এবং সেইসঙ্গে কিছুটা সতর্কতামূলক অবস্থান গ্রহণের লক্ষ্যে স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে আমাদের আরো কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কিছু কিছু সংবাদ মাধ্যম শিক্ষার ক্ষতি হচ্ছে বলে স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য আকারে-ইঙ্গিতে অনেকটা ‘প্রোভোক’ করেই যেন তাদের ‘খবর’ তৈরি করছেন। তারা তাদের প্রশ্ন কিংবা সংবাদ পরিবেশনাকালীন উপস্থাপনাটাও এমন ‘তির্যক’ভাবে করেন যেন ‘রাজ্যের ক্ষতি’ স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার কারণেই ঘটে যাচ্ছে! আমরা একটু চোখ ফিরিয়ে বিগত মার্চের মধ্যপর্বের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব এরাই তখন স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন দ্রুত বন্ধ হচ্ছে না, কেন এইচএসসি পরীক্ষা পেছানো হচ্ছে না সেজন্য সমালোচনামূলক খবর পরিবেশনায় মুখর হয়ে উঠেছিল। সুতরাং সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেখে, শুনে, বুঝে! এক্ষেত্রে আমাদের সামনে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আছে। উন্নত দেশগুলোতে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ায় ভালো পরিণতি দেখেনি। সেদিকে তাকিয়ে ধীরেসুস্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নেয়াটাই যথার্থ হবে বলে বিশ্বাস করি। করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ না দেখে কিংবা বলা যায় মোকাবিলা না করে আমরা সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখারই পক্ষপাতী। যেহেতু করোনা ভাইরাসের সঙ্গে শীতের আপাতত একটা ‘সখ্য’ আছে বলে আমরা বিশেষজ্ঞ মহল থেকে বারবারই ধারণা পাচ্ছি সুতরাং পুরো শীতকালটা দেখে আমরা স্কুল-কলেজ খোলার প্রস্তুতি নেব। এরকমই একটি সিদ্ধান্ত জরুরি। তাহলেই ছাত্র ও অভিভাবকরা এক ধরনের স্বস্তির মধ্যে থাকবেন এটা নিশ্চিত। মানসিক এবং শারীরিক উভয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বস্তির বিকল্প নেই। আমরা আমাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে আগামী আরো কয়েকটি মাস না হয় অপেক্ষা করলাম!

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে, করোনার কারণে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত গতানুগতিক পদ্ধতির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। আর কিছুদিন আগে ঘোষণা করা হয়েছিল এবার এইচএসসি পরীক্ষাও সম্ভব নয়। জেএসসি এবং এসএসসির নম্বরের ওপর ভিত্তি করে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হবে। আর তা করা হবে ডিসেম্বরের মধ্যেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণা থেকে আমরা ধরেই নিয়েছি এইচএসসির ফলাফল এক প্রকার প্রকাশিতই হয়ে গেছে! তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়েও শুরু হয়ে গেছে পরিকল্পনা, তর্ক-বিতর্ক! শুরু হয়ে গেছে নানারূপ আলোচনাও। ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে এসব আলোচনা গণমাধ্যমকেও সরব করে তুলেছে। কারণ অনলাইনে পরীক্ষা হবে নাকি অফলাইনে পরীক্ষা হবে তাই নিয়ে ঝড়ো আলোচনার অন্ত নেই!

অনলাইনে এবং দ্রুত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের জন্য একদল পণ্ডিত তাদের মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন! হ্যাঁ, সন্দেহ নেই বাংলাদেশ ডিজিটাল হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ডিজিটালমুখী হয়ে ওঠার চেষ্টায় আছে বাংলাদেশ- সুস্থ মস্তিষ্কে বড়জোর এ পর্যন্তই বলা যায়। মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশ এখনো সর্বস্তরে দক্ষভাবে ডিজিটাল হয়ে উঠেনি। তাই ভর্তি পরীক্ষার মতো ব্যাপক জনসম্পৃক্ত একটি বিষয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমান লেখক অনলাইনে কিছু ক্লাস নিয়েছেন। ফলাফল উল্লাস বোধ করার মতো কিছুই নয়- তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত থাকা যায় মাত্র! অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থী উপস্থিতির করুণ চিত্র আমাকে হতাশই করেছে। অনেক শিক্ষকই অনলাইন ক্লাসের শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়ে হতাশ। এই উপস্থিতি শুরুর দিকে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এমন অবস্থায় ‘ঢাকঢোল’ পিটিয়ে এমন অনলাইন ক্লাস গ্রহণের যুক্তি খুঁজে পাওয়াও কঠিন বলে মনে হয়েছে। উপরন্তু ক্লাস চলাকালীন নেটওয়ার্ক সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়পক্ষকেই বিব্রত করেছে। তাই বিদ্যমান নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করলে তা ‘জগাখিচুড়ি’র অতিরিক্ত কিছু হবে বলে মনে করি না। অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের পক্ষে মতামত দিতে গিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে একটি গোষ্ঠী। এরা নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ‘খুশি’ করছেন তা স্পষ্ট! কিন্তু বাস্তবসম্মত কথা বললে প্রধানমন্ত্রী ‘অখুশি’ হবেন এটা আমরা মনেও করি না, বিশ্বাসও করি না। বাস্তবতা পরিহারের মাধ্যমে হুজুগের বশে ভর্তি পরীক্ষার মতো একটি বিষয় নিয়ে ছেলেখেলা না করাই বিধেয় বলে বিবেচনা করি।

এখন আমরা আসি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের নিয়মিত পরীক্ষার ব্যাপারে। আমাদের কৌত‚হল হয় বিগত ৮ মাসে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়টি বিভাগে কয়টি নিয়মিত পরীক্ষা অনলাইনে (কিংবা অফলাইনে) গ্রহণ সম্ভব হয়েছে? সীমিতসংখ্যক নিয়মিত শিক্ষার্থীর পরীক্ষাই যখন আমরা নিতে পারিনি তখন আমরা অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার নেয়ার আগ্রহে আধাজল খেয়ে লেগে পড়েছি! কিন্তু কেন? ৮ মাসে কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পরীক্ষাই যেখানে গ্রহণ সম্ভব হয়নি তখন সেখানে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে মহলবিশেষের তুমুল আগ্রহ আমাদের হতাশ করে। কেউ কেউ হয়তো যুক্তি দেখাবেন এবং সেশন জট নিরসনের মহৎ মহৎ কথাও বলবেন! কিন্তু মনে রাখতে হবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত পরীক্ষাসমূহই অনলাইনে (বা অফলাইনেও) অনুষ্ঠান করতে পারছে না। আমাদের উচিত সর্বাগ্রে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের নিয়মিত স্নাতক সম্মান এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষাসমূহ গ্রহণ করে ডিগ্রি প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারে প্রেরণ করা। তাদের শূন্যস্থান পরবর্তী স্তরের শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পূরণ করবেন। কিন্তু রহস্যজনক দুঃখের বিষয়, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ থেকে স্নাতকোত্তর শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে (কোনো কোনো শিক্ষাবর্ষে আবার একাধিক ব্যাচও থাকে!) শিক্ষার্থীদের ধরে রেখে অতিরিক্ত আরেকটি ব্যাচ ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু করায় অনেকেই বেশি মনোযোগী! এরূপ ভর্তির অর্থ আসলে সেশন জটকে আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করা মাত্র! তাই আমরা বলতে চাই প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পরীক্ষাসমূহ (বিশেষ করে স্নাতকোত্তর) আগে শেষ করার ব্যবস্থা নিন তারপর ভর্তি পরীক্ষায় মনোযোগ দিন। আর এই ফাঁকে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের নিষ্কণ্টক ও নির্ভেজাল পদ্ধতি আবিষ্কার করুন। তারপরও বিশেষ অনুরোধ থাকবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই যেন করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ শেষ হওয়ার আগে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণে ঝাঁপিয়ে না পড়ে! এমনো যদি হয়ে থাকে যে, ইতোমধ্যেই আমরা দ্বিতীয় তরঙ্গও অতিক্রম করে চলে এসেছি তবু মার্চের আগে যেন কোনোরূপ ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ না করি, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেন না খুলি। আর এর মধ্যে কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন যদি বাজারে চলে আসে তবে তো কথাই নেই!

পুনশ্চ : শিক্ষার্থীদের সময় বা বয়স নষ্ট হচ্ছে বলেও অনেকে আক্ষেপ করেন। এটি তো অস্বীকারের কোনো উপায়ই নেই। কিন্তু সবারই যখন একই দশা তখন হতাশার জায়গাটিও সংকুচিত হওয়া জরুরি। কেউ তো কাউকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে না- সবাই যে যার জায়গায় স্থির আছে। এই বাস্তবতা না মানলেই বরং হতাশা বাড়বে। উপরন্তু দুঃখভার লাঘবের কোনো অবকাশও তৈরি হবে না। কিন্তু সান্ত্বনা খুঁজলে হয়তো এ বিষয়ে তারও অভাব হবে না। এমন এক প্রকারের সান্ত¦নায় আমরা মোটামুটি কনভিন্সড যে, আমাদের গড় আয়ু বেড়ে ৭২ অতিক্রম করেছে! ‘গড় আয়ু’ বিষয়টি যখন তেমন কিছুই বুঝতাম না তখন ছোটবেলায় শুনেছি আমাদের গড় আয়ু ৪৯ বা ৫০ বছর! সেই গড় আয়ু এখন ৭২ বছর অতিক্রম করেছে, ভাবা যায়! সেই ৭২ বছরের মধ্য থেকে একটি বছর না হয় করোনার কারণে নষ্টই হলো! প্রকৃতির কাছে এই পরাজয় মেনেই বা নিই না কেন? এর মধ্যে মানুষের কোনো হাত নেই! এ পরাজয়ে তাই গ্লানিও থাকার কথা নয়। একবার পরাজয় বরণের মধ্য দিয়ে আমরা জয় করব অনন্ত প্রকৃতিকে। হয়তো সেই দিন বেশি দূরেও নয়।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়