সিলিন্ডারের গ্যাসের আগুনে একই পরিবারের আটজন দগ্ধ

আগের সংবাদ

সুবর্ণজয়ন্তীতেও পালন করা হবে মুজিববর্ষের কর্মসূচি

পরের সংবাদ

তৃণমূলে বাড়ছে কোন্দল

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২০ , ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০২০ , ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন ও স্থানীয় নির্বাচন।
সামাজিক মাধ্যমেও চরিত্র হনন, বিষোদ্গার।
কঠোর হস্তে দমনে হাইকমান্ডের নির্দেশ।

টানা ৩ মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিজেরাই এখন নিজেদের প্রতিপক্ষ। বিশেষ করে দলীয় কাউন্সিল, কমিটি গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পদ ও মনোনয়ন প্রত্যাশীরা জড়িয়ে পড়েছেন পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়িতে। একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে চরিত্র হনন- এমন কি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সংবাদ সম্মেলন-মানববন্ধনের মতো প্রকাশ্য কর্মসূচি পালনেও দ্বিধাবোধ করছে না। আছে মারামারি-খুনোখুনিও। এতে ক্ষতি হচ্ছে দলের ভাবমূর্তি। সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জন্ম নিচ্ছে নেতিবাচক ধারণা। এ নিয়ে অনেকটাই উদ্বিগ্ন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে গিয়ে বিরোধে জড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। একে অন্যের চরিত্র হনন করছেন। ফলে কেন্দ্র থেকে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও সময়মতো পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা দিতে পারছেন না অনেকেই। আবার বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক জেলায় দুটি করে কমিটির তালিকা তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। অনেক কমিটিতে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জায়গা না দিয়ে নিজেদের লোক দিয়ে কমিটি গঠনের অভিযোগও রয়েছে। তার ওপর সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এতে প্রার্থী হতে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছেন নেতারা।

একেকটি পৌরসভা ও ইউনিয়নে গড়ে ১০ জনের বেশি মেয়র ও চেয়ারম্যান প্রার্থী রয়েছেন। প্রত্যেকেই দলীয় মনোনয়ন পেতে চান। আর এ জন্য নিজ দলের প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীর এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান দলীয় মেয়র ও চেয়ারম্যানেরও দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করে তা প্রচার করছেন। কেউ কেউ সংবাদ সম্মেলন করছেন। মানববন্ধন করছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইক আইডি খুলে নানা অপপ্রচারও চালাচ্ছেন। তুলে ধরছেন পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা কুৎসা। দুর্নীতিবাজ, গডফাদার আখ্যা দিয়ে এবং গুরুতর অভিযোগ সামনে এনে একে অন্যকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন। আর এসব ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সভায়ও আলোচনা হয়েছে একাধিকবার।

এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলটির কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও মূল আলোচ্য বিষয় ছিল মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের বিষয়টি। ওই সময়ে কয়েকটি জেলার বেশ কয়েকজন নেতাকে কারণ দর্শানোরও নোটিস দেয়া হয়েছিল।

বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। জেলা, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনেকটা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে রূপ নেয়। নিজেদের মধ্যে সংঘাতে প্রাণ দিতে হয়েছে অনেককেই। এর বেশির ভাগই নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের জেরে খুন হয়েছেন।

এবারো চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ২৩৪টি পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। এছাড়া বছরের কোনো না কোনো সময় জেলা, উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদের কিছু কিছু নির্বাচন তো অনুষ্ঠিত হচ্ছেই। গত মেয়াদ থেকে প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ দলের প্রতীকে অংশ নিচ্ছে নির্বাচনে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, গণমাধ্যমে যেভাবে বিরোধের কথা তুলে ধরা হয়, প্রকৃতপক্ষে সেটা সারাদেশের চিত্র নয়। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে- এটা আমরা অস্বীকার করছি না। আওয়ামী লীগের মতো বড় দলে প্রতিযোগিতা আছে বলেই গণতন্ত্র আছে। আর এই প্রতিযোগিতার সুযোগে একে অপরের বিরুদ্ধে খারাপ কথাও বলছে। যা হচ্ছে, এটাও না হওয়া উচিত। দলের মধ্যে যারা ভালো জায়গায় যেতে চান, তাদের আরো বেশি সংযত ও ধৈর্যশীল হওয়া উচিত।

সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, নেতাকর্মীদের মধ্যে একে অপরের চরিত্র হননের খেলা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটা দূর করতে হবে। এ জন্য আমরা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়াচ্ছি। আওয়ামী লীগ করতে হলে দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে। কাউকেই বেপরোয়াভাবে চলতে দেয়া হবে না। এ বিষয়ে আমরা অত্যন্ত সতর্ক, সচেতন এবং সজাগ।

দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, তৃণমূলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধ নয়, প্রতিযোগিতা। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাচ্ছে। এ দলে প্রতিযোগিতা আছে, থাকবে। কখনো কখনো বিচ্ছিন্নভাবে বেশি মাত্রায় দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ভেতরে থেকে প্রয়োজনে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন কাজে লাগিয়ে দলের শৃঙ্খলা ও পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা-সহমর্মিতা-সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের বন্ধন বাড়িয়ে দলকে শক্তিশালী করা হবে। তিনি বলেন, আমরা সবসময় ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে এনেছি। এখনো সম্ভব। বিদ্যমান সংকটও আমরা দূর করতে সক্ষম হব।

এতে অপরের চরিত্র হনন সম্পর্কে তিনি বলেন, হ্যাঁ এই ধরনের ঘটনা ইদানীং বেশি হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা আমরা পজেটিভ অর্থে খুব একটা ব্যবহার করছি না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে চরিত্র হননের প্রক্রিয়া এটা বিশ্বের অন্য কোথাও নাই। আমাদের দেশে শুরু হয়েছে। এতে ক্ষতির সম্মুখীন আমরা হচ্ছি। সমাজের অস্থিরতা বাড়ছে। বাড়ানো হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েছে। তবে একটা সময় এগুলো থাকবে না। আমরা এসব নিরসন করতে পারব।

দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক বলেন, আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীরা কোনো কোন্দলে জড়ায় না। যারা অনুপ্রবেশকারী, সুবিধাবাদী এবং অবৈধভাবে অর্জিত অঢেল টাকা-পয়সার মালিক। তারা প্রকৃত আওয়ামী লীগারদের চরিত্র হনন করে দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টির চেষ্টা করছে। প্রকৃত কর্মীদের সরিয়ে দিয়ে নিজেরা জায়গা করে নেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। এরাই দলটাকে ক্ষত-বিক্ষত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আমরা এসব সমস্যার সমাধান করব।

আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, মাঠে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দৃশ্যমান না থাকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে আমরা চিন্তিত। আমরা চেষ্টা করছি, এই বিরোধ যেন রেষারেষির পর্যায়ে না যায়। বরং অধিকতর জনসেবা করে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা যেন জনগণের অধিক সমর্থন লাভ করতে পারেন। জনসেবা ও জন-আস্থার প্রতিযোগিতা হোক।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close