কোষাধ্যক্ষ ছাড়াই চলছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আগের সংবাদ

পূজা আছে, উৎসব কি আছে?

পরের সংবাদ

স্মৃতির দুর্গাপূজা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ৭:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ৭:১৭ অপরাহ্ণ

শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন বাঙালির একটি বড় ধর্মীয় উৎসব। পূজাটি বসন্তকালে প্রাগৈতিহাসিক সময়ে মুনিঋষিগণ বৈদিক মতে করতেন। পরে রাজা জমিদার বা বিত্তবানরা পারিবারিকভাবে এই পূজা করতেন রাজকীয়ভাবে। এখন অবশ্য প্রায় ক্ষেত্রেই সার্বজনীন পূজা সবাই মিলিতভাবে করে থাকে। শরৎকালে স্বয়ং রামচন্দ্র রাবণকে বধ করার জন্য অকালে মা দুর্গার পূজা করেছিলেন বলে একে অকাল বোধনও বলা হয়।

এই অকাল বোধনই এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মূলত কাশফুলের মতো শরতের স্নিগ্ধ আকাশ, নাতিশীতোষ্ণ ঋতু, এ সময়ে দেশজ ফুল ও ফলের প্রাচুর্যের কারণে। বাংলা রামায়ণে আমরা এই পূজার উল্লেখ পাই। অবশ্যই কৃত্তিবাসের বাংলায় রচিত রামায়ণে। বাল্মিকী মুনি রচিত মূল সংস্কৃত রামায়ণে কিন্তু দুর্গাপূজার কোনো উল্লেখ নেই। তাছাড়া বাঙালি হিন্দুরা ছাড়া দুর্গাপূজা অন্য স্থানের হিন্দুরা করে বলেও শুনিনি। সেই হিসেবে এটা একান্তই বাঙালি হিন্দুদের নিজস্ব পূজা।

আমরা যারা একসময় কিশোর, যুবা ছাত্র ছিলাম তাদের কাছে পূজার প্রকৃত আনন্দ শুরু হতো পালেরা যখন মণ্ডপে বাঁশ, খড় এনে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করতে শুরু করত তখন থেকেই। বিস্ময়ভরা চোখে দেখতাম কীভাবে খড় পেঁচিয়ে, তার ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে ধীরে ধীরে শৈল্পিক মহিমায় দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী , সরস্বতী, অসুর, সিংহ বানিয়ে সেই মাটি শুকালে বাঁশের তৈরি বিশেষ ধরনের কাঠি দিয়ে মাটির ফেটে যাওয়া অংশগুলো মসৃণ করে তুলত। তারপর মাটি শুকিয়ে গেলে কত রকম রং মিশিয়ে প্রতিমাগুলো নানা ধরনের তুলিতে রং মাখিয়ে মৃন্ময়ী করে তুলত। চোখ আর ভ্রুগুলো টানত পরম যত্নে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আর ভাবতাম এবার কোন ঠাকুরটা বেশি সুন্দর হবে, পূজায় কোন কাপড় দিয়ে শার্ট বানাব? কেরোলিন? না! সে তো গতবারের পুরনো, শুনেছি, নতুন এসেছে টেট্রন। আর প্যান্ট? কট কাপড় না গ্যাভারডিন? আর জুতো তো অবশ্যই আমার বাটা চাই। এক নম্বর পছন্দ।

পূজার দিনগুলো তো ঢাকের আওয়াজ, কলের গান, বিশেষত আশা, প্রতিমা, লতা, সন্ধ্যা, মান্না দে, কিশোর কুমারের গানগুলো আমার খুব পছন্দ ছিল। কখন অঞ্জলি দেব (পেট তো চোঁ চোঁ করছে উপোসে)? কখন শেষ হবে পূজা? ক্ষুধার রাজ্যে ভক্তি তো প্রায় উবে যাবার পালা! মুঠোভরা ফলপ্রসাদ, তারপর খিচুড়ি, লাবরা! আমার আত্মা পড়ে থাকত এগুলোর প্রতি। বন্ধুদের নিয়ে আড্ডাবাজি। ফুচকা বা ক্যাফে কর্নারের ক্রাম্বচপ। পুরি, ফান্টা বা আইসক্রিম আমার খুব পছন্দ ছিল। আর গেণ্ডারিয়ার প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ছিল ফুলের গাছ। শিউলি, গাঁদা, স্থল পদ্ম, অতশী, কলাবতী, জবা, ঝুমকোলতা, কাঠগোলাপ আর কত রকমের ফুল! দলবেঁধে পাঁচিল টপকে খুব ভোরে কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগেই সেই ফুল বন্ধুরা মিলে চুরি করে সাজি ভরে মণ্ডপে নিয়ে আসতাম।

শাঁখারীবাজার থেকে নানারকম বাজি কিনে এনে ফুটানোর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকের আর ধুপ্তি নিয়ে নাচের প্রতিযোগিতায় আমার সঙ্গে পারা অনেকেরই দায় ছিল। আহারে! ঢাকের আওয়াজ কী যে দ্যুতনাময়। আমার হৃদয় ভিজিয়ে দেয়া অনবদ্য এক অনুভ‚তি! এখন তো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, বা ভাইবারের কল্যাণে প্রেমিক-প্রেমিকাদের সঙ্গে সব সময়ই ভার্চুয়াল যোগাযোগ। পূজার সময় সরাসরি, বাড়তি পাওয়া!

দশমীর সময় একদিকে আমাদের আনন্দ অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে অব্যক্ত বেদনা। আবার এক বছর অপেক্ষা। সন্ধ্যা থেকে দেখতাম সদবা বধূরা দলে দলে এসে মায়ের কপালে, চরণে সিঁদুর দিতেন, নিজেরা সিঁদুর খেলতেন। হাসি আনন্দের সঙ্গে বেদনার মাখামাখি। দশমী দেখতে যেতাম নদীর বা পুকুরের ঘাটে। কত আরতি। কত ঢাকের আওয়াজ! তারপর চোখের জলে মায়ের নিরঞ্জন।

এখনকার আমাদের ছেলেমেয়েদের তো এমন আগ্রহ বা অনুভ‚তি অন্তত আমার চোখে পড়ে না। আমাদের অনুভূতি ছিল অযান্ত্রিক আর ওরা এখন যান্ত্রিক। নাকি তার চেয়েও বেশি, ডিজিটাল? তাই হয়তো আমরা এনালগেরা তা দেখতে পাই না!

মানিক চন্দ্র দে : অতিরিক্ত সচিব (অব)।

[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়