স্মৃতির দুর্গাপূজা

আগের সংবাদ

করোনার বিভীষিকা ও আমাদের দায়

পরের সংবাদ

পূজা আছে, উৎসব কি আছে?

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ৭:৩৫ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ৭:৩৫ অপরাহ্ণ

প্রতি বছর শরৎকালে বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহাধুমধামে অনুষ্ঠিত হয় বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। এ যেন সমাজের সব সম্প্রদায়ের মানুষের এক মহামিলন। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ দুর্গাপূজা পালন উপলক্ষে ২৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুসারেই সারাদেশে এবার ৩০ হাজার ২১৩টি মণ্ডপে ২২ থেকে ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। করোনা মহামারির কারণে এবার উৎসব সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরিহার করে সাত্তি¡ক পূজায় সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তাই এবারের দুর্গোৎসবকে দুর্গাপূজা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এবার ঢাকাতে ২৩১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মণ্ডপগুলোতে স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। জনসাধারণকে অনুরোধ করা হয়েছে- সবাই যেন মাস্ক পরে মণ্ডপে আসেন এবং ভিড় না করেন। এ বছর করোনার কারণে রাজধানীর কোনো মন্দিরে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে না। পূজা উদযাপন পরিষদ যেসব নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলো অবশ্যই মানতে হবে। পুষ্পাঞ্জলি ভার্চুয়ালি কিংবা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে দেয়া ব্যবস্থা করতে পারলে আরো ভালো হতো।

ঢাকের বাজনা দুর্গাপূজার অন্যতম অনুষঙ্গ। ঢাকের বাজনার মধ্যেই দুর্গাপূজার আনন্দ নিহিত। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা সদরের পুরাতন বাজারে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারো শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনাপর্ব মহালয়ার দিন থেকে রাজা নবরঙ্গ রায় প্রতিষ্ঠিত ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিরাট ঢাকের হাট মহালয়া থেকে শুরু হয়ে ষষ্ঠীর দিনে শেষ হয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ই সর্বপ্রথম তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। উপজেলা সদর থেকে ২ কিলোমিটার উত্তরে চারিপাড়া গ্রামে ছিল রাজার প্রাসাদ। আজো রাজার আমলে খনন করা কোটামন দিঘির মনোরম দৃশ্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। পূজা উপলক্ষে রাজপ্রাসাদ থেকে সুদূর বিক্রমপুর পরগনার বিভিন্ন স্থানে বার্তা পাঠানো হতো। ঢাকঢোল বাঁশিসহ বাদ্যযন্ত্রীরা নৌপথে আসতেন বর্তমান কটিয়াদী মঠখোলা সড়কের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামক স্থানে।

পূজার দুদিন আগে এদের আগমন ঘটত। পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী মসুয়া গ্রামে বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরি কিশোর রায় চৌধুরীর বাড়িতে মহাধুমধামে পূজা শুরু হতো। সেই সঙ্গে চলত বিভিন্ন পূজায় বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতা। দিন দিন পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন জমিদারদের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দ্ব›দ্ব শুরু হওয়ায় অবশেষে যাত্রাঘাট থেকে স্থান পরিবর্তন হয়ে ৫ কিলোমিটার দূরবর্তী আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী কটিয়াদী পুরাতন বাজারের বর্তমান প্রেস ক্লাবের কাছে স্থাপিত হাটটি বিরাট ঢাকের হাটে রূপ নেয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নরসিংদী, গাজীপুর, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক বাদ্যযন্ত্রীরা আসেন এই হাটে। দুর্গাপূজার আয়োজকরা এই হাট থেকে পূজার দুয়েকদিন আগে ভাড়ায় বায়না দিয়ে বাদ্যযন্ত্রীদের নিয়ে যান। বাংলাদেশের আর কোথাও এ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের হাট নেই।

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যতগুলো পৌরাণিক গল্প আছে তার মধ্যে রাজা সুরথের গল্প ও মহিষাসুরের গল্প উল্লেখযোগ্য। রাজা সুরথের গল্পে বলা হয়, তিনি ছিলেন পৃথিবীর রাজা। সুশাসক ও যোদ্ধা হিসেবে তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। কিন্তু একবার এ যুদ্ধে এক যবন জাতির হাতে তার পরাজয় ঘটে। সেই সুবাদে তার স্ত্রী ও সভাসদেরা ধনসম্পদ ও সেনাবাহিনীর দখল নেয়। রাজা মনের দুঃখে বনে চলে আসেন। বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে মেধা নামে এক ঋষির আশ্রমে এসে হাজির হন। বনে থেকেও রাজা সব সময় হারানো রাজ্যের ভালো-মন্দের কথা ভাবতেন। এমন সময় একদিন বনের মধ্যে সুরথ সমাধি নামের এ বৈশ্যের দেখা পেলেন। তার সঙ্গে কথা বলে সুরথ জানতে পারলেন, সমাধির স্ত্রী ও ছেলেরা তার সব টাকাপয়সা ও বিষয়-সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও তিনি সব সময় তার স্ত্রী ও ছেলেদের কল্যাণ-অকল্যাণের কথা চিন্তা করে শঙ্কিত হন। তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, যারা তাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে, তাদের প্রতি রাগ হচ্ছে না কেন? কেনই বা তারা সেসব লোকের ভালো-মন্দের কথা চিন্তা করে শঙ্কিত হচ্ছেন। দুজনে মেধা ঋষিকে জিজ্ঞাসা করলে ঋষি বললেন, পরমেশ্বর মহামায়ার প্রভাবেই এমনটা হচ্ছে। সুরথ তাকে মহামায়ার গল্প জিজ্ঞাসা করলে তিনি এক এক করে তাকে তিনটি গল্প বললেন। এই গল্পগুলো শ্রী শ্রী চণ্ডির মূল আলোচনার বিষয়। মেধার গল্প শুনে সুরথ সমাধি নদীর তীরে তিন বছর কঠিন তপস্যা ও দুর্গাপূজা করেন এবং শেষে দুর্গা তাদের দেখা দিয়ে সুরথকে হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন এবং বৈশ্যকে তত্ত¡ জ্ঞান দিলেন।

দেবী দুর্গার কাহিনীগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় মহিষাসুর বধের কাহিনী। পুরাকালে মহিষাসুর দেবগণকে ১০০ বছরব্যাপী এক যুদ্ধে পরাজিত করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নিলে বিতারিত দেবতারা প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাদের মুখপাত্র করে শিব ও নারায়ণের সমীপে উপস্থিত হলেন। মহিষাসুরের অত্যাচারের কাহিনী শুনে উভয়ই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন। সেই ক্রোধে তাদের মুখমণ্ডল ভীষণনাকার ধারণ করলে প্রথমে বিষ্ণু ও পরে শিব এবং ব্রহ্মার মুখমণ্ডল থেকে এক মহাত্যাজ নির্গত হলো। সেই সঙ্গে ইন্দ্রাদিসহ অন্য দেবতাদের দেহ থেকেও সুবিপুল তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হলো। সুউচ্চ হিমালয়স্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারী মূর্তি ধারণ করল। কাত্যায়নের আশ্রমে আবিভূর্ত হওয়ায় এই দেবী কাত্যায়নী নামে অভিহিত হলেন। এই দেবী ছিলেন দেবী পার্বতীর অবতার। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশী তিথিতে দেবী কাত্যায়নী আবিভর্‚ত হয়েছিলেন; শুল্কা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে কাত্যায়নী দেবীকে পূজা করেন এবং দশমীতে দেবী মহিষাসুর বধ করেন। যা হোক এক এক দেবের প্রভাবে দেবীর এক এক অঙ্গ উৎপন্ন হলো। প্রত্যেক দেবতা তাদের অস্ত্র দেবীকে দান করলেন। হিমালয় দেবীকে তার বাহন সিংহ দান করলেন। এই দেবীই অষ্টাদশভুজা মহালক্ষ্মীরূপে মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। দেবী মহিষাসুর বধ করেন। ইনিই দুর্গা।

তবে বাঙালিরা একে দশভুজা রূপে পূজা করেন। দেবী ও তার বাহন সিংহনাদে ত্রিভুবন কম্পিত হতে লাগল। মহিষাসুর সেই কম্পনে ভীত হয়ে প্রথমে তার সেনাদলের বীর যোদ্ধাদের পাঠাতে শুরু করলেন। দেবী ও তার বাহন সিংহ প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে একে একে সব যোদ্ধা ও অসুরসেনাকে বিনাশ করেন। তখন মহিষাসুর স্বয়ং দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেন। যুদ্ধকালে ঐন্দ্রজালিক মহিষাসুর নানা রূপ ধারণ করে দেবীকে ভীত করার প্রচেষ্টা করে। কিন্তু দেবী সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তখন অসুর অহঙ্কারে মত্ত হয়ে প্রবল গর্জন শুরু করল। দেবী বললেন, রে মূঢ়, যতক্ষণ আমি মধু পান করি ততক্ষণ তুই গর্জন করে নে। আমি তোকে বধ করলে দেবতারা এখানে শিগগিরই গর্জন করবেন। এই বলে দেবী এক লাফে মহিষাসুরের ওপর চড়ে তার কণ্ঠে পা দিয়ে শূল দ্বারা বক্ষ বিদীর্ণ করে তাকে বধ করলেন। অসুরসেনা হাহাকার করতে করতে পলায়ন করল এবং দেবতারা স্বর্গের অধিকার ফিরে পেয়ে আনন্দধ্বনি করতে লাগল। আর এভাবেই মহাবিশ্ব থেকে অসুর শক্তির পরাজয় ও শুভ শক্তির জয় হলো।

নিতাই চন্দ্র রায় : কলাম লেখক ও কৃষিবিদ।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়