না জিতেও পয়েন্ট পাচ্ছে টাইগাররা

আগের সংবাদ

অকার্যকর বেশিরভাগ থানার নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র

পরের সংবাদ

টাকা উদ্ধার হয় সামান্যই

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের মামলা।
বিচারের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় আত্মসাৎকারীরা একটু বেশিই সুবিধা পায়।

দেশে গত কয়েক বছরে অনেকগুলো আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম দুর্নীতি, ঋণ কেলেঙ্কারি, জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের ঘটনা রয়েছে। এসব কেলেঙ্কারিতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত একটি কেলেঙ্কারিরও বিচার হয়নি। সাজা পাননি অভিযুক্তদের কেউ। প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। বছরের পর বছর মামলা চলছে। অভিযুক্তদের কেউ জেলে আছেন, কেউ চিকিৎসার নামে হাসপাতালে আরাম আয়েশে আছেন। অনেকে জামিন পেয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও উদ্ধার হয় না অর্থ। হলেও তা আত্মসাৎ করা বা পাচার হওয়া অর্থের ক্ষুদ্রতম অংশ মাত্র।

জানা যায়, বিদ্যমান আইন অনুসারে অর্থ পাচারের মামলা করে থাকে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশের অন্যান্য বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। আর তাদের সহায়তা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। এ অপরাধের তদন্তও করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ফলে গত কয়েক বছরে অর্থ পাচারের কত মামলা হয়েছে তার তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে কোথাও নেই। এর মধ্যে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে অর্থ পাচারের অপরাধে দুদকই বেশি মামলা করেছে। শুধু গত ১ বছরেই দুদক ৫০টির বেশি মামলা করেছে।

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের খুব বেশি নজিরও নেই। ২০১২ এবং ২০১৩ সালে ৩ দফায় সিঙ্গাপুরের ১টি ব্যাংকে থাকা খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ২১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ফেরত আনতে পেরেছিল দুদক। এর বাইরে ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ট্রুথ কমিশন গঠন করে ৩৪ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল। এছাড়া ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জরুরি অবস্থার সময় দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। তবে এর মধ্যে আবার ৬১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দেশের সর্বোচ্চ আদালত ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয়। আর ট্রুথ কমিশনকে আদালত অবৈধ ঘোষণা করলেও যারা টাকা জমা দিয়েছেন তাদের টাকা ফেরত দেয়ার কোনো নির্দেশ দেয়নি।

দুদক জানায়, তাদের উদ্যোগের মধ্যে এখন এগিয়ে আছে মোরশেদ খান ও তার পরিবারের সদস্যদের হংকংয়ে পাচার করা ৩২১ কোটি টাকা ফেরত আনা। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১৬ কোটি টাকা ফেরত আনার জন্য হংকংয়ের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে দুদক। বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৯ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এবং তার ভাই হাফিজ ইব্রাহিমের টাকাও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে দুদক জানায়।

জানা যায়, আর্থিক খাতের আলোচিত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় দুদকের দায়ের করা চাঞ্চল্যকর ডেসটিনি, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, সরকারি খাতের বেসিক, সোনালী, জনতা, কৃষি ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক রয়েছে। এসব মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো কোনো মামলায় ৫-৭ বছরেও তদন্ত শেষ করা যেমন সম্ভব হয়নি; তেমনি কিছু মামলায় আদালতে চার্জ গঠন হলেও দীর্ঘ বছরেও তা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে ঝুলে আছে অর্থ উদ্ধারের ঘটনাও। কারণ অর্থ আত্মসাতের প্রমাণসাপেক্ষে আদালতের রায়ের ওপরই নির্ভর করে অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি।

এদিকে ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির অধিকাংশ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধান ও তদন্তে। পরবর্তীতে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মামলায় গ্রেপ্তার, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা দোষী কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হলেও ব্যাংকের লুটে নেয়া টাকা আর ফেরত আসে না। এছাড়া আদালতের রায়ে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া না গেলে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ থাকে।

অধিকাংশ মামলায় দেখা যায়, আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত না দিলে সাজা খাটতে হয় অপরাধী কর্মকর্তাকে। সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিজের নামে করা সম্পদ খুঁজে পাওয়া যায় না। যেটুকু পাওয়া যায়, তা আত্মসাৎকৃত অর্থের তুলনায় খুবই নগণ্য। সে কারণে লোভী কর্মকর্তারা টাকা মেরে দিয়ে গ্রেপ্তার এবং নির্ধারিত কিছু দিন হাজতবাসের মধ্য দিয়ে রেহাই পেয়ে যান বললেই চলে। যেমন পাওয়া যায়নি হলমার্কের নামে আত্মসাৎ করা টাকা; তেমনি পাওয়া সম্ভব নয় বিসমিল্লাহ গ্রুপের নামে আত্মসাৎ করা টাকাও। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনুসন্ধান-তদন্তে কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষে চ‚ড়ান্ত রায়ে সাজা হলেও এক সময় ঠিকই বেরিয়ে আসবেন, এটা তাদের বিশ্বাস। কারণ অর্থ আত্মসাতের মামলায় ফাঁসি তো আর হবে না।

ব্যাংক ঋণখেলাপিদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, আদালতে মামলার পর তা দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুলে যায়। আবার যদিও ২-১টি মামলার রায় হয় তার থেকেও আদায় অনেক কম হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় গিয়ে ব্যাংক তার অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং ঋণখেলাপিরা টালবাহানার সুযোগ পাচ্ছে। ব্যাংকারদের দাবি, অর্থঋণ আদালতে বিচারক বাড়িয়ে এবং উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ গঠন করে খেলাপিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ে ৬ হাজার ৭৩৫টি নতুন মামলা করেছে। একই সময়ে আগের মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ হাজার ৩০৪টি। তবে এসব মামলায় ব্যাংক ৭ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা দাবি করে মামলা করলেও আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৫০১ কোটি টাকা, যা মোট দাবির মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ। ব্যাংকগুলো এ পর্যন্ত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ২ লাখ ৭২ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা আদায়ের জন্য ১২ লাখ ২০ হাজার ৯২৫টি মামলা করেছে। গত জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ লাখ ৭০ হাজার ২৮৮টি মামলা। ওই মামলাগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের ৮২ হাজার কোটি টাকার দাবি থাকলেও নিষ্পত্তির পর আদায় হয়েছে মাত্র ২৮ হাজার কোটি টাকা।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৬৩৭টি। এই মামলাগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের দাবি ১ লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। বিচারাধীন মামলাগুলো থেকে বছরের প্রথম ৬ মাসে ব্যাংক আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৪ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা থেকে ব্যাংকগুলোর আদায় হয় ৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। ওই সময়ে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩০২ কোটি টাকা আদায়ে ২ লাখ ৫৪ হাজার ২০৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল।

বিচারাধীন মামলায় সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর। সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৯ ব্যাংকের ১ লাখ ৮১ হাজার মামলায় আটকে আছে ৯৪ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আর বেসরকারি খাতের ৪১ ব্যাংকের ৬০ হাজার মামলায় আটকে আছে ৯২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৯ হাজার ২৪৪টি বিচারাধীন মামলায় আটকে আছে ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।

আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে দুদকের অন্যতম আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, মূলত আদালতের আদেশের মাধ্যমেই কেবল অর্থ উদ্ধার অথবা সম্পদ জব্দ করতে হয়। অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার (নি¤œ আদালত, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) মাধ্যমে আদালতে নিষ্পত্তি হয়। আত্মসাৎকারীরা অনেক ক্ষমতাবান। আইনের প্রতিটি ধাপে তারা আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়ান। ফলে প্রতিটি মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষ করেই রায় পেতে হয়। এ অবস্থায় বলতে হয়, আত্মসাৎকারীরা একটু বেশিই সুবিধা পায়। আর পাচার করা অর্থ ফেরতের বিষয়ে তিনি বলেন, মোরশেদ খান ও তার পরিবারের পাচার করা অর্থ মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়ে হংকংয়ে জব্দ করা হয়েছে। বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের টাকা লন্ডনে ফ্রিজ করা আছে। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এবং তার ভাই হাফিজ ইব্রাহিমের টাকাও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া আরো কয়েকজন ব্যক্তির অর্থ ফেরতের বিষয়েও আমাদের কাজ এগিয়ে চলছে।

এদিকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে দুদকের উদ্যোগকে যথেষ্ট মনে করেন না ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, এক্ষেত্রে দেশের এবং আন্তর্জাতিক আইনের কিছু জটিলতা আছে। এটা অবশ্য ২ দেশ আইনগত চুক্তি স্বাক্ষর করে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তেমন দেখা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো যারা করবেন, তারা অনেক প্রভাবশালী। তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। কারণ, পাচার করা যে অর্থ ফেরত আনা হবে, আইনে তার দ্বিগুণ জরিমানার বিধান আছে। এছাড়া ৪ থেকে ১২ বছরের শাস্তির বিধান তো রয়েছেই। এই জরিমানা ও শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে পাচার বন্ধ করা যাবে না।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়