টাকা উদ্ধার হয় সামান্যই

আগের সংবাদ

সহসা কাটছে না মামলা জট

পরের সংবাদ

অকার্যকর বেশিরভাগ থানার নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২০ , ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ

নারী ও শিশুদের সেবা দেয়ার জন্য রাজধানীর প্রতিটি থানাতেই রয়েছে নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র (হেল্প ডেস্ক)। এ ডেস্কে সবসময় একজন নারী কর্মকর্তার সেবা দেয়ার কথা। এমনকি মুজিববর্ষ উপলক্ষে পুলিশের পক্ষ থেকে সব থানায় এই বিশেষ ডেস্কটি কার্যকর করার কথাও বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীর বেশিরভাগ থানায় অকার্যকর এ ডেস্ক। এতে নির্যাতনের শিকার নারীদের অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। কারণ কোনো পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তার কাছে সবসময় পুরো ঘটনা খুলে বলতে পারেন না নির্যাতন বা হয়রানির শিকার নারীরা। আবার অনেকে লজ্জাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন ভেবে থানায় মামলা করতেও যান না।

বিশেজ্ঞরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ করে ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার ক্ষেত্রে ভিকটিমকে আইনি সহযোগিতা দিতে প্রতিটি থানার এ ডেস্ক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যদি এটি কার্যকর করা যায় তাহলে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, হুমকি ও সামাজিক প্রতিবন্ধিকতা থাকা সত্ত্বেও ভিকটিম থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহী হবেন। যদিও পুলিশ বলছে, নারী কর্মকর্তার সংকটই এ ডেস্ক কার্যকরের প্রধান অন্তরায়।

সরেজমিন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বেশ কয়েকটি থানায় গিয়ে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকটি থানা বাদে বেশিরভাগ থানায় অকার্যকর নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র। অনেক থানাতে নেই কোনো নারী কর্মকর্তা। কোনো কোনো থানায় শুধু স্টিকারেই সীমাবদ্ধ ডেস্ক। কোনো নারী ভিকটিম গেলে থানার পুরুষ কর্মকর্তারাই ঘটনার বর্ণনা শোনেন। বিশেষ প্রয়োজনে নারী কনস্টেবল ডেকে ভিকটিমের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শোনা হয়।

ডিএমপিতে সর্বশেষ উদ্বোধন হওয়া হাতিরঝিল থানায় গিয়ে দেখা যায়, আলাদা একটি রুমেই রয়েছে নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত কোনো নারী কর্মকর্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও বেশ কিছুক্ষণ পরে একজন নারী এএসআই এসে জানান, থানায় কোনো নারী এসআই না থাকায় তিনি একাই এখানকার সব কার্যক্রম সামলান। আপনার অনুপস্থিতে কী করা হয়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ফাঁকাই থাকে। ঊর্ধ্বতন স্যারেরা তখন ব্যবস্থা নেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রশিদ ভোরের কাগজকে বলেন, নারী কর্মকর্তার সংকটে সব সময় হয়ত ডেস্কটিতে কর্মকর্তা থাকে না। তবে, কোনো ভিকটিম এলে নারী পুলিশ সদস্যদের ডেকে সহায়তা নেয়া হয়।

এদিকে, মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৬৯২টি। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার ১৬৩ জন নারী মামলা করতে পারেননি। এর বাইরে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৯২ জন। তাদের মধ্যে ৫৮ জন মামলা করেননি। ডিএমপির তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীতে ১ হাজার ২৯১টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে ধর্ষণের ঘটনাই ৩১৪টি এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২৫৯টি। নির্যাতনগুলোর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪২ ধর্ষণ ও ৪৪টি শিশু নির্যাতনসহ মোট ১৭২টি ঘটনা ঘটেছে।

ফেব্রুয়ারিতে ৪৫টি ধর্ষণ ও ২৯টি শিশু নির্যাতনসহ ১৯৪টি ঘটনা ঘটেছে। মার্চে ৪৬টি ধর্ষণ ও ৩৫টি শিশু নির্যাতনসহ ১৮৭টি; এপ্রিলে ১২টি ধর্ষণ ও ১২টি শিশু নির্যাতনসহ ৪৭টি; মে মাসে ১৫টি ধর্ষণ ও ২১টি শিশু নির্যাতনসহ ৬৮টি; জুনে ৪৯টি ধর্ষণ ও ৪৭টি শিশু নির্যানসহ ১৮৫টি; জুলাইয়ে ৫২টি ধর্ষণ ও ৩২টি শিশু নির্যাতনসহ ২১৬টি এবং আগস্টে ৫৩টি ধর্ষণ ও ৩৯টি শিশু নির্যাতনসহ ২২২টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এপ্রিল মাস থেকে ধর্ষণসহ নির্যাতনের সংখ্যা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এরই ধারাবাহিকতায় গত সেপ্টেম্বর মাসে ৬০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে মত সংশ্লিষ্টদের। যারা বিভিন্ন কারণে মামলা করতে পারেননি তার পেছনে থানায় অনুকূল পরিবেশ না পাওয়াটাও অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, ভৌগোলিক কারণে আমাদের দেশের মানুষ বিপরীত লিঙ্গের কাউকে মন খুলে কিছু বলতে চান না। এজন্যই থানাগুলোতে নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। এখন সেই কেন্দ্রগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে অবশ্যই সে বিষয়টি মনিটরিং করতে হবে। তাহলে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, হুমকি ও সামাজিক প্রতিবন্ধিকতা থাকা সত্ত্বেও ভিকটিম থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহী হবেন।

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. ওয়ালিদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের সব থানায় নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে। তবে এটা সত্যি, নারী কর্মকর্তার সংকট রয়েছে। পাশাপাশি থানায় ব্যারাকের ব্যবস্থা করে তাদের রাখার বিষয়টিও একটু কঠিন। এরপরও দিন দিন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে, যারা আছে আমরা তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। প্রশিক্ষণে তাদের ভিকটিমের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, এসব মামলার তদন্ত কীভাবে করতে হবে- এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও নারী ও শিশুদের জন্য ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে। সেখানে গেলেও ভালো সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়