শারদীয় দুর্গাপূজা ও সম্প্রীতির বন্ধন

আগের সংবাদ

মানবিক কারণে খালেদা মুক্ত: কাদের

পরের সংবাদ

করমর্দন আলিঙ্গন গালচুম্বনের দিন শেষ

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০২০ , ৬:০০ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৩, ২০২০ , ৬:০৪ অপরাহ্ণ

আমাদের জীবন থেকে স্পর্শের আনন্দ, স্পর্শের সুখ, স্পর্শের সান্ত¡না সবই সরে যাচ্ছে। করমর্দন শুধু নয়, আলিঙ্গনও যথেষ্ট শান্তিপ্রদ সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। এই শহরের অনেকের স্মৃতিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত শাহতা জারাবের গালচুম্বন উজ্জ্বল হয়ে থাকার কথা। করমর্দন, আলিঙ্গন, গালচুম্বন- এসবের বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। আসলে আমাদের যুগটা তো ভার্চুয়াল সম্পর্কের, অন্যকিছু খুঁজে লাভ নেই। ভার্চুয়াল করমর্দন ও ভার্চুয়াল আলিঙ্গন ও ভার্চুয়াল চুম্বনে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে।

নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে মান্যবর ডেভিড কার্টার বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার ছিলেন। তার সূ² রসিকতার পরিচয় অনেকেই পেয়েছেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক তখন বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আমি তখন সে দপ্তরের চাকুরে। করমর্দনের সময় রাষ্ট্রপতি অনেকক্ষণ হাইকমিশনারের হাত ধরে রাখেন। তাদের মধ্যে একটি দুটি বাক্য বিনিময়ও হয়।

রাষ্ট্রপতির হাতমুক্ত হয়ে তিনি তার বিশেষ ‘মিসচিভাস স্মাইল’ দিয়ে আমাকে বললেন, তাড়াতাড়ি হাতটা ছাড়িয়ে আনতে পারলে তিনি আমার ‘হেড অব দ্য স্টেট’-এর লিঙ্গ পরিবর্তন করার সুযোগ পেতেন না। তিনিই ব্যাখ্যা দিলেন। রাষ্ট্রপতি বলেছেন ‘গিভ হিম মাই বেস্ট উইশেস এন্ড রিগার্ডস’। ইংরেজি ভাষায় রানির সর্বনামে ‘হিম’ ব্যবহার করার সুযোগ নেই, ‘হার’-ই বলতে হবে, তবুও বললাম, নিশ্চয়ই আপনাকে অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত ভেবেছেন।

রসিক ডেভিড কার্টার আরো একধাপ এগিয়ে বললেন, আমেরিকার রাষ্ট্রদূত নয় তো? ওহ মাই গড, সেজন্যই আমার হাত এতক্ষণ ধরে রেখেছেন।
আসলে তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন একজন নারী, ম্যারি অ্যান পিটার্স।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই আমি একজন নারী প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে কর্মরত ছিলাম। ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় বিদেশি রাষ্ট্রদূত দলবেঁধে এসেছেন। সে বছর এই শুভেচ্ছা বিনিময় পর্বটা হয়েছে সুগন্ধায় (এখন পররাষ্ট্র ক্যাডারের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট)। আমাকে যথেষ্ট জুনিয়র বিবেচনায় একটি সাধারণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমার কাজ হচ্ছে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মান্যবরদের বলা : এক্সিলেন্সি শি ডাজ নট শেইক হ্যান্ডস।

একজন একজন ঢুকছেন আর আমিও তোতাবচন শুনিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সব দলেই দুয়েকজন রসিক তো থাকবেনই।
একজন গোঁফওয়ালা রাষ্ট্রদূত (কোন দেশ স্মরণ করতে পারছি না) হেসে বললেন, তাই নাকি? তাহলে ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। আমার হাত দুটো পেছন দিকে নিয়ে বেঁধে দাও।
তার কথা শুনে পেছনের রাষ্ট্রদূতও হেসে বললেন, চমৎকার আইডিয়া। তাহলে আমার হাতও।
হাত বাঁধতে হয়নি, দুজনই হাত সামলে অভিবাদন জানিয়েছেন।
দুটোই বাস্তব জীবনের ঘটনা, এতে কিঞ্চিত রসও আছে।
কিন্তু পৃথিবীজুড়ে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতিই করমর্দন নিষিদ্ধ করেছে- অলিখিত এই নিষেধাজ্ঞা সহসা উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। শুধু করমর্দন নয়, আলিঙ্গন ও গালচুম্বনও নিষিদ্ধ।
করমর্দনে চ্যাম্পিয়ন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আমাদের বহুল উচ্ছ¡সিত টুয়েন্টি টুয়েন্টি শুরু হওয়ার আগেই করোনা ভাইরাস ব্যাধি কোভিড-১৯ দেখা দেয় এবং পৃথিবীতে ছড়াতে শুরু করে। মার্চের শেষ দিকে লকডাউন ঘোষিত হওয়ার আগে আমরাও দেদার শেকহ্যান্ড করেছি, কোলাকুলিও বাদ যায়নি। আরবীয় সংস্কৃতির গালচুম্বন আমরা রপ্ত করিনি। আর ওষ্ঠচুম্বন আমাদের আলাপের অধিক্ষেত্র বহিভূর্ত।

করমর্দনের সংস্কৃতি বঙ্গসংস্কৃতি, ভারতীয় সংস্কৃতি কিংবা ইসলামি সংস্কৃতি থেকে উদ্ভ‚ত নয়। অভিবাদনের এই হাত মেলানোর পদ্ধতিটি খ্রিস্টজন্মের হাজার বছর আগে থেকে চলে আসছে বলে অনুমিত। খ্রিস্টজন্মের ৯০০ বছর আগেকার দেয়ালচিত্রে দেখা যায় আসিরিয়ান রাজা তৃতীয় সালমানেসার বেবিলনের রাজা ১ম মারহুক-জাকির-সুমির সঙ্গে করমর্দন করছেন। অ্যাথেন্সের এক্রোপোলিস জাদুঘরে খ্রিস্টজন্মের ৫০০ বছর আগেকার দেয়াল চিত্র সংরক্ষিত আছে। তাতে দেবী হেরা ও এথিনা করমর্দন করছেন।

ঐতিহাসিকদের ব্যাখ্যা হচ্ছে করমর্দনকারী দুপক্ষই ঘোষণা করছে, আমরা শূন্য হাতে এসেছি, হাতে কোনো অস্ত্র নেই, আমরা শান্তি স্থাপন করছি। গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতিতে হাত মেলানো অস্ত্র সংবরণ থেকে শুরু করে অভিবাদন, স্বাগতম জানানো থেকে শুরু করে সন্ধি স্থাপন, সমতা প্রতিষ্ঠা থেকে চুক্তি সম্পাদন অনেক ধরনের কাজের এবং খোলা মনে তা সম্পাদনের প্রত্যাশা প্রকাশ করে থাকে। মুসলমান পণ্ডিতরা মনে করেন ইয়েমেনিরা করমর্দনের প্রথাটি মুসলিম সমাজে চালু করে। পুরুষে পুরুষে করমর্দন ব্যাপক প্রচলিত হলেও মুসলমান সমাজে পুরুষ-নারীর করমর্দন সমর্থিত হয়নি। আবার সুইজারল্যান্ডে এটা প্রত্যাশিত যে করমর্দনকারী প্রথমে নারীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন। অতঃপর পুরুষ। রুশ অমুসলিম সমাজেও নারী-পুরুষের হাত মেলানোর নজির দুর্লভ।

১৯০৭ সালের ১ জানুয়ারি হোয়াইট হাউস সংবর্ধনায় প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট ৮৫১০ জন অতিথির সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেন। আর ১৯৮৭’র ৩১ আগস্ট সেন্ট আলবান কার্নিভালে স্টিফেন পোটার ১৯ হাজার ৫৫০ জনের সঙ্গে হাত মেলান। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস- এই রেকর্ডটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ব্যাপারটা যদি করোনাকালে হতো স্টিফেন পোটার যদি করোনা ভাইরাস বহনকারী হতেন, তাহলে রোগ ছড়ানোর বিশ্বরেকর্ডটিও স্টিফেন পোটারের হতো।

প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট করমর্দন না করার অপরাধে সেখানে করমর্দন ঘাতক ভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম মাধ্যম বলে প্রমাণিত, যেখানে করমর্দনকারীরই শাস্তির আওতায় আসার কথা সেখানে অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে ঠিক উল্টোটাই ঘটল। লেবানন থেকে ২০০২ সালে জার্মানিতে আসা একজন মুসলমান ডাক্তার নাগরিকত্বের জন্য নির্ধারিত সব পরীক্ষায় পাস করে যে নারীর কাছ থেকে ন্যাচারালাইজেশন সনদ নেবেন তার বাড়িয়ে দেয়া হাতে হাত না মেলানোর অপরাধে তিনি নাগরিকত্ব সনদ পেলেন না।

হাত মেলাতে সমস্যা কি তার দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। ডাক্তার বলেছেন যে তিনি তার স্ত্রীর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যতদিন তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বর্তমান থাকবে ততদিন তিনি অন্য কোনো নারীর হাত স্পর্শ করবেন না। সেই নারী কর্মকর্তার সঙ্গে হাত মেলালে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হতো। ২০১২ সালে তিনি যখন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন শপথ নিয়ে তাকে উল্লেখ করতে হয় যে তিনি জার্মান সংবিধানের সম্পূর্ণ অনুগত থাকবেন এবং চরমপন্থাকে নিন্দা জ্ঞাপন করবেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য বাডেন-ওরটেমবার্গের একটি আদালত তার নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান মামলায় রুল জারি করেছে যে করমর্দনের জন্য নারীর প্রসারিত হাতকে প্রত্যাখ্যান করা ‘মৌলতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ধারণাকে লালন করে’ যা জার্মান সমাজের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অন্তরায়। আদালতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ অনেক কম। কিন্তু করোনাকালের বাস্তবতা হচ্ছে এমনকি আদি জার্মানরা ভাইরাস আতঙ্কে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সবার সঙ্গে করমর্দন বন্ধ করে দিয়েছে। জার্মানিতে মোট জনসংখ্যার ৫.২ ভাগ মুসলমান।

২০০৬ সালের আমেরিকার মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ল্যানসিং শহরে জন রিজওয়ে নামের এক অপরাধী নতুন এক অপরাধের কারণে গ্রেপ্তার হন। সে অপরাধ করমর্দন করার; বলা বাহুল্য সে সময় এইচআইভি-এইডসের প্রকোপ থাকলেও করোনা ভাইরাস ছিল তখন থেকে প্রায় ১৫ বছর দূরে। একটি মামলার শুনানির জন্য তাকে জেল থেকে কোর্টে আনা হয়। তিনি এসে সরকার পক্ষের উকিল, পুলিশ অফিসার এবং আদালতের পেয়াদার সঙ্গে করমর্দন করেন, কিছুক্ষণের মধ্যে তিনজন মাথা ঘুরে পড়ে যান। জিম রিজওয়ে তার হাতে বিষাক্ত কিছু লাগিয়ে রেখেছিলেন, এই তিনজন হাত মেলানোর পর অজান্তে নিজেদের নাকে-মুখে হাত লাগাতেই ঘটনাটি ঘটে।

করমর্দনের অভিশাপএকটা সময় ছিল চুলকানিযুক্ত হাত বা করতলের সঙ্গে সুস্থ হাতের কেউ করমর্দন করতে ইতস্তত করতেন। চুলকানি ছোঁয়াচে এবং ‘স্কিন-টু-স্কিট’ সংস্পর্শে চুলকানি ছড়িয়ে পড়বে- আশঙ্কা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সংক্রামক ঘাতক রোগের জীবাণু- ক্ষুদ্র অণুজীব ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস হাতের মাধ্যমে ছড়িয়ে প্রমাণ করেছে শরীরের যত প্রয়োজনীয় অঙ্গই হোক হাত বিশালদেহী ঘাতকের গলাটিপে ধরতে পারলেও অতিক্ষুদ্র ঘাতকের সামনে ভীষণ অসহায়। পৃথিবীজুড়ে মানুষের হাতে একটি স্বাভাবিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রবণতা নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করা এবং এমনকি কচলানো। করোনা ভাইরাসগ্রস্ত ব্যক্তির হাত নিজের অজান্তে ভাইরাস রপ্তানিকারক, আর সুস্থ ব্যক্তির করমর্দনের জন্য প্রসারিত হাতও নিজের অজ্ঞাতে নিজের এবং তার মাধ্যমে আরো শতসহস্র মানুষের মৃত্যুর ফরমান আমদানিকারক।

টুয়েন্টি টুয়েন্টির আলোচিত চরিত্র পাপিয়া এবং সাহেদের কথা এবং যাদের সঙ্গে তারা ছবি তোলেছেন করমর্দন করেছেন হয়তো আলিঙ্গনও করেছেন সে ছবি সামাজিক ও গণমাধ্যমে প্রচার করেছেন তাদের কথা একবার ভাবুন! ভাগ্যিস দুজনের কীর্তি দুর্নীতি, কলঙ্ক ও অপরাধকর্মে সীমিত- যদি তাদের কেউ করোনা ভাইরাসের বাহক হতেন তাহলে হয়তো ছবির অনেকের জন্যই রাষ্ট্রীয় অর্থে কুলখানির আয়োজন করতে হতো।

বাইবেলের ‘গসপেল অব জন’-এ জুডাসের চুম্বনের কথা স্মরণ করুন- কীভাবে চুম্বনে তিনি যীশুখ্রিস্টকে প্রতারণা করেছেন। জুডাস জ্ঞাতসারে প্রতারণা করেছেন।কিন্তু হাত মেলানোর সৌজন্য নতুন সহস্রাব্দে মানুষের মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বেশি সাধন করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও ব্যবস্থাপক অ্যান্থনি ফাউচি কি বলেছেন শুনুন : সততার সঙ্গে যদি বলতে হয় বলব, আমাদের আর কখনো হাত মেলানোর সংস্কৃতিতে ফিরে আসা ঠিক হবে না।

আমাদের জীবন থেকে স্পর্শের আনন্দ, স্পর্শের সুখ, স্পর্শের সান্ত্বনা সবই সরে যাচ্ছে। করমর্দন শুধু নয়, আলিঙ্গনও যথেষ্ট শান্তিপ্রদ সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। এই শহরের অনেকের স্মৃতিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত শাহতা জারাবের গালচুম্বন উজ্জ্বল হয়ে থাকার কথা। করমর্দন, আলিঙ্গন, গালচুম্বন- এসবের বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। আসলে আমাদের যুগটা তো ভার্চুয়াল সম্পর্কের, অন্যকিছু খুঁজে লাভ নেই। ভার্চুয়াল করমর্দন ও ভার্চুয়াল আলিঙ্গন ও ভার্চুয়াল চুম্বনে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close