কবি শামসুর রাহমানের ৯২তম জন্মদিন উদযাপন

আগের সংবাদ

ব্যর্থতার ভিড়ে উজ্জ্বল মুশফিক

পরের সংবাদ

জীবনানন্দের ব্যক্তিজীবনের ছায়া যে উপন্যাসে

প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২০ , ৯:৩১ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০২০ , ৯:৩৪ অপরাহ্ণ

১৯৫৪ সালে অকালমৃত্যুর আগে জীবনানন্দ দাশ নিভৃতে ১৪টি উপন্যাস এবং ১০৮ ছোটগল্প লিখেছেন, যার একটিও তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি। জীবনানন্দ দাশকে সবাই কবি হিসেবে জানলেও উপন্যাসিক এবং গল্পকার হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে জীবনানন্দের অপ্রকাশিত কবিতা, গল্প এবং উপন্যাসের যে বিশাল এক সম্ভার আবিষ্কৃত হয় তার মধ্যে ‘মাল্যবান’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ জায়গা দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। যার মধ্যে জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিজীবনের অনেক কিছুই সুস্পষ্ট।

‘মাল্যবান’ উপন্যাসের কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠা না পাওয়া দাম্পত্য জীবনে নিদারুণভাবে অসফল একজন মানুষ মাল্যবান এবং তার বিপরীতমুখী স্বভাবের স্ত্রী উৎপলা। মাল্যবানের কৈশোর ও যৌবন পাড়াগাঁয়ে কাটলেও চাকরিসূত্রে কলকাতা শহরে আসে। অনেক আশা আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে কলকাতায় পা রাখলেও মাল্যবানের তেমন কিছুই পূরণ হয়নি। উপন্যাসের শুরুতেই কয়েকটি লাইনে তা সহজেই ফুটে উঠেছে ‘জীবনের বেয়াল্লিশটা বছর তাহলে চলে গেল। রাত প্রায় একটা। কলকাতার শহরে বেশ শীত, খেয়ে দেয়ে কম্বলের নিচে গিয়েছে সে প্রায় গোটা দশেকের সময়; এতক্ষণে ঘুম আসা উচিত ছিল, কিন্তু এলো না, মাঝে মাঝে কিছুতেই চোখে ঘুম আসে না।’ নাগরিক পটভ‚মিকায় লেখা ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে চল্লিশ দশকে কলকাতা শহরের মধ্যবিত্ত চাকুরে মানুষের জীবনযাপনের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে জীবনানন্দ অত্যন্ত আন্তরিক এবং বিশ্বস্ত ছিলেন। মাল্যবান চরিত্রের মাধ্যমে নিজের একান্ত জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছেন তিনি।

মাল্যবানের স্বভাবের মধ্যে যে সূক্ষ্ম মানবিক অনুভূতি ও আবেগ আছে তার স্ত্রী উৎপলার স্বভাব তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সামাজিক জীবনে মাল্যবানের প্রতিষ্ঠাহীনতা এবং কিছুটা শান্তস্বভাবের কোমলতা তার স্ত্রী উৎপলার কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। মাল্যবানকে সে একদম সহ্য করতে পারে না। একসঙ্গে ঘর সংসার করলেও মাল্যবান উৎপলার দাম্পত্য জীবনে সুখের ছোঁয়া নেই, আছে শুধু না পাওয়ার বেদনা, হতাশা, গ্লানিময় বিষাদমাখা অদ্ভুত এক আবেগ। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কটা কোনোভাবে যেন টিকে আছে, তাদের মধ্যকার যোজন যোজন দূরত্ব সুস্পষ্ট হলেও কোথায় যেন একসঙ্গে থাকার তাগিদ রয়েছে। উৎপলা স্বামী মাল্যবানের সঙ্গে কথা বলে অপমানজনক ভাষায়। এত তিক্ততার মধ্যেও মাল্যবান কোনোভাবে পার করছে তার জীবন। মাল্যবান ভালো করেই জানে, স্ত্রী উৎপলার কাছ থেকে সে শুধু লাঞ্ছনা, অপমানের তিক্ততাই পাবে। কিন্তু মাল্যবান ভেতরে ভেতরে অনেকটাই আশাবাদী। তার প্রত্যাশা, সংসারে সুখ হয়তো আসবে একটা সময়ে।

জীবদ্দশায় ব্যক্তি জীবনে জীবনানন্দ দাশ স্ত্রী লাবণ্যের কাছে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান পাননি। তার লেখক জীবন এবং সাহিত্যকর্ম নিয়েও ছিল স্ত্রী লাবণ্য দাশের অনাগ্রহ, বিরক্তি এবং বীতশ্রদ্ধ ভাব। যার প্রকাশ জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যকর্মে সুস্পষ্ট। তার কিছু গল্পে স্বামী চরিত্রগুলোর কেউ কেউ স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে দাম্পত্য জীবনে ভীষণ হতাশ এবং অসুখী। সুখহীন দাম্পত্য জীবনের বোঝা বয়ে বেড়ানো মানুষের দুঃখ-বেদনা হতাশা গ্লানির কথা আন্তরিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তাঁর বিভিন্ন গল্প উপন্যাসে বিশেষ করে ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে ব্যক্তি জীবনানন্দ দাশকে খুঁজে পাওয়া যায় খুব সহজেই।

জীবনানন্দ-লাবণ্য দম্পতির বৈবাহিক জীবনের ছন্দ কেমন ছিল তার কিছু আভাস কিংবা উদাহরণ মেলে ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে। উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হওয়ার পর সেটি প্রকাশের উদ্যোগ নিলে প্রবল প্রতিরোধ এসেছিল জীবনানন্দ পত্নী লাবণ্য দাশের কাছ থেকেই। কারণ তার আশঙ্কা ছিল, ‘মাল্যবান’ উপন্যাস বই আকারে প্রকাশিত হলে লাবণ্য একেবারে নিরাবরণ হয়ে পড়বেন সবার কাছে। এই একটি মাত্র বিষয় থেকেই স্পষ্ট হয়, উপন্যাসটিতে জীবনানন্দ যেভাবে মাল্যবান-উৎপলা দম্পতির জীবনকে চিত্রিত করেছেন সেটিই ছিল তার সঙ্গে লাবণ্যর দাম্পত্য জীবনের বাস্তব সম্পর্ক। জীবনানন্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তিত্বের জবানিতে যখন লাবণ্য দাশের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবনের অসঙ্গতির কথা জানা যায় এবং প্রমাণ হিসেবে ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের প্রকাশনা নিয়ে লাবণ্যের নাটকীয় বিরোধিতার বিষয়টি যখন আর অপ্রকাশ্য থাকে না। সাধারণ দৃষ্টিতে বিচার করলে ‘মাল্যবান’কে ঠিক উপন্যাস বলা চলে না। সার্থক উপন্যাসসুলভ বিভিন্ন তলস্পর্শী চরিত্রের সমাহার নেই এতে নেই কাহিনীর কোনো সুস্পষ্ট পরিণতি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেন একই অবস্থানে স্থবির থেকেছে ঘটনা। কিন্তু তাই বলে উপন্যাসসুলভ গুণাবলি যে একেবারে নেই তাও নয়। এর মধ্যে আছে বর্ণনাকুশলতা, চরিত্রের মুখে উচ্চারিত সংলাপের তীক্ষ্ণতা, জীবনের দার্শনিক উপলব্ধিসমূহের সার্থক প্রকাশ শক্তি। এ সবই সার্থক উপন্যাসের অনুষঙ্গ। ‘মাল্যবান’ উপন্যাসটি পাঠকালে পাঠককে একযোগে দ্বৈত অনুভূতির রহস্যময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে হয়। চমৎকৃত হতে হয় ঔপন্যাসিকসুলভ বর্ণনা ভঙ্গিতে, সক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ দৃষ্টির কারণে- যা কবিত্বের গুণে অনন্য।

আমাদের চারপাশে মাল্যবানের মতো অনেক পুরুষ রয়েছেন, যারা নিত্য দাম্পত্য জীবনে ক্রমাগত বঞ্চনা, অবহেলা, নিগ্রহ আর হতাশার গ্লানিকে সঙ্গী করে বেঁচে আছেন। সেইসব মানুষের হৃদয়ের হাহাকার জীবনানন্দ দাশ ৬৪ বছর আগে ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের পরতে পরতে তুলে ধরেছিলেন। যা পড়তে বসে আমরা আবিষ্ট হই, কাল্পনিক কোনো কিছু নয় যেন আমাদের অনেকেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি মনে হয়।

মাল্যবানকে অনেক সময় অতিমানব মনে হয়। এত অত্যাচার তার মতো সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে হজম করা সম্ভব না হলেও সেসব কিছু সহ্য করে যায়। তার এই ত্যাগ স্বীকার একটু সুখের প্রত্যাশায়। মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক যেসব প্রবণতা থাকে তার কারণেই তার ভেতরের দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ার কথা। তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা তার ভেতরে আর তাতে তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার অবস্থা হওয়ার কথা। অথচ মাল্যবান উৎপলার ক্রম অত্যাচারে নিপীড়নে ক্ষত-বিক্ষত হয়েও অদ্ভুত এক সহনশীলতার আবেগে নিজেকে ধরে রাখে। লেখক কবি উপন্যাসিক জীবনানন্দ দাশ নিজেও দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী লাবণ্যের অবহেলা, কটাক্ষ, শ্লেষ, সহ্য করে নিজেকে ধরে রেখেছিলেন সাহিত্যের অঙ্গনে পথ চলায়। জীবন সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির ভিন্নতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন আলোচ্য উপন্যাসে। পাঠক মাল্যবানের প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে পারেন না উপন্যাসের শেষ কয়েকটি লাইনের চমৎকার বর্ণনায়।

‘মনটা তার বড় খারাপ হয়ে গেল। কিছু হবে না, কিন্তু সে করতে পারবে না বলে উৎপলা তারপর মাল্যবানকে এঁটো টেবিলে ঘুমিয়ে পড়তে দেখল; এঁটো পরিষ্কার করল, মশারি ফেলল, বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু মাল্যবানকে জাগিয়ে দেয়াও উচিত মনে করল না’ উপন্যাসের শেষ ক’টি লাইন পাঠক পাঠিকার হৃদয় খুব সহজেই আপ্লুত করে।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাবার পর এখনকার প্রেক্ষাপটে বিচার বিশ্লেষণ করলে আধুনিক সময়েও ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের আবেদন একটুও ফুরোয়নি। বরং এখন তা আর তীক্ষ্ম হয়েছে বলা যায়।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close