স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারদীয় দূর্গা উৎসব উদযাপনের আহ্বান

আগের সংবাদ

জাতির পিতার নামে আন্তর্জাতিক পুরষ্কার সংক্রান্ত কমিটির সভা

পরের সংবাদ

কবি

প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২০ , ৮:৫৮ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০২০ , ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

ডাক্তার দুঃখের সঙ্গে বলল, আমার কিছু করার নেই। তোমার মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য তোমাকে নির্জন বাসে যেতে হবে। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তোমার কবিতা লেখা নিষিদ্ধ। তোমার জন্য আমি সমাজকে দূষিত করতে পারি না। দুঃখিত কবি। কবি মৃদু হাসল, নিয়ন্ত্রিত কবিতা লেখার চেয়ে না লেখার যন্ত্রণা অনেক আনন্দের। অনেক সময় কবিতা না লেখার কবির যন্ত্রণার নীরব মুহূর্তগুলো কখনো কখনো ভয়ঙ্কর অস্ত্র হয়ে ওঠে।

সকাল আটটায় মনিটরে ভেসে উঠলো দৈনন্দিন কর্ম তালিকা। প্রতিদিন কবির চারটি কাজ থাকে।
আজও তাই। একটি কাজে লাল আলো চিহ্নিত। অর্থাৎ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সবার আগে এই কাজটি করতে হবে। লাল আলো বলছে আজ কবির অনির্ধারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা। বিগত ছ’মাসে কবির কোনো অসুখ করেনি। সর্দিও হয়নি। অবশ্য সাধারণ অসুখ-বিসুখ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু ভাইরাসজনিত রোগ পৃথিবী দখলের চেষ্টা চালায়। পৃথিবীর কিছু ক্ষয়ক্ষতি করে সত্যি কিন্তু পরাজয় মেনে বিদায় নিতে হচ্ছে ভাইরাসদের।
হঠাৎ স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি কেন? কৌত‚হলী হয়ে কবি ঘরে থাকা ‘হেলদি হিউম্যান হেলদি হোম’ যন্ত্রে মেডিকেল চেকআপ করিয়ে নিলো। শরীরের প্রতিটি অর্গানের সুস্থতা নির্দেশ করছে। টোটাল গড় মার্ক একশোর মধ্যে ছিয়াশি। কবির বয়সী একজন পুরুষের স্বাস্থ্যের জন্য ফলাফল যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক।
ডাক্তারের উষ্ণ অভ্যর্থনায় কবির দুশ্চিন্তা দূর হলো। সৌজন্য বিনিময়ের পর হাসিমুখে ডাক্তার
জিজ্ঞেস করল, কবি, তোমার কাব্য চর্চা কেমন চলছে?
লিখি না।
কেন? লিখ না কেন? তোমার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে? খুলে বলো।
কবিতার প্রাণ হচ্ছে আবেগ। তোমরা আবেগ কেড়ে নিয়েছো। লিখি কী করে?
আবেগ! ডাক্তার বিস্মিত হলো। ভ্রু কুঁচকে উঠলো। ভেবে পেল না আবেগ শব্দের অর্থ কী?
অনেক ভেবেচিন্তে বলল, তুমি আবার অতীতে ফিরে গেছো! তুমি আমাদের জাতীয় লক্ষ্য ভুলে যাচ্ছো। ‘সামনে তাকাও ভবিষ্যতে দেখ’। এই হচ্ছে বর্তমান স্লোগান। তুমি পেছনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছো কেন? আমরা অতীত ঝেরে ফেলেছি। আমাদের সকল কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ নিয়ে। তোমার অসুখ সাধারণ নয়। অসাধারণ। তুমি আমাকে ভোগাবে।
ডাক্তার কবিকে একটি যন্ত্রে ঢুকিয়ে দিল। সেখানে কবির মানসিক গঠন ও তার বিকাশের ইতিহাস নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি হলো। দুই নং রিপোর্টটি হলো কবির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কিছু কেস-হিস্ট্রি। ডাক্তার দুই নং রিপোর্টটি কবির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোমার সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। স্ট্যাডি করো। যথাসময়ে তোমাকে ডাকা হবে।
দৈনন্দিন কাজ শেষ করে কবি ক্যাপসুল রুমে নিজেকে বন্দি করে রাখলো। আজ সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস। আজ রাত থেকে পরবর্তী দুরাত প্রজনন দিবস। কর্মদিবসের রাতগুলো লকডাউনে থাকতে হয়। ভবিষ্যত সুখ সমৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রিত জন্মহার টিকিয়ে রাখার জন্য এ ব্যবস্থা।

কবির ইচ্ছে ছিল সোহানার সাথে আজ রাত কাটাবে। ডাক্তারের রিপোর্ট খুলে মন খারাপ হয়ে গেল। সোহানার কাছে যাওয়া হলো না।
কেস হিস্ট্রি ১: তারিখ ২০.০৪.৩০২০। ছুটির দিন : প্রজনন দিবস। অনেক দিন পর সোহানাকে নিয়ে আমি একটি প্রেমের কবিতা লিখেছি। প্রেমবিষয়ক কবিতার এখন তেমন কদর নেই। কিন্তু আমি লিখতে পেরে অভিভ‚ত। কবিতা হাতে আমার ক্যাপসুল থেকে সোহানার ক্যাপসুলে আমি আবেগের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে ছুটে গেছি। সুসজ্জিত সোহানা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও কামুক। আমার বাহু বন্ধনে ধরা দিতে সে ছুটে এলো। আমি তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ না করে হাঁটু ভেঙে বসে বললাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি, প্রিয়া। তারপর আমার স্বরচিত কবিতা পড়ে প্রেম নিবেদন করি।
সরাসরি সেক্সে না গিয়ে আমার এ-ই অদ্ভুত আচরণ সোহানাকে মর্মাহত করেছে। ভয়ও পেয়েছে। তার ধারণা আমি পাগল হয়ে গেছি। সে দ্রæত তার ক্যাপসুলে ফিরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।

ডাক্তারের মতামত : নর-নারীর মিলন আনন্দ জন্মহার রক্ষার্থে প্রজনন জরুরি। এখানে প্রেম ভালোবাসা অর্থহীন প্রাচীন কিছু শব্দের জঞ্জাল তৈরি করা এবং তার আচরণ মানসিক অসুস্থতা চিহ্নিত করে।

কেস হিস্ট্রি—২ : প্রযুক্তিবিদ্যায় পৃথিবী উন্নত শিখরে পৌঁছেছে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা আজ প্রতি ঘরে ঘরে। কিন্তু ধনী গরিব বৈষম্য আজও আছে। অফিসের পর বসন্তের সমীরণে ঘরে না ফিরে কবি হাজার বছর পথ হেঁটে যায়। খুঁজে বেড়ায় হাজার বছর পেছনে প্রোথিত শেকড়। ঘুরে বেড়ায় প্রাচীন নগরী ঢাকার অলিগলিতে। তখন এক কিশোরীর তীক্ষè চিৎকার কবিকে বর্তমান প্রযুক্তির নগরীতে ফিরিয়ে আনে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কবি লোকটাকে প্রহার করতে থাকে। কবির ক্রোধ ও লোকটির রক্তাক্ত চেহারা দেখে বিপন্ন কিশোরী সভয়ে পুনরায় চিৎকার করতে থাকে। পুলিশ এসে লোকটিকে রক্ষা করে।
ডাক্তারের মতামত : পুরনো দিনের মানুষদের মন তার ভেতর এখনো বর্তমান। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া একটি প্রাচীন সমস্যা। বর্তমানে এর বাহ্যিক প্রকাশ দেখে আমরা বিস্মিত ও ভীত। প্রাচীন ধ্যানধারণা ভুলতে না পারা ও আবেগ প্রবণতা কবিকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলেছে।

কেস হিস্ট্রি—৩ : কবি প্রেসিডেন্টকে একটি মেইল করল। আপনার সরকারের সুশাসনে আমি একজন সুখী মানুষ। আমার কোনো অভাব নেই। সমস্যা হচ্ছে কিছু শব্দ আমার ভেতর ফুল হয়ে ফুটতে চায়। প্রতিবাদী কথা বলতে চায়। ওরা সরকারের ছক মানতে রাজি নয়। ছকের বাইরে ওদের ইচ্ছে মতো চলার বলার স্বাধীনতা দিন।
স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় বলুন?
ডাক্তারের মতামত : সরকারি আইন লঙ্ঘন করা মানে দেশদ্রোহী। পাগলও হতে পারে। কবির চিকিৎসা জরুরি।
উপদেশ : কবি আমাদের আধুনিক শহরে ও সর্বোচ্চ প্রযুক্তিতে বসবাস করে। কিন্তু তার অন্তর এক হাজার বছর পুরনো এক শহরে ঘুরে বেড়ায়।
দ্বৈত মানসিক অবস্থান তার সমস্যা। তার দেহ ও মনকে এক কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনে সমাধানের চেষ্টা নেয়া যেতে পারে। এ জন্য কবির দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চিকিৎসা জরুরি।
এক মাস পর কবিকে পুনরায় ডাকা হলো। ডাক্তার অভ্যর্থনা করে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো কবি?
কবির রাগ হলো, আচ্ছা, তুমি আমাকে কবি বলো কেন?
কবিকে কবি বলবো না তো কী বলবো?
না, কবি বলবে না। আমি কবি নই। ছিলাম কোনো এককালে কোনো প্রাচীন শহরে।
শহরের বিশাল বিশাল মনিটরে প্রায়ই তোমার কবিতার চরণ ভেসে ওঠে। শুনতে পাচ্ছি তুমি কবিতা পরিষদের সভাপতি হতে যাচ্ছো।
না। ভুল শুনেছো। আমাকে কবি বললে কবিদের অপমান করা হয়। নিয়ন্ত্রিত কবিরা কখনো কবি হয় না।
ডাক্তার সহমর্মিতার সঙ্গে বলল, তোমার কিছু কিছু কবিতা আমি পড়েছি। সেখানে প্রায়ই এক প্রাচীন শহরের কথা বলা হয়েছে।
কবি বলল, এক হাজার বছর পুরনো আমার প্রিয় ঢাকা শহর।
তোমাকে যদি বলা হয় তুমি বর্তমানকে চাও, না অতীতকে? স্মৃতির শহর ঢাকাকে চাও, নাকি বর্তমান যে শহরে বসবাস করছো তাকে চাও?
তোমার উত্তর কী হবে?
আমার দুই-ই চাই। শেকড় ছাড়া আমি বাঁচাব না। শেকড় আমার স্মৃতি। আমার অতীত। বর্তমানে আমি নিশ্বাস নেই। বর্তমান আমার ক্লোরোফিল।
ডাক্তার দুঃখিত গলায় বলল, কবি, আমি তোমাকে সুস্থ করে তুলতে চাই। তোমাকে এক লক্ষ্যে ফিরতে হবে। বর্তমানে আসো। নইলে অতীতে যাও। যে কোনো একটি পথ বেছে নাও।
কবি বলল, আমার অপরাধ আমার ভেতর এখনো পুরনো মূল্যবোধের মানবিক গুণাবলী টিকে আছে। তোমাদের মতো উন্নত যান্ত্রিক মানুষ হতে পারিনি। আমার জন্য সত্যি যদি কিছু করতে চাও আমাকে লেখার স্বাধীনতা দাও।
ডাক্তার দুঃখের সঙ্গে বলল, আমার কিছু করার নেই। তোমার মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য তোমাকে নির্জন বাসে যেতে হবে। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তোমার কবিতা লেখা নিষিদ্ধ। তোমার জন্য আমি সমাজকে দূষিত করতে পারি না। দুঃখিত কবি।
কবি মৃদু হাসল, নিয়ন্ত্রিত কবিতা লেখার চেয়ে না লেখার যন্ত্রণা অনেক আনন্দের। অনেক সময় কবিতা না লেখার কবির যন্ত্রণার নীরব মুহূর্তগুলো কখনো কখনো ভয়ঙ্কর অস্ত্র হয়ে ওঠে।
ইতিহাস ভুলে যেও না, ডাক্তার।

কবির কথায় ডাক্তার বিব্রত হলো। কবির নির্জন বাসের যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে থেকে ডাক্তারের দুঃখ হলো। কবি সময়ের চাহিদা পূরণ করে নিজেকে যোগ্য করতে পারেনি। তাই আজ কবির এই পরিণতি। নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারায় ডাক্তার তৃপ্তি বোধ করল। মন থেকে অস্বস্তি ঝেরে ডাক্তার নতুন উদ্যমে ছুটলো নতুন কাজে নতুন মিশনে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close