দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পুলিশের নিরাপত্তা পরামর্শ

আগের সংবাদ

সাগরে গভীর নিম্নচাপ, সমুদ্রবন্দরে ৪ নম্বর সংকেত

পরের সংবাদ

কবির অন্তিমের দিনগুলি

প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২০ , ৯:৪৩ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০২০ , ৯:৪৫ অপরাহ্ণ

জীবন-মরণের অবিরাম সংগ্রাম চলছিল এতো দিন। শ্বাসকষ্ট, অনিদ্রা। তারপর এক সময় রুদ্ধ হলো সেই শ্বাস। চিরনিদ্রায় অভিভূত হলেন কবি। তখন এগারোটা পঁয়ত্রিশ। প্রার্থনা প্রতীক্ষা, এতো যে প্রত্যাশা, সবই ব্যর্থ। সেই মৃত্যু-স্তব্ধতার বুক চিরে ঘোষিত হলো এক নির্মম মর্মান্তিক সত্য। কবি নেই।

অন্নদাশঙ্কর রায় তাকে অভিহিত করেছিলেন ‘শুদ্ধতম কবি’ হিসেবে। জন্ম বরিশাল শহরে। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এই বরিশাল শহরেই কেটেছে তার বাল্য, কৈশোর ও প্রথম যৌবন। বরিশালের বিএম কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনাও করেছেন। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মৃত্যু, কলকাতায়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর। ‘এ পৃৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।’ বলছি কবি জীবনানন্দ দাশের কথা। ক্ষুদ্র এই নিবন্ধে বিদ্ধৃত হচ্ছে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার অন্যতম পথিকৃৎ কবির জীবনের বেদনাবিধুর শেষ দিনগুলির কথা।

নির্জনতার কবি হিসেবে পরিচিত এই মানুষটি কেমন ছিলেন? কেমন দেখতে? কেমন ছিল তার স্বভাব-আচরণ? জানবার কৌত‚হল হওয়াটা স্বাভাবিক। দেশবরেণ্য কবি শামসুর রাহমান ১৯৫৩ সালে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের সাহিত্য মেলায়। পূর্ববাংলা থেকে চার সদস্যের সাহিত্যিক প্রতিনিধিদলের একজন ছিলেন তিনি। সেটা কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর আগের বছর।

জীবনানন্দ- সন্দর্শনের বয়ান কবি শামসুর রাহমানের জবানীতে একটুকুনি জানা যাক। তিনি লিখছেন, ‘শান্তিনিকেতনে কয়েকটি আনন্দমুখর দিন কাটানোর পর কলকাতায় এলাম কবিবন্ধু নরেশ গুহর সঙ্গে। কায়সুল হক আর আমি। নরেশ গুহর ফ্ল্যাটে চার-পাঁচদিন ছিলাম আমরা এক উদার আতিথেয়তার মধ্যে। পাঁচ নম্বর সত্যেন দত্ত রোডের সেই ফ্ল্যাটটির স্মৃতি কখনো ম্লান হবার নয়। মেঝেতে শুয়ে, মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে, কবিতা বিষয়ে তুমুল আলোচনা ক’রে চোখের পলকে কেটে গেলো কলকাতার দিনগুলো। একদিন সকালে নরেশ গুহকে বললাম, ‘জীবনানন্দ দাশকে দেখতে চাই’। তিনি আমার কথা শুনে অত্যন্ত প্রীত হলেন।

ফলে সেই সকালেই আমরা হাজির হলাম ল্যান্সডাউন রোডের সেই নিমগাছঅলা একতলা বাড়িতে, যেখানে থাকেন আধুনিক বাংলা কবিতার প্রবাদপ্রতিম পঞ্চপুরুষদের অন্যতম, বাংলা কাব্যের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ। কড়া নাড়ার আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দাঁড়ালেন তিনি, আমরা মুখোমুখি হলাম তার, যার ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’কে নিবেদন করেছিলাম একটি বিনিদ্র রাত, যার কবিতাবলী বারবার তরঙ্গিত হয়ে ওঠে আমাদের চেতনায়, আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান স্থপতি যিনি। তাকে বড়ো অপ্রস্তুত আর বিব্রত মনে হলো আমাদের, অনেকটা সমুদ্রবিহঙ্গ আলবাট্রসের মতো। হেঁটে গেলেন বারান্দার দিকে প্রায় কোনো কথা না বলে। বারান্দায় পৌঁছে তিনি এদিকে ওদিকে দৃষ্টিপাত করলেন, আমরা চটজলদি ঝকঝকে বারান্দায় বসে পড়লাম। আমাদের এই আচরণে স্বস্তি পেলেন কবি, তিনি নিজেও হাসিমুখে বসলেন বারান্দায়। বোঝা গেলো, বসতে দেবার মতো যথেষ্ট চেয়ার কিংবা অন্য কোনো আসন বাসায় নেই। যার আসন আমাদের হৃদয়ে, তিনি আমাদের কোনো আসন দিতে পারলেন কি পারলেন না, তাতে কিছুই আসে যায় না। আমরা নিবিড় হয়ে বসলাম, আনন্দ ও ভক্তিতে ভরপুর। একটি বৃত্ত রচিত হলো, যার ব্যাস প্রায় পুরোটাই গৃহকর্তা জীবনানন্দ দাশ।

বলতে দ্বিধা নেই, জীবনানন্দ দাশকে দেখে আমি হতাশ হয়েছিলাম। দেখতে মোটেই কবির মতো নন তিনি। কালো, স্থ‚লকায়, চেহারা বৈশিষ্ট্যবর্জিত। চোখে ছিল এক ধরনের মায়া। আর তার হাসি ছিল জোরালো এবং খাপছাড়া। যিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কিংবা বিষ্ণু দে’র মতো কান্তিমান নন, তিনি কী করে এমন রহস্যসমৃদ্ধ, আশ্চর্য রূপসী কবিতা লিখেছেন, এমন একটি প্রশ্ন আমাকে ক্ষণিকের জন্য বিচলিত করেছিল। কথাবার্তায় ব্রিবত, প্রায় সারাক্ষণ, অতল লাজুকতায় নিমজ্জিত, সব রকমের কোলাহল থেকে সর্বদা পলায়নপর এই অসামান্য শিল্পী মানুষটির দিকে বিস্ময়ে তাকিয়েছিলাম অনেকক্ষণ।

জানি, তিনি কোনো সাহিত্য আন্দোলনের নায়ক ছিলেন না, ছিলেন না কোনো রাজনৈতিক দল বা মতের প্রচারক, তার দ্বারা সাধিত হয়নি কোনো জনহিতকর কাজ, শুধুমাত্র কাব্যক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল তার সুকৃতি। এবং এও এক আশ্চর্য ঘটনা যে, যিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের ত্রিসীমানায় ঘেঁষেননি, তার কবিতার পঙ্ক্তিমালা আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে।

সেবারই জীবনানন্দ দাশকে আরো একবার দেখলাম চারুচন্দ্র কলেজ থেকে বেরুবার পথে। নরেশ গুহ বললেন, ‘ঐ যে জীবনানন্দ দাশ যাচ্ছেন।’ চেয়ে দেখি রাস্তার ওপারে ভিড় উজিয়ে ছাতা মাথায় নিরিবিলি হেঁটে চলেছেন তিনি। মনে পড়লো তার অবিস্মরণীয় পঙ্ক্তি, হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে। ‘যাবেন নাকি রাস্তার ওপারে কবিকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য?’ নরেশ গুহর প্রশ্ন। আমি জবাব দিলাম, ‘কবিকে বিব্রত করে কী লাভ? দূর থেকেই দেখি।’ দেখলাম, তিনি হেঁটে যাচ্ছেন একা। তিনি হাঁটছেন, যেন কলকাতার ভিড়াক্রান্ত পথে নয়, অসীমের ধু ধু সৈকতে। তার পাশাপাশি নিঃশব্দে চলেছে আরেকজন, অমরতা।

একদিন রাস্তা পেরোতে গিয়ে ঘটে গেল অঘটন। অন্যমনস্ক ছিলেন। ট্রাম দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হলেন কবি। জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তাকে ভর্তি করা হলো শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। কোমর থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ব্যান্ডেজ তার। মুখ স্ফীত, বিকৃত। চেনা যায় না। অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। প্রতিবেশী বন্ধু সুবোধ রায় যখন দেখতে এলেন, তাকে দেখে হাসলেন অস্বাভাবিক ম্লান হাসি। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘এসেছেন? কি সব হয়ে গেল, বাঁচবো তো?’ একদিন তাকে দেখতে এলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান রায়। মুখ্যমন্ত্রী আসার পরে রোগীর গুরুত্ব আগের চাইতে অনেক বেশি বেড়ে গেল।

সুবোধ রায়ের স্মৃতিচারণায় কবি জীবনানন্দ দাশের অন্তিম দিনগুলির একটা ছবি আমরা পাই। ‘জীবনানন্দ স্মৃতি’ শিরোনামের লেখায় তিনি বলেছেন বিস্তারিত। “ফিডিং কাপে মুসুম্বির রস খাওয়াচ্ছিলেন কবির অতি আদরের অক্লান্ত সেবাপরায়ণা বোন শ্রীমতী সুচরিতা। মাথার চুলগুলি বিলি ক’রে দিচ্ছিলেন শ্রীমতী লাবণ্য দাশ। হঠাৎ বলে উঠলেন কবি, ‘ভারি সুন্দর জল, মানে রপবফ ধিঃবৎ আরমুসুম্বির রস। অপূর্ব।’ ভেতরে দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। বুকটা খাক হয়ে যাচ্ছে পুড়ে। ঠাণ্ডা জল ত লাগবেই ভালো। কিন্তু তখন বুঝিনি সে-কথা। বুঝলাম এক্স-রে পরীক্ষার ফলাফল জেনে। সাতখানা পাঁজরের হাড় নেই, চুরমার হয়ে গেছে বুক, রক্তক্ষরণ হচ্ছে সর্বক্ষণ। ফুসফুসও জখম হয়েছে।

একদিন বললেন আমায়, ‘যারা যারা আসছেন, নাম, সময়, ঠিকানা সব লিখে রাখবেন। যেন ভুল না হয়। লাবণ্যকেও বলেছি। কিন্তু ও তো সবাইকে চেনে না।’ তারপর ধীরে ধীরে এলো একটা আচ্ছন্ন, মুহ্যমান ভাব। কথা বলেন আর ঘুমিয়ে পড়েন। অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, বোঝা যায়।

২২ অক্টোবর, শুক্রবার। সকাল থেকে কথা বন্ধই হয়ে গেলো কবির। কিছুই খাওয়ানো গেলো না। ব্লাড-ব্যাংক থেকে রক্ত আনা হয়েছিল। বৃথাই পড়ে রইলো শেষ পর্যন্ত। আলোর মতো, জলের মতো, কাচের মতো স্তব্ধ হয়ে আসছে সব। বুঝলেন কবিপত্নী। সামলাতে পারলেন না সে প্রচণ্ড আঘাত। কিছু শিহরণ, কয়েক ফোঁটা অশ্রু। মাটিতে লুটিয়ে পড়লো তার বিবশ মূর্ছিত দেহ।

জীবন-মরণের অবিরাম সংগ্রাম চলছিল এতো দিন। শ্বাসকষ্ট, অনিদ্রা। তারপর এক সময় রুদ্ধ হলো সেই শ্বাস। চিরনিদ্রায় অভিভ‚ত হলেন কবি। তখন এগারোটা পঁয়ত্রিশ। প্রার্থনা প্রতীক্ষা, এতো যে প্রত্যাশা, সবই ব্যর্থ। সেই মৃত্যু-স্তব্ধতার বুক চিরে ঘোষিত হলো এক নির্মম মর্মান্তিক সত্য। কবি নেই। নেই সে নিত্য দীপ্যমান কবি। জীবনের ভিড়ে অনুপস্থিত আজ জীবনানন্দ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো এক অনন্যসাধারণ প্রতিভা। রবীন্দ্রোত্তর বাংলার এক বিশিষ্টতম কবি গায়ের রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে বিলীন হলেন কোন অন্ধ তমিসায় না রূপাতীত কল্পলোকে কে জানে!

ইতোমধ্যে দোতলা থেকে এক তলায় নামানো হলো কবির মৃতদেহ। ঘিরে দাঁড়ালেন আত্মীয়, বন্ধু সবাই। শবানুগমনের জন্য সবাই প্রস্তুত। তুলতে যাবে শবাধার, এমন সময় আর্ত কণ্ঠে ডুকরে উঠলেন শোকবিহ্বলা অবাঙ্মুখী কবিজায়া। মৃত স্বামীর মুখের পানে স্থির, নিবদ্ধ দৃষ্টি, ‘সারা জীবন লেখা লেখা করেই পাগল হয়ে ছিলে, প্রাণ দিলে শুধু লেখাতেই। আর আজ, তুমি চ’লে গেলে। তোমার লেখাই শুধু পড়ে রইলো।’ এক স্বতঃস্ফ‚র্ত গাঢ় বেদনা বিদীর্ণ হলো সেই আর্ত-করুণ কণ্ঠে। সে-মর্মভেদী সুর সবার অন্তরে অনুরণিত হল অনেকক্ষণ।”

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close