সৃজিত-মিথিলাকে পূজার উপহার পাঠালেন মমতা

আগের সংবাদ

পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণায় বছর পার, তবুও হাইব্রিড!

পরের সংবাদ

ঋণখেলাপির পোয়াবারো!

প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২০ , ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০২০ , ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ

 বিশেষ সুবিধার অপব্যবহার

বিপাকে পড়বে ব্যাংকগুলো

সরকারের নির্দেশে চলতি বছরের এপ্রিল থেকেই ঋণের সুদহার কমিয়ে ৯ শতাংশ করা হয়। তখন থেকেই আয় কমতে থাকে ব্যাংকগুলোর। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয় মহামারি করোনা ভাইরাস। কোভিড-১৯ এর প্রভাবে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় ব্যাংকের কমিশনও তলানিতে ঠেকে। এদিকে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে একটানা ঋণ আদায় বন্ধ রয়েছে। বেশির ভাগ মেয়াদি ঋণের গ্রাহকই এ সুযোগে ঋণ পরিশোধ করছেন না। বিশেষ এ সুবিধা আশীর্বাদ হয়ে আসে ঋণখেলাপিদের জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সুবিধায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ার কথা থাকলেও পরিসংখ্যানে দেখা যায় এর উল্টো চিত্র।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ কমানো যাবে না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের যত সুবিধা দেয়া হবে, তারা মনে করবে আরো সুবিধা পাওয়া যাবে। এজন্য খেলাপি কমানোর জন্য কঠোরভাবে ঋণ আদায় করতে হবে। পুনঃতফসিল ও হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ নিয়ে ঋণ ফেরত দিচ্ছে না। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে এদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে কোর্টে এক্সক্লুসিভ বেঞ্চ গঠন করা উচিত ঋণখেলাপিদের শাস্তি দিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের সর্বশেষ যে হিসাব দিয়েছে তাতে দেখা যায়, গত জুন শেষে আরো সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। এতে ঋণখেলাপিদের কাছে আটকে আছে মোট আড়াই লাখ কোটি টাকা। এ সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও আড়াই লাখের বেশি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, খেলাপি কমানোর জন্য কঠোরভাবে ঋণ আদায় করাই হবে একমাত্র পদক্ষেপ। তাদের মতে, প্রয়োজনে কোর্টে এক্সক্লুসিভ বেঞ্চ গঠন করার মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা।

ব্যাংকাররা বলেন, গত জানুয়ারি থেকেই ঋণখেলাপি নীতিমালায় ছাড় দেয়া হচ্ছে। প্রথমে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত, পরে সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়। ছাড় দেয়া সময়ের মধ্যে ছোট বড় প্রায় সবধরনের ঋণগ্রহীতাই ঋণ পরিশোধ করছেন না। তাদের মতে, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এমনিতেই কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বরং এর পরিবর্তে বিভিন্নভাবে ছাড় দেয়ায় রাঘব বোয়াল ঋণখেলাপিদের মধ্যে ঋণ পরিশোধে একধরনের অনীহা বিরাজ করছে। এখন আবার ছাড় দেয়ায় আরো সুযোগ পেয়ে যান ইচ্ছেকৃত ঋণখেলাপিরা। ফলে এতদিন ব্যাংকের কোনো ঋণ আদায় হয়নি বললেই চলে। বিপরীতে আমানত প্রত্যাহারের চাপ বেড়ে গেছে। এতে ব্যাংকের আয় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, সেপ্টেম্বরের পর ঋণ আদায় করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু আরো ৩ মাসের সময় দেয়ায় পুরো বছরই কোনো কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। এতে ব্যাংকগুলো চরম বেকায়দায় পড়ে গেছে।

বেসরকারি ব্যাংকের এক ঊধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একটানা ১ বছর ঋণ পরিশোধ না হলে আগামীবছরের জানুয়ারি থেকে হঠাৎ করে ঋণ আদায়ের ওপর চাপ পড়বে। কারণ অনেকেই একটানা ঋণ পরিশোধ করছেন না। জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারের কার্যকারিতা থাকবে না। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধ না হলেই খেলাপি হয়ে যাবে। আগের ১২ মাসের কিস্তি বকেয়া থাকায় ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে ১২ মাসের কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন না। আর ১২ মাসের পুঞ্জীভূত ঋণের কিস্তি আদায় না হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ করে বেড়ে যাবে। আর হঠাৎ করে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করা কষ্টকর হবে। সব মিলিয়ে সামনে ব্যাংকগুলো অনেকটা দুর্দিনে পড়ে যাবে। তিনি বলেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ বন্ধ রাখায় যারা আগে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারাও এখন আর ব্যাংকের ধারের কাছে আসছেন না। ঋণ আদায় না হওয়ায় প্রতি মাসেই পুঞ্জীভূত ঋণের ওপর সুদ বেড়েই যাচ্ছে। এ সুদ হিসাবের খাতায় যোগ করা হচ্ছে। বাস্তবে কোনো আয় হচ্ছে না। এতে সামনে ব্যাংকগুলো দুই ধরনের সমস্যায় পড়বে। প্রথমত, গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারের কারণে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ঋণখেলাপি করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত আয় না করে কৃত্রিম আয় দেখাতে গিয়ে সরকারের ৪০ শতাংশ হারে করপোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে। কারণ ব্যাংকগুলো মুনাফা দেখালেই তার ওপর করপোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। শুধু তাই নয়, সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদেরও মুনাফা বণ্টন করতে হবে। আবার মুনাফা দেখানো না হলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা বঞ্চিত হবেন।

ঋণখেলাপি করা যাবে না, তবু বাড়ছে খেলাপি : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা; যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগে গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে ৯২ হাজার ৫১১ কোটি টাকায় নামে। মোট ঋণের যা ছিল ৯ দশমিক৬ শূন্য ৩ শতাংশ। মাত্র ৩ মাসে বেড়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হালিম চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার ফলে নতুন করে কোনো ঋণ আর খেলাপি করা হচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরনো কিছু ঋণখেলাপি করে দেয়ায় জুনে সামান্য বেড়েছে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ না বাড়লেও বকেয়া কিস্তির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। কিস্তি না দিলেও খেলাপি না করার এ নির্দেশনা তুলে নিলে দেখা যাবে, খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে।

পাঁচ ব্যাংকেই অর্ধেক খেলাপি ঋণ : করোনার মধ্যেই ব্যাংকিং খাতের সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরে ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা গেছে, দেশে কার্যত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৫ ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বাকি ৫৫ ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে ১০ ব্যাংকের কাছেই খেলাপি ঋণ রয়েছে ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বাকি ৫০ ব্যাংকে খেলাপির হার ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বড় একটি অংশ পুনঃতফসিল হয়েছে। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পেয়েছে ঋণখেলাপিরা। ২০১৯ সালের ১৬ মে নীতিমালায় এ ছাড় দেয়ার পর থেকে বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতফসিল হয়েছে ১৮ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বিদায়ী বছরে পুনঃতফসিল হয়েছে ৫০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিল করেছে ৩০ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ৮টি ব্যাংক ১৯ হাজার ৬০১ কোটি টাকা এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো ৩৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। এছাড়া গত মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) করেছে ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে এ অর্থ বাদ যাবে, যদিও তা আর ফেরত আসছে না।

আড়াই লাখের বেশি বিচারাধীন মামলা : চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ঋণখেলাপিসংক্রান্ত বিচারাধীন মামলা ২ লাখ ৫০ হাজার ৬৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। মামলাগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের দাবি ১ লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। বিচারাধীন মামলাগুলো থেকে গত ৬ মাসে ব্যাংক আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৪ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা থেকে ব্যাংকগুলোর আদায় হয় ৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। ওই সময়ে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩০২ কোটি টাকা আদায়ে ২ লাখ ৫৪ হাজার ২০৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ে ৬ হাজার ৭৩৫টি নতুন মামলা করেছে। এ সময়ে আগের মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ হাজার ৩০৪টি। তবে এসব মামলায় ব্যাংক ৭ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা দাবি করে মামলা করলেও আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৫০১ কোটি টাকা, যা মোট দাবির মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, আদালতে মামলার পর তা দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুলে যায়। আবার যা দুয়েকটি মামলার রায় হয় তার থেকেও আদায় অনেক কম হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় গিয়ে ব্যাংক তার অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং ঋণখেলাপিরা টালবাহানার সুযোগ পাচ্ছে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়