অবৈধ অনুপ্রবেশে ভারতীয় ৩ নাগরিক আটক

আগের সংবাদ

দর্জির কাজ শিখতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার তরুণী

পরের সংবাদ

‘পানিশমেন্টের’ ভয় মানুষকে কি ‘ডিসিপ্লিন’ করে?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৭, ২০২০ , ৬:২৭ অপরাহ্ণ

ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

সিলেটের এমসি কলেজ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ধর্ষণবিরোধী একটা তীব্র প্রতিবাদ এবং সামাজিক আন্দোলন সমাজের সর্বস্তরে লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কিন্তু পাশাপাশি হতাশা-নির্দেশক ঘটনাও আমরা লক্ষ করেছি যে, গোটা দেশব্যাপী যখন তীব্র আন্দোলন চলছে তখন প্যারালালভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সমানতালে পাল্লা দিয়ে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এটার একটা অর্থ দাঁড়ায় যে সামাজিক আন্দোলনকে বুড়ো আঙুল দেখানে।

শিরোনামটা হবে আদতে ‘শাস্তি’র ভয় মানুষকে কি ‘লাইনে’ আনে? কিন্তু আমি লিখেছি ‘পানিশমেন্টের’ ভয় মানুষকে কি ‘ডিসিপ্লিন’ করে, কারণ আমি এখানে বিংশ শতকের প্রভাবশালী ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুঁকোর বিখ্যাত কিতাব ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশড’ (১৯৭৭)-এর কেন্দ্রীয় আর্গুমেন্টকে মূল ধরে সাম্প্রতিক ধর্ষণবিরোধী সামাজিক আন্দোলন, ধর্ষকের শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডকরণ এবং এ সম্পর্কিত জনপরিসরে জারি থাকা পাবলিক ডিসকোর্সগুলো নিয়ে খানিকটা বাতচিৎ করব। তাই মূলকে মুলা ধরে আগানোর বাসনায় কিতাবের নাম কর্জ করে লেখার শিরোনাম করেছি। তাই শিরোনামের বাংলিশ মার্জনা করবেন।

এটা মোটামুটি সাধারণ্যে জানা ইতিহাস যে, সিলেটের এমসি কলেজ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ধর্ষণবিরোধী একটা তীব্র প্রতিবাদ এবং সামাজিক আন্দোলন সমাজের সর্বস্তরে লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কিন্তু পাশাপাশি হতাশা-নির্দেশক ঘটনাও আমরা লক্ষ করেছি যে, গোটা দেশব্যাপী যখন তীব্র আন্দোলন চলছে তখন প্যারালালভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সমানতালে পাল্লা দিয়ে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এটার একটা অর্থ দাঁড়ায় যে সামাজিক আন্দোলনকে বুড়ো আঙুল দেখানো, অন্যদিকে আরেকটা অর্থ দাঁড়ায় মিডিয়া হয়তো ধর্ষণবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে প্রণোদনা দিতে ধর্ষণের ঘটনাগুলো অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ ও প্রচার করছে। দুটির যেটাই হোক না কেন, সমাজে যে ধর্ষণকর্ম জারি আছে এ ঘটনাবলি তারই সাক্ষ্য বহন করে। তবে আশার কথা এই যে, রাষ্ট্র জনগণের আবেগকে মূল্য দিয়ে, ধর্ষণবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধের প্রতি সম্মান দিয়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের একটি অন্যতম দাবি, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার ব্যাপারে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন সংশোধন করছে। যা ইতোমধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপ্রতি কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে আইনে পরিণত হয়েছে। যেহেতু পার্লামেন্ট এখন চলমান নেই, সেহেতু আগামী পার্লামেন্টে এ আইনের অনুমোদন দেয়া হবে। তথাপি আইনগতভাবে ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’- এ আইন প্রয়োগে কোনো বাধা নেই। ইতোমধ্যে একটি ধর্ষণ মামলার রায়ে আদালত নতুন আইনের প্রয়োগ করে পাঁচজন ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে রায় প্রদান করেছেন। আমরা এ পুরো প্রক্রিয়াটিকে সাধুবাদ জানাই।

সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম দাবি ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ হলেও ‘মৃত্যুদণ্ডের ভয়’ দেখিয়ে ধর্ষণ কমানো বা ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধ করা যাবে কিনা এরকম একটি প্রশ্ন সমাজের অভ্যন্তরেই তৈরি হয়েছে। কেননা যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিন্তু তাই বলে খুনের ঘটনা সমাজে তো কমেনি। তাই শাস্তির ভয় দেখিয়ে ধর্ষণের ঘটনা বন্ধ বা হ্রাস করা যাবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখানেই ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুঁকোর বহুল পঠিত এবং জনপ্রিয় কিতাব ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশড’-এর আলোচনা বেশ প্রাসঙ্গিক। ফুঁকোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইতিহাসে পানিশমেন্ট বা শাস্তির আরম্ভ হয়েছিল প্রধানত সমাজে ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বাসনায়। এবং সে কারণেই এক সময় শাস্তি কার্যকর করা হতো প্রকাশ্যে। আর শাস্তির ভয়াবহতা এমন ছিল যে, অন্যরা প্রকাশ্যে কার্যকর হওয়া সে শাস্তি দেখে যেন ভীত হয়, যাতে কেউ পরবর্তী সময়ে সে একই অপরাধ করতে সাহস না পায়। বিশেষ করে প্রকাশ্যে শিরোচ্ছেদ করা কিংবা শূলে চড়ানো বা প্রকাশে ফাঁসি কার্যকর করা প্রভৃতি সমাজের একটা ভীতির সঞ্চার করত। আর চার রাস্তার মোড়ে, কিংবা হাট-বাজারের কেন্দ্রে, কিংবা পাবলিক গ্যাদারিং স্পেসে এসব শাস্তি দেয়া হতো, যাতে সমাজে একটা ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করা যায়। ফুঁকোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী সমাজকে ‘লাইনে’ আনার জন্য এটা জরুরি ছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল, যাদের প্রকাশ্যে শাস্তি দেয়া হতো, তাদের প্রতি মানুষের সমবেদনা জন্মাতে শুরু করে। যার ফলে শাস্তি যারা দিচ্ছেন তারা বা শাসকশ্রেণি পরিণত হলেন ভিলেনে আর যাদের অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হলো, তারাই ‘হিরো’তে পরিণত হলেন।

এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্র, রাজা-মহারাজা এবং শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে একটা তীব্র ক্ষোভ তৈরি করতে শুরু করে। তখনই সমাজের ডিসিপ্লিনের জন্য পানিশমেন্টের তরিকা পাল্টানো হলো। জন্ম হলো জেলখানার বা কারাগারের, যাকে ফুঁকো ব্যাখ্যা করছেন, ‘দ্য বার্থ অব দ্য প্রিজন’। এটারও একটা অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, অপরাধীকে কারাগারে পুরে দিয়ে সমাজ, পরিবার ও আত্মীয়-পরিজন থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা, যাতে করে তাকে শারীরিক এবং মানসিক উভয় প্রকার কষ্ট দিয়ে ‘একাকিত্বের’ শাস্তি প্রদান করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব গ্রিসের ‘নগর রাষ্ট্র’ থেকে শুরু একবিংশ শতাব্দীর আজকের আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে হাজার হাজার কারাগার বা জেলখানা তৈরি করা হয়েছে এবং অলিখিত, সনাতন, মৌখিক এবং রীতিভিত্তিক বিধি-বিধান থেকে শুরু করে আজকের নানা আইনকানুন তৈরি হয়েছে অপরাধীকে কীভাবে শাস্তি দেয়া যায় তার বহুমুখী হিসাব-নিকাশ করে। কিন্তু সমাজ কি অপরাধমুক্ত হয়েছে? সমাজে কি অপরাধ হ্রাস পেয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি নির্দ্বিধায় ‘হ্যাঁ’ বলে দেয়া যেত তাহলে আমি খুশিই হতাম। কিন্তু এসব জিজ্ঞাসার উত্তর কি নির্দ্বিধায় ‘হ্যাঁ’ বলে দেয়া যাবে? এটা নিয়ে আমরা সবাই দ্বিধান্বিত! কিন্তু কেন?

এ দ্বিধা দূর করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক কাঠামোর অভ্যন্তরে এক ধরনের ইতিবাচক সামাজিক রূপান্তর। সমাজের অভ্যন্তরে একটা ইতিবাচক কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। পুরুষকে সমাজে কর্তা হিসেবে আমরা উপস্থাপন করি। ফলে কর্তার সঙ্গে যে কর্তৃত্বের সম্পর্ক আছে সেটা সমাজকে পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষশাসিত করে তুলেছে। বাংলাদেশের সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতা (পেট্রিয়ার্কি) বোঝাতে নৃবিজ্ঞানী কোট্টালোভা একটি চমৎকার এথনোগ্রাফি লিখেছেন, যার হচ্ছে ‘বিলংগিং টু আদার’ (১৯৯৩) অর্থাৎ বাংলাদেশের সমাজে নারীরা কোনো না কোনোভাবে অন্যের (পুরুষের) পরিচয়ে বা অন্যের কর্তৃত্বে বা অন্যের অধীনে থাকেন। বিয়ের আগে এটা ‘অমুকের মেয়ে’। আর বাবা না থাকলে ‘এটা অমুকের বোন’। বিয়ের পরে ‘এটা অমুকের বউ’। এমনকি স্বামী মারা গেলে ছেলে বড় হলে ‘এটা অমুকের মা’। কিন্তু স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে ‘এটা অমুক’ হয়ে উঠে খুব কম সংখ্যক নারী। এভাবেই সমাজের পুরুষই কর্তা হিসেবে জারি আছে। তাই নারী পুরুষের কর্তৃত্বের অধীন। উল্লেখ্য, এসব আলোচনা খুবই সাধরণীকরণ মনে হতে পারে, কেননা নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারী উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু সেটা প্রায় পুরোটাই নগরকেন্দ্রিক। মেট্রোপলিটিন রিপ্রেজেন্টেশন। দেশের সামগ্রিক চিত্র নয়। সুতরাং সমাজের বিদ্যমান পেট্রিয়ার্কি-কাঠামো জারি রেখে, নারী-পুরুষের ক্ষমতার অসম সম্পর্ক জারি রেখে, বিদ্যমান সামাজিক রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার এবং আদব-কায়দার ডিসকোর্সে ‘ভালো মেয়ে’ বনাম ‘খারাপ মেয়ে’ দ্বৈরথ জারি রেখে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য, জঘন্য এবং বর্বর অপরাধ শুধু আইন করে কমানো যাবে কিনা সে উত্তর কখনই দ্বিধাহীন হবে না।

মনে রাখতে হবে, ধর্ষণ কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটা আর দশটা সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও নয়, এটা নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্ববাদিতার অনুশীলন এবং নারীর প্রতি বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। পরিবারের গণ্ডিতেই নানামুখী ছেলেমেয়েভিত্তিক বৈষম্যমূলক চর্চার ভেতর দিয়ে, সমাজের মান্ধাতার সামাজিকীকরণের ভেতর দিয়ে, সমাজে বিদ্যমান নারী-পুরুষের অসম ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে, কো-এডুকেশনবিরোধী বিদ্যমান শিক্ষা-কাঠামোর ভেতর দিয়ে, সমাজের বিদ্যমান লৈঙ্গিক সম্পর্কের অসম ক্ষমতার কসরতের ভেতর দিয়ে, অথনৈতিক বৈষম্যের জেন্ডার-ইনসেনসিটিভিটির ভেতর দিয়ে, গার্হস্থ্য-ব্যবস্থাপনার লৈঙ্গিক শ্রম বিভাগের অধিপতিশীল কাঠামোর ভেতর দিয়ে এবং ইতিহাসের পরম্পরার মেসকুলিনিটির আধিপত্যবাদের ভেতর দিয়ে সমাজের বিদ্যমান নারীর প্রতি এ ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ তৈরি হয়েছে। তাই সমাজেরই ভেতর থেকে উঠে আসা এ প্রশ্ন মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, ধর্ষণের মতো বর্বরতা কি কেবলই আইন করে রোধ করা যাবে? ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। রাষ্ট্রের কাজ রাষ্ট্র করেছে। কিন্তু আমাদের কাজ কী? কেবলই রাষ্ট্রের ঘাড়ে সব দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকা? আসলে রূপান্তের স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা তৈরি করতে হবে সমাজের অভ্যন্তর থেকেই। রাষ্ট্রের দেয়া ওষুধ ‘টপ ডাউন’ (ওপর দিয়ে দেয়া) কিন্তু ধর্ষণের প্রতিকারের জন্য প্রয়োজন ‘বটম-আপ’ (নিচ থেকে উঠে আসা) ওষুধ। আর সেটা সম্ভব, নারীর প্রতি সমাজের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর একটি তীব্র এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কেননা এতদিনের জমাট বাঁধা পাথর কেবলই মৌসুমি আন্দোলনে গলবে না।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

এসআর