সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রচারণায় সাইক্লিস্টদের কুয়াকাটা যাত্রা

আগের সংবাদ

লাপাত্তা এসআই আকবর, হদিস পাচ্ছেনা পুলিশ

পরের সংবাদ

জয়তু ইলা মিত্র

গোপাল নাথ বাবুল

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৭, ২০২০ , ৬:১৬ অপরাহ্ণ

নতুন প্রজন্মের কাছে ইলা মিত্রের সংগ্রামী জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা উচিত। কেননা ইতোমধ্যে হাজি কিয়ামউদ্দিন ও আমিনুল ইসলামরা ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি ও শত শত বিঘা সম্পত্তি দখল করে বসে আছে। এদের হাত থেকে এ বাড়ি ও সম্পত্তিগুলো দখলমুক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ ও দর্শনীয় করে কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস রক্ষা করতে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।

স্বপ্ন ছিল সফল বিপ্লবের মাধ্যমে বৈষম্যপীড়িত সমাজকে পাল্টে দিয়ে সারাবিশ্বের শোষণের অবসান ঘটাবেন। স্বপ্ন ছিল নতুন সমাজ গড়বেন। স্বপ্ন ছিল আলোকিত মানুষ গড়বেন। এক কথায় সারাবিশ্বের বঞ্চিত ও নিপীড়িতদের মুক্তিই ছিল যার ধ্যান-জ্ঞান, তিনি আর কেউ নন, বাঙালির গর্বের ধন ও কিংবদন্তি, সংগ্রামী, মানবতাবাদী, বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি, জোতদার, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি মুসলিম লীগ সরকারের ত্রাস, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী নাচোলের রানীমা ইলা মিত্র। ১৮ অক্টোবর এ মহীয়সী বিপ্লবীর শুভ জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে এ বাংলায় শত শত বিপ্লবী বারবার গর্জে উঠেছেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলে হাসতে হাসতে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। ইলা মিত্র তাদের মধ্যে একজন হলেও, ছিলেন অনেকটা ভিন্ন। জমিদার পত্নী হয়েও সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়ে গেছেন সাধারণ মানুষের জন্য, নীরবে সহ্য করে গেছেন শত অত্যাচার। এ সংগ্রামী নারী ইতিহাসে আলাদা আবেদন রাখেন এ কারণে, সাধারণ মানুষের জন্য শোষক শ্রেণির এত শারীরিক অত্যাচার আর কোনো মহিলা বিপ্লবী সহ্য করেছেন কিনা জানা নেই। কারাগারে রাজবন্দিদের হত্যার কথা জানি (১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা হত্যা), কিন্তু কারাগারে রাজবন্দিকে ধর্ষণের কথা শুনিনি। যা পাকিস্তানের অসভ্য মুসলিম লীগ সরকার করেছিল।

১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি পাকিস্তানি পুলিশ ইলা মিত্রকে গ্রেপ্তার করার পর হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য এমন কোনো পন্থা নেই, যা প্রয়োগ করেনি। অনবরত লাঠি দ্বারা পেটানো, দুই লাঠির মধ্যে পা দুটি ধরে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করা, রুমাল দিয়ে মুখ বেঁধে চুল টেনে উপড়ে ফেলা, লাঠি দ্বারা মাথায় আঘাত করে নাক-মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত বের করা, কিল-ঘুষিসহ তলপেটে বুটের লাথি মারা, হাঁটুতে লম্বা পেরেক ঢুকিয়ে দেয়া, সারাদিন উলঙ্গ করে রাখা, যৌনাঙ্গ দিয়ে গরম ডিম ঢুকিয়ে দেয়া, পরিশেষে স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে ধর্ষণ করা। প্রায় ১০ দিন ধরে চলে এ নারকীয় অত্যাচার মাত্র মাসখানেক আগে সন্তান জন্ম দেয়া ইলা মিত্রের ওপর। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে মুক্তি দিলে চিকিৎসার জন্য তিনি কলকাতা চলে যান।

ইলা মিত্রের অপরাধ ছিল, নিপীড়িত ও বঞ্চিত কৃষকদের তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া। তেভাগা মানে তিন ভাগের একভাগ ফসল জোতদার বা জমিদারকে দিয়ে বাকি দুভাগ ফসল কৃষকদের জন্য নিশ্চিত করা। এটাই ছিল আন্দোলন। উল্লেখ্য, পলাশীর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত জমির মালিকানা ছিল কৃষকদের হাতে এবং ফসলের একভাগ বা তারও কম খাজনা দিতেন রাজকোষে। কিন্তু ইংরেজ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালুর পর জমির মালিকানা চলে যায় জমিদারদের হাতে। তার ওপর আবার মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে জোতদারদের উৎপাত, হাটে ‘তোলা’ ও ‘লেখাই’ এসব দিয়ে কৃষকদের হাতে আর ফসলের অবশিষ্ট কিছু থাকত না। জমি চাষের তদারকি করা ও খাজনা আদায় করা এ জোতদাররা কৃষকদের দাসের মতো ব্যবহার করত। অনেকে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অর্থের মাধ্যমে খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে এ সময়ের সমৃদ্ধ বাংলার কৃষক সমাজ আধিয়ার আর ক্ষেত-মজুরে পরিণত হন এবং এর ফলে জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। ১৯৩৬ সালে ‘সর্বভারতীয় কৃষক সমিতি’ গঠনের মাধ্যমে বাংলার কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। ছেচল্লিশের দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, জেলায় জেলায় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গাকে মন থেকে পরিহার করে হিন্দু-মুসলিম ইলা মিত্রের নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

১৯৪৭-এ দেশ ভাগ হলে পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমননীতি শুরু করে। হিন্দু নেতাকর্মীরা প্রায় এ সময় ভারতে চলে যায়, কিন্তু ইলা মিত্র ও তার স্বামী রমেন মিত্র নাচোলের চÐীপুর গ্রামে আত্মগোপন করেন এবং তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র। এ আন্দোলনে পুরো কৃষক সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়লেও সামনের সারিতে ছিল সাঁওতালরা। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি পুলিশ ও কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষ হলে ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার প্রায় ২ হাজার সৈন্য প্রেরণ করে। সেনারা ওই গ্রামে ব্যাপক মারধর শুরু করার পর গুলি করে শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং ১২টি গ্রামের কয়েকশ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন সাঁওতাল অধিবাসী। ইলা মিত্র সাঁওতালদের পোশাক পরে পালাতে গিয়ে দুর্ভাগ্যবশত ভাষাগত কারণে রোহনপুর রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তারপর শুরু হয় সীমাহীন অকথ্য নির্যাতন।

ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামের ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল নগেন্দ্রনাথ সেন ও মনোরমা সেনের তিন ছেলে, তিন মেয়ের মধ্যে সবার বড় ইলা সেন জন্ম নেন কলকাতায় ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর। বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। গান-অভিনয়, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন। বাঙালি মেয়েদের মধ্যে তিনিই প্রথম ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক বাতিল করা হয়। মূলত তিনি স্নাতক সম্মানের ছাত্রী থাকা অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৩ সালে কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হয়ে পরবর্তী সময়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুরের জমিদার নন্দন রমেন মিত্রের সঙ্গে বিয়ের পর ইলা মিত্র কলকাতা থেকে শ্বশুরবাড়ি রামচন্দ্রপুর হাটে চলে আসেন। এরপর এলাকাবাসীর দাবির মুখে এলাকার মেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন এবং রমেন মিত্র ও ইলা মিত্র দুজনই জমিদার পুত্র ও জমিদার পুত্রবধূ হওয়ার পরও জমিদারির সুখ ও মোহ ত্যাগ করে জমিদার ও জোতদারের বিরুদ্ধে কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়ান। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী জনমত গঠন করে ইলা মিত্র অসীম সাহসের পরিচয় দেন। ১৯৭১ সালে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে অত্যন্ত সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেন। সারাজীবন বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে চির নমস্য ও জনমানুষের হৃদয়ের মণিকোটায় স্থান নেয়া এ মহীয়সী ও কিংবদন্তি নেত্রী ৭৭ বছর বয়সে ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান।

পরিশেষে বলব, নতুন প্রজন্মের কাছে ইলা মিত্রের সংগ্রামী জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা উচিত। কেননা ইতোমধ্যে হাজি কিয়ামউদ্দিন ও আমিনুল ইসলামরা ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি ও শত শত বিঘা সম্পত্তি দখল করে বসে আছে। এদের হাত থেকে এ বাড়ি ও সম্পত্তিগুলো দখলমুক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ ও দর্শনীয় করে কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস রক্ষা করতে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র : ইলা মিত্র, নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী, মালেকা বেগম।

গোপাল নাথ বাবুল : কলাম লেখক।
[email protected]

এসআর