গৃহকর্মী নিয়ে তুলকালাম, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া

আগের সংবাদ

রাজস্বে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি!

পরের সংবাদ

সরগরম আন্তর্জাতিক রাজনীতি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ১:৪৪ অপরাহ্ণ

থমকে আছে চীনের মধ্যস্থতার উদ্যোগ
রোহিঙ্গা ফেরাতে নীরব ভারত ও জাপান
হুমকির মুখে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিয়ে হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠছে। এই জাতিগোষ্ঠীকে স্বভূমে ফেরাতে চীন এক ধরনের কথা বলছে, ভারত একধরনের, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং আমেরিকা আরেক ধরনের কথা বলছে। চতুর্মুখী এসব কথার কারণে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি তেতে উঠেছে। এছাড়া সদ্য শেষ হওয়া ‘কোয়েড’ কনফারেন্সে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা, ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আয়োজনে রোহিঙ্গা সম্মেলনও নতুন মাত্রা দিয়েছে। অথচ এই সবকটি দেশই বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র। কিন্তু দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর সব প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। আর এই ফাঁকে রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েই চলছে। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

আইসিজে, ওআইসি, সৌদি আরব থেকেও রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারকে চাপ দেয়া হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ সফর শেষে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলাও বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে ভারত কথা বলবে। তবে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে একদিকে কূটনৈতিক ভদ্রতা বজার রাখে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে ক্রমাগত মিথ্যাচার করে। ভারত, চীন, জাপান, আমেরিকা রোহিঙ্গা ফেরানোর কথা বললেও মিয়ানমারে তাদের বড় বিনিয়োগ থাকায় জোরেশোরে চাপ দিতে পারে না।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থ দেখতে হবে এবং এই স্বার্থের জন্য কোথা থেকে কাজ শুরু করতে হবে তা এখনই নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় চাপ বাড়ছে। এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এখনই বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো মুখের কথায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা বললেও কৌশলগত কারণে তারা মিয়ানমারকে সমর্থন করছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিচ্ছে না। বরং আগামী ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে যৌথভাবে এশিয়া ফাউন্ডেশন এবং মিয়ানমার ইউনিয়ন ইলেকশন দেশটিতে ‘এমভোটার ২০২০’ নামে একটি নির্বাচনী অ্যাপস তৈরি করেছে। ওই অ্যাপসে প্রায় ৭ হাজার প্রার্থীর পরিচয় রাখা হয়েছে তাতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিনিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকেই জটিল করে তোলা হয়েছে।

এরকম পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন ইস্যুতে হালনাগাদ তথ্য নিতে মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠকের প্রস্তাব করেছে চীন। গত রবিবার চীনের রাষ্ট্রদূত লি ঝিমিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, রোহিঙ্গা বিষয়টা আটকে রয়েছে। চীন যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে। ত্রিপক্ষীয় একটি ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চীনের দূতকে জানালাম, কোভিডের কারণে তো এর বৈঠক হচ্ছে না। এজন্য তিনি তখন দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আমরা চীনকে জানিয়েছি, আমরা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন চাই। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের এখানকার সমাজে একত্রীকরণের বিষয়ে বলছে। আমরা বিষয়টি চাই না।

তিনি বলেন, চীন আমাদের সঙ্গে একমত, সর্বপ্রথম ইস্যু হচ্ছে প্রত্যাবাসন। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়ে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। কিন্তু নিচ্ছে না। চীন এ বিষয়ে মিয়ানমারকে চাপ দিতে পারে। চীনা রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আর মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিকে থাকতে হবে। এর জবাবে চীন জানিয়েছে, এখন মিয়ানমারের নির্বাচন হওয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি চাপা পড়ে গেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, শেষ দফায় ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানে জোর দিয়ে আসছে চীন। এরই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ডেকেছিল চীন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য ত্রিপক্ষীয় একটি কমিটিও হয়। কিন্তু কয়েক দফা বৈঠক ছাড়া ওই কমিটির কোনো অগ্রগতি নেই। ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের একটি দিন ঠিক ছিল। কিন্তু রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ না থাকায় রোহিঙ্গারা ফিরতে চায়নি। এ কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় দফার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান বিশেষ করে প্রত্যাবাসনে কোনো অগ্রগতি নেই। থমকে আছে চীনের মধ্যস্থতার উদ্যোগও। পাশাপাশি, কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে ভাসানচরে নেয়ার সরকারি উদ্যোগও থেমে আছে। বিদেশি কয়েকটি এনজিও রোহিঙ্গাদের সরাতে নিরুৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে এক ধরনের রাজনীতি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের উদ্যোগের মধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ও সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ নারাভানে একদিনের সফরে গত ৪ অক্টোবর মিয়ানমার গিয়েছিলেন। ওইসময় তারা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতার হুমকি নিয়ে আলোচনা করেন। ওই সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সেনাপ্রধান তাদের সদ্যসমাপ্ত মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে সে দেশের নেতৃত্বকে সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন। নভেম্বরে মিয়ানমারে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের আগেই অন্তত কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে ভারত, চীন, জাপান- কেউই আন্তরিকভাবে মিয়ানমারকে চাপ দেবে না। কৌশলগত কারণে শুধু মুখে মুখে রোহিঙ্গা ফেরানোর কথা বলছে। কারণ দেশগুলোর বড় বিনিয়োগ রয়েছে মিয়ানমারে। এজন্য রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশকেই নিজের মতো করে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে আগামী ৫ থেকে ১০ বছর রোহিঙ্গাদের নিয়ে কী করবে বাংলাদেশ সে নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আগামী ২২ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের বিষয়ে যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘকে নিয়ে যে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যাচ্ছে সেখানেও বাংলাদেশকে অংশ নিতে বলেছেন সাবেক কূটনীতিকরা। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু নিয়ে বাংলাদেশ একমত না হওয়ায় বৈঠকে অংশ নাও নিতে পারে বাংলাদেশ।

গতকাল বুধবার এক অনলাইন আলোচনায় যুক্ত হয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে যেকোনো মিটিংয়ে যোগ্য প্রতিনিধির মাধ্যমে অবশ্যই বাংলাদেশের অংশ নেয়া উচিত। শুধু অংশ নেয়াই নয়, শক্তভাবে বাংলাদেশ অবস্থানও জানানো উচিত। তারমতে, বাংলাদেশকে বুঝতে হবে কোনো চাপেই মিয়ানমার পরিবর্তন হয়নি। কাজেই বাংলাদেশকেও এখন ওইরকম শক্ত পরিকল্পনা করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সরগরম আন্তর্জাতিক রাজনীতির মধ্যে ক্যাম্পে অস্ত্র ঠেকানো যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এত অস্ত্র আসল কোথা থেকে? ভবিষ্যতে এই অস্ত্র যে বাংলাদেশের দিকে তাক করা হবে না-তা কে বলতে পারবে? কাজেই এখন থেকেই বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান নেয়া উচিত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান বলেন, ওআইসি, আইসিজে এবং সৌদি আরব রোহিঙ্গা ফেরাতে চাপ দিচ্ছে। কিন্তু তাতে কি রোহিঙ্গাদের ফেরানো সম্ভব হচ্ছে? আমরা কি রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চাপ দিতে পারি না- প্রশ্ন এই অধ্যাপকের।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেসব অস্ত্র পাওয়া গেছে তার ধরন মিয়ানমারের দুয়েকটি প্রদেশে ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে। নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়ায়ও একই ধরনের অস্ত্র রয়েছে। কাজেই এর যোগসূত্র অনেক গভীরে। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে এখনই অস্ত্রের ঝনঝনানি থামাতে হবে, নতুবা সামনে আরেক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে বাংলাদেশ।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়