শাহজালালে ১০ বিমান বাজেয়াপ্তের নির্দেশ

আগের সংবাদ

সাতক্ষীরায় দুই সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রী খুন

পরের সংবাদ

নওগাঁর শিল্পীদের আর্তি

সরকার সহযোগিতা করলে বেঁচে থাকার সাধ জাগবে

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ

স্থবির জেলাভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড- ২২

আত্রাই নদী তীরবর্তী নদীবন্দর এলাকা ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রাম কালক্রমে নওগাঁ শহর ও সবশেষ নওগাঁ জেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। নওগাঁর অধিবাসীরা ছিলেন প্রাচীন পুণ্ড্র জাতির বংশধর। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, পুণ্ড্ররা বিশ্বামিত্র বংশধর ও বৈদিক যুগের মানুষ। আদিবাসী সাঁওতালগোষ্ঠী, মাল পাহাড়িয়া, কুর্মি, মহালী ও মুণ্ডাসহ নওগাঁ জেলা মানববৈচিত্র্যে ভরপুর। এ অঞ্চলে অনেক জমিদারগোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যা নওগাঁকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। নওগাঁ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে ‘নও’ (নতুন) ও ‘গাঁ’ (গ্রাম) শব্দ থেকে। শব্দ ২টি ফার্সি। নওগাঁ শব্দের অর্থ হলো নতুন গ্রাম। ঐতিহাসিক অবস্থানের দিক দিয়েও নওগাঁ জেলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অসংখ্য পুরাতন মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও জমিদারবাড়ি প্রমাণ করে নওগাঁ জেলার সভ্যতার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এর মধ্যে রয়েছে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত পতিসর কাছারিবাড়ি, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, বলিহার রাজবাড়ী, হলুদ বিহার, ভীমের পান্টি, মাহি সন্তোষ, দুবলহাটি জমিদারবাড়ি, সবলিহার রাজবাড়ীসহ অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ মন্দিরের শহর নওগাঁ যেন সংস্কৃতির শহর। এছাড়া রয়েছে আলতাদীঘি, পাহাড়পুর জাদুঘর, দিব্যক জয়স্তম্ভ, নওগাঁ জেলা পরিষদ পার্ক, হাঁপানিয়া খেয়াঘাট, জবাইবিল পর্যটনের উল্লেখযোগ্য স্পট। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এমন প্রাচীন শহর নওগাঁয়ও আঘাত করেছে করোনা। এর চারপাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সুন্দরের বিভাকে যেন ম্লান করে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, নওগাঁয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা শতাধিক। সংস্কৃতি কর্মীর সংখ্যা ১০ হাজারের মতো। তাদের অনেকে নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত। যারা নানা অনুষ্ঠান করে সংসার চালান। এছাড়া গ্রাম-গঞ্জে, হাটে-বাজারে বাউলসহ বিভিন্ন মেঠো গান করে বেড়ান অনেকেই। তারা এখন বেকারত্বের ঘানি টানছেন। এদের মধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে ৩৮০ জনের তালিকা পাঠানো হলেও প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হয়েছে মাত্র ১৫০ জনকে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নওগাঁর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি নাজুক। অধিকাংশ শিল্পীর জীবনই বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। অনন্যোপায় হয়ে কেউ কেউ করছেন মুদি দোকানদারি কিংবা মাস্ক বিক্রি। করোনাকালে এসব বিপন্ন শিল্পী ও সংগঠনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান সংস্কৃতি কর্মীরা।

জানতে চাইলে নওগাঁর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক মাগফিরুল হাসান বিদ্যুৎ ভোরের কাগজকে বলেন, নওগাঁয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি যেমন নাজুক তেমনি কর্মীদের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেক সংগঠন অফিস ভাড়া শোধ করতে পারছে না বলে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প চর্চার সঙ্গে যুক্তরা এমনিতেই নানা অভাব-অনটনের মধ্যদিয়ে এ পেশায় টিকে থাকেন। করোনা এসে তাদের আরো অভাবী করে দিয়েছে। সরকার অনেককে সহায়তা দিলেও অনেকে বঞ্চিতও হয়েছে। তাছাড়া এই ৯ মাসে ৫ হাজার টাকার প্রণোদনা সহায়তায় একটা পরিবারের কী হয়? এ রকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিল্পীরা হারিয়ে যাবে। যেখানে জঙ্গি আর ধর্ষকদের অভয়ারণ্যে হবে।  করোনাকালীন এসব শিল্পীদের অন্তত প্রতি মাসেই প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হোক এমন আহ্বান জানিয়ে এই সংগঠক বলেন, শিল্পীরা বরাবরই অবহেলিত, তাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি এডভোকেট জি এম আব্দুল বারি বলেন, করোনায় নওগাঁ একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছে, সেইসঙ্গে ঝিমিয়ে পড়েছে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্তরাও। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মানুষের সুকুমারবৃত্তিগুলোর বিকাশ ভিন্ন পথেই প্রকাশ ঘটবে। বাড়বে লৈঙ্গিক বৈষম্য।  দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী মো. হাবিবুর রহমান। তার বাবা-মাসহ ৪ ভাইও বাউল সংগীত গেয়ে সংসার চালান। করোনা তাদের আয়ের পথ একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে।

হাবিবুব রহমান বলেন, আমরা তো একদম ভাঙা গাড়ির মতোই হয়ে গেছি। বিশেষ করে আমি। অর্থনৈতিক এবং শারীরিক সবদিক দিয়ে দুর্বল হয়ে গেছি। সরকার যদি সহায়তা করে তাহলে বেঁচে থাকার সাধ জাগবে। কেউ কি পাশে দাঁড়াবেন?

দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সংগীত চর্চা করে জীবিকানির্বাহ করছেন শিল্পী ফারহানা ইয়াসমীন শিল্পী। তিনি বলেন, শিল্পীদের মতো কষ্টের জীবন মনে হয় আর কারোরই না। যতদিন গান গাইতে পারি ততদিনই দাম দেয়া হয়। এরপর কেউ খোঁজও নেয় না। যেমন- এই করোনাকালে কেমন আছি কেউ একটু খবরও নিল না! কতটা কষ্টের নদী সাঁতরে বেড়াচ্ছি কেউ যদি দেখতো! সত্যি বলতে কী জীবনের বোঝাটা বেশ ভারীই হয়ে উঠছে। আর টানতে পারছি না।

নবনাট্য সংঘের সাধারণ সম্পাদক কায়েস উদ্দীন বলেন, শিল্পীদের জীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। সবারই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে বিকল্প পথ খুঁজছে। কিন্তু তাও পাচ্ছে না। তাদের কাউকে কাউকে সরকারি প্রণোদনা দেয়া হলেও তা একেবারেই অপ্রতুল। তারপরও ওই তালিকা সম্প্রসারিত করে তা অব্যাহত রাখা উচিত।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়