ইতিহাসের দালিলিক গ্রন্থ স্মৃতি : ১৯৭১

আগের সংবাদ

আমার অনুমতির প্রয়োজন নেই

পরের সংবাদ

রশীদ হায়দার : ফিরবেন আবার

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৮:৪৬ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৮:৪৬ অপরাহ্ণ

কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার। নানাভাবে, নানা অবয়বে পরিচিত তিনি। কথাশিল্পী, গবেষক, নাট্যকার, অনুবাদক, অভিনেতা। বড় পরিচিত প্রিয় মুখ রশীদ হায়দার ভাই চলে গেলেন অসীমের সীমানা ধরে। দরাজ কণ্ঠের রসপ্রবণ মানসিকতার উদার সজ্জন ব্যক্তি। বাংলা সাহিত্যে ও সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সারথী। তার লেখা গল্প, উপন্যাস, সম্পাদিত ‘স্মৃতি ১৯ ৭১’ কালান্তরে তাকে উজ্জ্বল করে রাখবে। কর্মময় দীর্ঘ অভিযাত্রায় তিনি ছিলেন ক্লান্তহীন সব সময়। অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনে নীতি ও আদর্শে ছিলেন অবিচল। হৃদয়জুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালিত্বের অমিয় চেতনা। সেই চেতনা ধরেই জীবনভর ছিলেন সাহিত্যের নিগূঢ়ে। ছিলেন সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন। পথ চলেছেন নিরন্তর। পথের চারপাশ জুড়ে সবকিছু প্রত্যক্ষ করেছেন নিবিড়ভাবে। তা দিয়ে সৃষ্টি ও কর্মের জগতে ছিলেন ব্যস্ত। কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আমাদের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি সংস্কৃতি ও চেতনার বাহন। সেই হায়দার ভাই নেই। খবরটা শোনার সাথে সাথে হৃদয়টা গভীর ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। শোকের ছায়া নামে। আমাদের যাপিত জীবনের আড়ালে চলে গেছেন তিনি। চিরদিনের জন্য, কাছে থেকে অনেক দূরে। কিন্তু কর্ম ও ঘটনা পরম্পরায় যে জীবন তিনি গড়ে তুলেছেন তা তো পূর্ণতায় আলোকময়। মøান হবার নয়।
জন্ম ১৫ জুলাই ১৯৪১। পাবনা জেলার দোহারপাড়া গ্রামে। লেখাপড়া করেছেন সর্বশেষ ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স। বলা যায় তার পুরো পরিবারই লেখক পরিবার। হায়দার পরিবারের একমাত্র সন্তান তিনি, যিনি গদ্যই লিখেছেন। অপরাপর ভাই জিয়া হায়দার, দাউদ হায়দার, মাকিদ হায়দার, জাহিদ হায়দার, আরিফ হায়দার সবাই মূলত কবি। দ্বিতীয় সন্তান বাবা-মার। প্রস্থানে তিনি প্রথম।
কর্মময় ছিলেন সবসময়। ছাত্রাবস্থায় ১৯৬১ সালে সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু করেছিলেন কর্মজীবন। ছিলেন সাপ্তাহিক ‘চিত্রালীর’ সাংবাদিক। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ডার্স-এর মুখপত্র পরিক্রম পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন। এরপর তার ঠিকানা হয় বাংলা একাডেমি। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। শুরু হয় তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মিশন। এখানে বসেই তার লেখালেখি, সম্পাদনা। ১৯৭৪ সালে তিনি দিল্লির ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায়’ তিন বছর লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা একাডেমির চাকরির জন্য তিন মাস পর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৬৪ সালে মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় ‘ভ্রান্তি বিলাস’ নাটকে অভিনয় করে একজন শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে নাট্য মহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর অগ্রজ জিয়া হায়দারের সাথে গঠন করেন ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ নামের নাট্যদল। তার লেখা ‘তৈল সংকট’ নাটকটি সে সময় নাট্যমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
বাংলা একাডেমিতে কর্মরত অবস্থায় নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব ও কর্ম পালনে ছিলেন তৎপর। এখানে কর্মকালীন তিনি ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প’ সম্পাদনা করেন। এখানে বসে তিনি ‘স্মৃতি ১৯৭১’ নামের ১৩ খণ্ডের মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দালিলিক গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। এ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবার ও অংশগ্রহণকারী সদস্যদের স্মৃতিকথা ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক অজানা কথা, দুঃসহ দিনের অভিজ্ঞতা ও গৌরব গাথা স্থান পেয়েছে। তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক, নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, সম্পাদনা মিলে তিনি সত্তরটির অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, উপন্যাস : খাঁচায়, অন্ধ কথামালা, নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য, অসম বৃক্ষ, নদী ও বাতাসের খেলা, গল্পগ্রন্থ : নানকুর বোধি, অন্তরে ভিন্ন পুরুষ, উত্তরকাল পূর্বাপর, বৃহল্লা ও অন্যান্য গল্প, মেঘেদের ঘরবাড়ি, বাবার গল্প। নাটক : সেক্সপীয়র দি সেকেন্ড, তৈল সংকট, গোলাপ গোলাপ।
অনুবাদ নাটক : কাঠগড়া (কাফকার দ্য ট্রায়ালের নাট্যরূপ) প্রবন্ধ : বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা (জীবনী), অসহযোগ আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল।
কিশোর উপন্যাস : শোভনের স্বাধীনতা, আমার স্কুল, জসীমের নকশী কাঁথা, গোলাপের জন্ম। কলাম গ্রন্থ : আত্মকথন, ছবি অপরূপ, চিম্বুকের নিচে আলোর প্রভা, বাঙালির তীর্থভ‚মি। সম্পাদনা : শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ, স্মৃতি ১৯৭১, একুশের গল্প প্রভৃতি।
সাহিত্য সাধনায় স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ২০১৪ সালে একুশে পদক, হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, পাবনা জেলা সমিতি স্বর্ণপদক লাভ করেন।
রশীদ হায়দারের সাহিত্যকর্মের বিরাট অংশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক মানবিক আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোর অবরুদ্ধ জীবনের অসহায়ত্ব তিনি অনবদ্যভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার ‘খাঁচায়’ উপন্যাসে। ‘খাঁচায়’ বন্দি একটি টিয়া পাখির প্রতীকে ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের বিরুদ্ধে মুক্তির প্রবল আকাক্সক্ষাকে তুলে ধরেছেন এ গ্রন্থে।
মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা ও প্রেক্ষাপটে লেখা ‘অন্ধ কথামালা’ তার আরেক অনন্য সৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন চরিত্রের কথোপকথনের
মধ্য দিয়ে এক বিশ্লেষণাত্মক কাব্যধর্মী প্রকাশ রীতির আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার গল্পগুলোতে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, জীবনের টানাপড়েন, বাঁচার জন্য তীব্র আকুতি, নিরন্তর সংগ্রাম রূপায়িত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, ইতিহাসকে তিনি গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেন। স্বাধীনতা, স্বাধীনতা-উত্তর সময় ও জীবনের নানা অসঙ্গতি, বাস্তবতাও তার লেখায় উঠে আসে সাবলীলভাবে। জীবন বাস্তবতার চিত্র তিনি শিল্পের পরিচর্যায় তুলে ধরেন। তার সাহিত্যকর্ম যেন জীবনের অরূপ আলেখ্য। মানুষের স্বপ্নময়তাকে তিনি অবরুদ্ধ বেষ্টনী থেকে অনিরুদ্ধ দিগন্তে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। আলো বাতাসে সজীব করতে চেয়েছেন। এ প্রচেষ্টা ও প্রলুব্ধতায় তিনি জীবনভর দুচোখ খোলা রেখেছেন। সজাগ থেকেছেন। বাঙালি ও বাঙালিত্বের জয়গান গেয়েছেন। তার সৃষ্টির ভেতর ও বাইরে সেই একই অনুরণন। যা প্রতিধ্বনিত হবে জাতিসত্তার জাগরণে। লৌকিকতার দৃশ্যপট থেকে তিনি আজ অনেক দূরে। কাছে থেকে যে আবাহনে তিনি ছিলেন উচ্চকিত, সে সূত্রে ফিরবেন তিনি। সৃষ্টির মহিমায় ফিরে আসবেন। রশীদ হায়দার ফিরবেন আমাদের জাগ্রত চেতনায়। কারণ তিনি তো উজ্জ্বল প্রস্থানে ফিরে আসার অজর মানুষ।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়