আমার অনুমতির প্রয়োজন নেই

আগের সংবাদ

মুখোশে ঢাকা ভোট

পরের সংবাদ

এ খাঁচা ভাঙ্গবো আমি কেমন করে?

সেলিম জাহান

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৮:৫৬ অপরাহ্ণ

পরিচয় প্রায় ৩৫ বছরের ওপরে। জানাশোনাটা হয়েছিল ত্রি-পথে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চোধুরীর মাধ্যমে, রীনু’পার (বেনুর অগ্রজা অধ্যাপক শাহীন কবীর) দ্বারা এবং আমার নিজ পরিচয়ে। আশির দশকে ঢাকায় নিত্য দেখা না হ’লেও মাঝে মাঝে দেখা হতো বইমেলায়, বাংলা একাডেমিতে, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে, নিউমার্কেটে। সব জায়গাতেই আড্ডা জমিয়েছি আমরা, কাপের পর কাপ চা উড়ে গেছে, সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়েছে চারপাশ, আমাদের উচ্চহাসিতে সচকিত হতেন অন্যেরা।

চোখের সামনে আমাদের বয়স বাড়লো, চুলে পাক ধরল, গুম্ফ শ্বেতশুভ্র হলো, কিন্তু সম্পর্কে চিড় ধরলো না। আমার বাইরে চলে যাওয়া ও বিদেশে দীর্ঘদিন থাকা সত্ত্বেও নয়। যোগাযোগ হতো, একে অন্যের খবর পেতাম, খবর নিতাম। কিন্তু সেই সবকিছু ভুলে গিয়ে ১৩ অক্টোবর রশীদ ভাই (সাহিত্যিক রশীদ হায়দার) চলে গেলেন।

নানান সময়ে রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বাড়িতে। নানান কাজ নিয়ে আসতেন তিনি। কাজ শেষে দেদার কথা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে, হাসি-ঠাট্টা হয়েছে। মাঝে মাঝে প্রয়াত বেগম মেহের কবীরও এসে যোগ দিতেন। তাদের কাছে রশীদ ভাই আমার এতো প্রশংসা করতেন যে আমি বড়োই কুণ্ঠিত হয়ে পড়তাম। কিন্তু এমনটাই ছিলেন রশীদ ভাই অন্যের প্রশংসা করতেন দ্বিধাহীন চিত্তে। বড় দরাজ হৃদয় ছিল তার।
অধ্যাপক চৌধুরীর প্রতি রশীদ ভাইয়ের আনুগত্য ও মুগ্ধতা ছিল কিংবদন্তি পর্যায়ের। বাংলা একাডেমিতে কাজের কারণে তা আরও শক্ত হয়। রশীদ ভাইয়ের কাছেই শুনেছি যে, ১৯৭১-এ পাকিস্তানি সরকারের সমর্থনে বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতিতে স্বাক্ষরদানের কাগজটি তার পরিচালক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন রশীদ হায়দার। অধ্যাপক চৌধুরী স্বাক্ষর করেননি। এর ফলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে, এমনটা বলে রশীদ ভাই তাকে স্বাক্ষর করতে বহু মিনতি করেন। তাতে নাকি অধ্যাপক চৌধুরী বলেছিন, ‘রশীদ, ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু আমি সই করবো না’। এ গল্প বলার সময়ে রশীদ ভাইয়ের মুখে একটি গর্বের আভা ছড়িয়ে পড়ত। বলা দরকার, অন্য যে মানুষটি এ বিবৃতিতে সই করেননি, তিনি কবি সুফিয়া কামাল।

কিন্তু আড্ডা সবচেয়ে জমে উঠতো যখন রীনু’পা আর আমি রশীদ ভাইয়ের অফিসে যেতাম বাংলা একাডেমিতে। মাঝে মাঝে রফিক ভাই (কবি মোহাম্মদ রফিকও আসতেন। একবার মনে আছে, জাপানি কোনো এক গল্পের অনুবাদ করেছিলেন রীনু’পা। ছাপা হয়েছিল বাংলা একাডেমি পত্রিকায়। সুতরাং ক’দিন পরে অর একটি অনুবাদ নিয়ে রীনু’পা হাজির রশীদ ভাইয়ের অফিসে। সবটা দেখে- শুনে রশীদ ভাই গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, ‘না, ভাই, জাপানি গল্পের অনুবাদ ছাপাতে অসুবিধে আছে’। ‘কেন?’, চোখ-মুখ তীক্ষè করে জিজ্ঞেস করলেন রীনু’পা। ‘আমার অনুবাদ কি খারাপ হয়েছে’? ‘আরে না, না। সমস্যা সেটা নয়’। ব্যস্ত হয়ে পড়েন রশীদ ভাই।

তারপর মুখটা খুব গম্ভীর করে বলেন, ‘মানে, ক’দিন আগে এক অনুবাদক দুজন জাপানি সাহিত্যিকের লেখার অনুবাদ নিয়ে এসে হাজির। তার একজনের নাম ‘তাকিয়োনা মুতেয়াসি’ আর অন্যজন ‘দিবানিশি হাগামুতা’। আমরা হেসে কুটি কুটি। জানি, পুরোটাই ঠাট্টা, তবু এতো ছদ্ম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যভাবে রশীদ ভাই বললেন যে তার রসবোধে আমরা বিমোহিত।

আশির দশকে রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো নিবিড় হলো। পত্রিকা অফিসে, রেডিও- টেলিভিশনে, সভা-সমিতিতে প্রায়ই দেখা হতো। এরশাদবিরোধী দানা বাঁধলে সে দেখা-সাক্ষাতের সংখ্যাও মাত্রা বেড়ে গেল। সব কিছুর শেষেই জমজমাট আড্ডা। রশীদ ভাই পাবনায় হায়দার ভ্রাতৃ-পঞ্চমের বেড় ওঠার গল্প শোনাতেন। তাদের পাঁচ ভাইয়ের নাকি একটি বেগুনি শার্ট ছিল। এক একবার এক একজন পরে বেরুতেন। পাবনা শহরের লোক মনে করতো তাদের প্রত্যেক ভাইয়ের একটি বেগুনি শার্ট আছে। তার মুখেই প্রথম শুনেছি যে, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী টিউটোরিয়া খাতায় সই করতেন ‘মু.চৌ.’ বলে, ইংরেজিতে নিজের নাম লিখতেন ‘গঁহরবৎ’ বলে, প্রচলিত ‘গঁহরৎ’ বলে নয়।
আমি তাদের ‘পঞ্চ-পাণ্ডব’ বলে আখ্যা করতাম। দাউদ ও রশীদ ভাই মজা পেতেন। কিন্তু আমি অবাক হতাম, একটি পরিবারে পাঁচ পাঁচটি ভাই প্রত্যেকেই সফল সাহিত্যিক! জিয়া-রশীদ-দাউদ- মাকিদ-জাহিদ হায়দারের মা’কে আমার রতœগর্ভা জননী বলে মনে হতো। রশীদ ভাই ঠাট্টা করতেন যে তার চার ভাইয়ের মতো তিনি কবি নন, তিনি গল্পকার। তিনি ভাইদের থেকে ভিন্ন।

রশীদ ভাইয়ের ভিন্নতার কথা দাউদ আমাকে বলেছিল নব্বই দশকের শেষের দিকে যখন মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে আমি বার্লিন গিয়েছিলাম। দুবার দাউদ আর আমি সারারাত ধরে বার্লিন শহর চষে বেড়িয়েছি এবং গল্প করেছি অবিরাম। দাউদ বলেছিল, কেমন করে রশীদ ভাই তার ভাইদের দেখে রাখতেন, কেমন করে তিনি মাকিদ ও জাহিদের যত্ন নিতেন। বার্লিনের ভাঙা দেয়ালের অংশ দিয়ে তৈরি একটি চাবির রিং তার ‘বেনু আপাকে’ উপহার দিয়েছিলেন দাউদ। কতকাল দাউদকে দেখি না!

রশীদ ভাই খুব ভক্ত ছিলেন সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত আমার পাক্ষিক লেখা ‘কড়ি-কড়চার’। প্রায় নিয়ম করে প্রতি বৃহস্পতিবারে তিনি আমাকে ফেন করতেন, প্রশংসা করতেন আমার লেখার, টুকটাক আলাপ করতেন নানান বিষয়ে। সংবাদে আড্ডা দিতাম আমি, হাসনাত ভাই, বজলু ভাই আর রশীদ ভাই। মাঝে মাঝে ঠাট্টা করতেন রশীদ ভাই এই বলে যে ‘এক রশীদ (রশীদ হায়দার) আমার লেখার ভক্ত, আর অন্য রশীদ (রশীদ করিম) আমার বলার ভক্ত’। আমি হেসে ফেলতাম।

মনে আছে, ২০০৩ কিংবা ২০০৪-এর দিকে একদিন রশীদ ভাই ফোন করলেন নিউইয়র্কে। তার একটি ছোট গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করে দিতে হবে একটি বিদেশ থেকে প্রকাশিতব্য একটি গল্প সংকলনের জন্যে। রাজি হলাম। ক’দিনের মধ্যেই মূল গল্পের প্রতিচ্ছবি এসে উপস্থিত। পড়ে খুব ভালে লাগলো। করেও দিলাম অনুবাদ। সে অনুবাদ পেয়ে রশীদ ভাই মুগ্ধ যাকে পান, তাকেই দেখান। পঞ্চমুখে প্রশংসা করেন আমার লেখার। আমি বড়ই কুণ্ঠিত হলাম যখন তিনি ঐ অনুবাদ পড়তে দিলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে।

রশীদ ভাইয়ের ‘খাঁচা’ উপন্যাসটি আমি কবে প্রথম পড়ি, মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে, সেটা পড়তে পড়তে একটা ঘোর লেগেছিল আমার। ১৯৭১-এর ৯ মাসের অবরুদ্ধ সময়ে ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের আটকে পড়া জীবন, সে জীবনের প্রেম ভালোবাসা, সংঘাত ও সন্দেহ, টানাপড়েনের যে চিত্ররূপ রশীদ ভাই তুলে ধরেছেন ‘খাঁচায়’, যা পড়ে মনে হয়েছে এতো সে আমাদের জীবনের গল্প সে অবরুদ্ধ সময়ে।

‘খাঁচা’ এতোই ভালো লেগেছিল আমার যে, উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করার ইচ্ছে হলো আমার। রশীদ ভাইকে লিখেছিলাম আমি। তিনি তখন সম্ভবত ভারতে অসুস্থ অগ্রজ জিয়া হায়দারকে নিয়ে। সেখান থেকেই লিখেছিলেন তিনি তার আনন্দ প্রকাশ করে। ঢাকায় ফিরে নানানজনকে বলেছিলেন সে কথা। ক’বছর ঢাকায় গেলে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জানতে চেয়েছিলেন, ‘ক’দ্দূর এগোলে’?

না, বেশিদূর এগোতে পারিনি। নানান ব্যস্ততায়, বিভিন্ন কাজে এমন আটকে ছিলাম গত ক’বছর ধরে, কাজ এগোয়নি বেশি। অথচ কথা দিয়েছিলাম রশীদ ভাইকে, শিগগিরই শেষ করবো। করতে আর পারলাম কই? রশীদ ভাই চলে গেলেন। বারবার মনে হচ্ছে প্রতিশ্রুতির এক খাঁচায় আমিই তো আটকে আছি ‘এ খাঁচা ভাঙ্গবো আমি কেমন করে?’ কিন্তু খাঁচা তো আমাকে ভাঙ্গতেই হবে।