বাবলি

আগের সংবাদ

রশীদ হায়দার : ফিরবেন আবার

পরের সংবাদ

ইতিহাসের দালিলিক গ্রন্থ স্মৃতি : ১৯৭১

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৮:৪৩ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৮:৪৩ অপরাহ্ণ

গবেষক হিসেবে রশীদ হায়দারের অনন্য কাজ ‘স্মৃতি ১৯৭১’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক গ্রন্থ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার খুঁজে বের করে তাদের পরিবারের কোনো একজন সদস্য বা ঘনিষ্ঠজনদের দিয়ে স্মৃতিকথা লিখিয়ে নেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছেন তিনি। এই গ্রন্থটি ধারাবাহিকভাবে ১৩ খণ্ডে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। রশীদ হায়দারের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক গবেষণামূলক কাজ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের সাথে এদেশের দোসরেরা যোগ দিয়ে চালিয়েছে হত্যাকাণ্ড। মায়ের, বোনের সামনে হত্যা করেছে পিতা, স্বামী, সন্তানকে কিংবা হত্যা করেছে উভয়কে। ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে তারা আর ঘরে ফিরে আসেনি। তাদের প্রতীক্ষায় চোখের জল গড়িয়ে সাগর হয়েছে তবুও তাদের মেলেনি সন্ধান। এমনই হৃদয়বিদারক নানা ঘটনার সমন্বয় ঘটেছে কথাসাহিত্যিক ও গবেষক রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় ‘স্মৃতি ১৯৭১’ গ্রন্থে। তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বুদ্ধিজীবী পরিবারগুলোর সদস্যদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের হৃদয়ে আটকে থাকা বেদনার কথা নিজে যেমন জানতে চান তেমনি জানাতে চান সবাইকে সেই নিমিত্তেই এই সম্পাদনা। তিনি জানেন আমাদের বিজয় আপনা আপনি আসেনি কত পরিবার পরিবারহীন হয়েছে, হারিয়েছে নিজেদের অভিভাবক। কাণ্ডারিহীন পরিবার নিয়ে তাদের হৃদয়ে জমা কষ্টের কথা গবেষক ভুক্তভোগীদের লেখার মাধ্যমে তুলে এনে কতবড় যে ইতিহাসের দালিলিক কাজ করে গেছেন তা আজ অতিসহজেই আমরা অনুমান করতে পারি। তিনি দেশ এবং দশের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই এই কাজটি করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। স্বাধীন একটি ভূখণ্ডে যারা এককভাবে বলে এই স্বাধীনতা আমাদের দান আমাদের জন্যই দেশে স্বাধীনতা এসেছে গবেষক রশীদ হায়দার প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস তুলে এনে দেখিয়ে দিয়েছেন দেখ এই স্বাধীনতা এককভাবে কেউ আনেনি এই দেশকে হানাদার মুক্ত করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা আজ স্বাধীন হয়েছে। দেখ লাল সবুজের যে পতাকা তাতে মিশে রয়েছে কত মা-বোনের কান্নার আহাজারি। আমাদের ইতিহাস আনন্দের ইতিহাস না, এই ইতিহাস সত্যিই খুব করুণ ইতিহাস। সাবেক বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন রশীদ হায়দারের ‘স্মৃতি ১৯৭১’ গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডের পুনর্মুদ্রণ প্রসঙ্গে ১৯৯৯ সালে বলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যা একটি অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা। ১৯৭১ সালে যে সমস্ত বুদ্ধিজীবী পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে, সেইসব হৃদয়বিদারক ঘটনা সম্পর্কে তাদের আপনজনদের স্মৃতিচারণমূলক লেখা নিয়ে ‘স্মৃতি ১৯৭১’ সংকলিন হয়েছে। ১৯ জন শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে তাদের নিকটতম আত্মীয় ও স্বজনেরা যে বেদনার্ত স্মৃতিচারণ করেছেন তা এই খণ্ডে সংকলিত হয়েছে।’

আপনজনদের বর্ণনা শুনলে শরীরের রক্ত হীম হয়ে ওঠে। এই খণ্ডটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। এই ধারাবাহিক খণ্ডটা প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে উন্মোচিত হতে থাকে নানা অজানা ঘটনা যার মাধ্যমে আমরা পাচ্ছি নতুন নতুন বুদ্ধিজীবীর সন্ধান। যে কারণে রশীদ হায়দারের এই কাজটি একদিকে যেমন ইতিহাসের গুরুত্ব বহন করে তেমনি অপরদিকে দালিলিক গ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত। এই সংকলন গ্রন্থ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৯৫ সালে মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ বলেছিলেন ‘১৯৮৮ সালে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ১৪ই ডিসেম্বর থেকে ‘স্মৃতি ১৯৭১’ প্রকাশিত হয়ে, এ পর্যন্ত ৬ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। ৬টি খণ্ডে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিকটতম আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, সহপাঠী, সহকর্মী, শিক্ষক, ছাত্র যে গভীর মমতায় স্মৃতিচারণ করেছে, তার সংখ্যা ১৭৫। বর্তমান সপ্তম খণ্ডে ১৯টি স্মৃতিচারণ মুদ্রিত হলো। স্মৃতি ১৯৭১-এ প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলকসমূহে যে তথ্য ও বিবরণ লাভ করি, তা যেমন মর্মস্পর্শী, তেমনি স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের জন্যে এক অনন্য উপাদান। সেই উপাদানে মিশ্রিত আছে স্বজন হারানোর নিদারুণ কষ্ট এবং সেই কষ্টই আমাদের স্বাধীনতা, ইতিহাস এ জাতীয় সত্তা সম্পর্কে সচেতন করে ভবিষ্যৎকে আরো অর্থময় করবে, এই আশা অবশ্যই দুরাশা নয়।’

এই গ্রন্থটি পাঠ করতে এলে চোখের কোণে জমে অশ্রæ-ভেসে ওঠে সেদিনের করুণচিত্র। কিন্তু শহীদদের পরিবারগুলো বারবার হতাশার শিকার হয়েছে। আপনজনেরা স্বজন হারানোর কষ্ট আর হাহাকার নিয়ে বুকে বেঁধেছে পাথর। তবে এই গ্রন্থে আমরা অতি সহজেই জানতে পারি কোথায় কখন কিভাবে একজন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে এবং কাদের দ্বারা তারা আক্রান্ত হয়েছেন। এই গ্রন্থটিতে আমরা আরও দেখতে পাই শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী আহমদ ওয়াহিদুর রাহমানকে নিয়ে তার মা লিখেছেন ‘গতকাল খসরু বলেছিল-: আম্মা, দেশের এই দুর্দিনে নিশ্চয় তুমি আমায় বসিয়ে রাখবে না। আমাকে যেতে হবে-মা। আমাকে যেতে দাও। নইলে দেশের কাছে আমাদের সবাইকে অপরাধী হয়ে থাকতে হবে। একজন নবীনের কাছে দেশের প্রতি কতটা দায়বোধ থাকলে কিংবা মাতৃভ‚মির প্রতি মমতাবোধ থাকলে সে বলতে পারে আমি দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া না দিলে তুমি কিংবা আমরা সবাই অপরাধী হয়ে থাকব। যে কথা একদিন রুমীও তার মা জাহানারা ইমামকে বলেছিল। ওয়াহিদুরের ডাকনাম খসরু। সে পশুপাখিকে খুব ভালোবাসত। খসরু ১৯৭১ সালে বাড়ি থেকে চলে আসলে তার প্রিয় কুকুরও আর কখনো বাড়িতে ফিরে যায়নি। খসরু ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। সেসময় তার বাসায় সংগঠনের কাজকর্ম করা হতো। অনেক অস্ত্রশস্ত্রও থাকত। এই বাসায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে রাশেদ খান মেনন, মোস্তফা হায়দার, আব্বাস উদ্দিন, সুশান্ত চক্রবর্তী, কাজী জাফর আহমদ, মোস্তফা জামান হায়দারদের আনাগোনা ছিল। সারা যাকের তার ভাই সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলছেন আমার ভাই সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্র ছিল। ওর নাম শ্বেতপাথরে লেখা আছে ইংরেজি বিভাগের সেমিনার কক্ষে। আলাউদ্দিন মোহাম্মদ জাহীনের বন্ধু কায়সার হক এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাদের নাট্যপাগল এই বন্ধুকে এখনও ভোলেনি। ডা. জেলাল শফি জানাচ্ছেন তারা তাদের মেজো ভাইকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছে কারণ কয়েকদিন আগে তার ভাই পাকিস্তানিদের পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছে। তাই তারা যে কোনো সময় তাদের বাড়ি রাজাকারসহ আক্রমণ করতে পারে। চোখের সামনে বাবা-ভাইকে অত্যাচার করতে দেখেছে। তারপর থেকে আর কোনোদিন বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারেনি। দীপক কুমার চৌধুরী তার বাবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন পিরোজপুরের পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজ-এর নির্দেশে পিরোজপুরের টাউন দারোগা কতিপয় রাজাকারদের সাথে নিয়ে পোড়গোলা গ্রাম থেকে বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। সেই যে বাবা গেলেন আর ফিরে এলেন না। পরের দিন পাকিস্তানি বাহিনীর লোক বাবাকে পিরোজপুরের বালেশ্বর নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে।

বগুড়ার এডভোকেট নন্দী এবং ছোট ছেলেকে কালীবাবু জোর করে তুলে নিয়ে হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। কুমিল্লার আইনজীবী অতীন্দ্রনাথ ভদ্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার সন্তান বাঁশরী দত্ত বলেন লোকমুখে শুনেছি বাবার উপর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অশেষ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে তাকে গুলি করে হত্যা করার কথা। শর্মিন জোয়ার্দার সোমা তার বাবাকে নিয়ে লিখেছেন ৭১ সালের ৩১ জুলাই শনিবার সকালে কৈ মাছ আর লাউশাকের ভর্তা দিয়ে পরম তৃপ্তি করে ভাত খেয়ে আমাকে আর তৃপ্তিকে শেষবারের মত আদর করে ঝিনাইদহের কাষ্টসাগর গ্রামের বাড়ি থেকে বাবা চলে গেলেন দর্শনার দিকে আর ফিরে আসেননি। বাবার জন্য আজও কেঁদে বুক ভাসায় তার সন্তানেরা। সারা জীবন কাঁদবে বলেই তারা একদিন সারা জীবনের কান্না কাঁদেনি। এভাবেই একাত্তরের ভয়াবহতা বিভিন্নভাবে আমাদের সম্মুখে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের লেখনীর মাধ্যমে গবেষক রশীদ হায়দার আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। এটি কোনো বানোয়াট ঘটনা বা রং মসলা মাখানো কোনো প্রেমের কাহিনী নয়। এ একটি ভূখণ্ড তৈরির জন্ম ইতিহাস যা প্রতিষ্ঠার জন্য তার লক্ষ লক্ষ জীবন্ত সন্তানকে বলিদান করতে হয়েছে। এইসব না শোনা কিংবা না বলা ইতিহাস প্রান্তিক অঞ্চল থেকে স্বজনহারা নিঃস্ব পরিবারগুলোর কথা শোনার মানুষ নেই তখন কথাশিল্পী, গবেষক রশীদ হায়দার তাদের ভাষ্য তুলে এনে তাদের ইতিহাসের সাক্ষী করে রাখলেন। যা আজ আমাদের তথা দেশের একটি দালিলিক ইতিহাস গ্রন্থের গুরুত্ব বহন করে।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়