রশীদ হায়দার : ফিরবেন আবার

আগের সংবাদ

এ খাঁচা ভাঙ্গবো আমি কেমন করে?

পরের সংবাদ

আমার অনুমতির প্রয়োজন নেই

মনি হায়দার

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৫, ২০২০ , ৮:৫৩ অপরাহ্ণ

বছর আটেক আগে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিষয়ক একটা বই সম্পাদনা করছিলাম।
বইটিতে কথাশিল্পী রশীদ হায়দার সম্পাদিত ভঙ্ককর অভিজ্ঞতা থেকে আমি বেশ কিছু লেখা আমার বইয়ে নিই। কিন্তু রশীদ ভাইয়ের কাছ থেকে অনুমতি নেইনি। হঠাৎ দেখা বাংলা একাডেমির ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবনের নিচে, পুকুরপাড়ে। আমি বললাম, রশীদ ভাই…। আমি বেশ কুণ্ঠিত ছিলাম, বইটি বের হয়ে গেছে ইতোমধ্যে, অথচ অনুমতি নেইনি। নিশ্চয় ধমক দেবেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, মুক্তিযুদ্ধের আমার যা কিছু আছে, ছাপাতে থাকো, ছড়িয়ে দাও, আমার কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই। নিমিষে বুকের ওপর থেকে একটা ভার নেমে যায়। রশীদ ভাইয়ের মতো সবাই যদি…।
রশীদ হায়দার সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেননি, ভেতরে প্রচণ্ড বেদনা ছিল, আক্ষেপ ছিল। সবার দ্বারা সবকিছু হয় না। মানুষ সব সময়ে সব কাজের জন্য প্রস্তুতও থাকে না। কিন্তু রশীদ ভাই মুক্তিযুদ্ধের ওপর যা রচনা করে গেছেন, একজন সরাসরি মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কখনো কখনো অনেক বেশি। তিনি রশীদ হায়দার অনেকগুলো উপন্যাস লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের আখ্যানে, সেই সঙ্গে গল্পও। ‘শোভনের স্বাধীনতা’ নামে লিখেছেন অসাধারণ কিশোর উপন্যাস।

সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রশীদ হায়দারের সম্পাদিত গ্রন্থ স্মৃতি ১৯৭১। কতো মানুষের রক্তঅশ্রæতে সিক্ত লেখায় স্মৃতিতে ভাস্বর হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বেদিমূলে প্রাণ বিসর্জন দেয়া এইসব মহৎ বীর। ‘স্মৃতি ১৯৭১’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে যায় পাঠকদের মধ্যে। কারণ, পাকিস্তানি হায়েনা বাহিনীর নির্মম আগ্রাসনে বাংলাদেশের কতো মননশীল সৃজনশীল মেধাবী মানুষদের হত্যা করেছে, এখনও যার হিসেব মেলেনি। সেইসব শহীদের প্রিয়জনেরা যে স্মৃতিভাষ্য লিখেছেন বেদনার রক্তে স্নাত হয়ে, আজ আমাদেরই প্রেরণার উৎস। অভিনব এই প্রকাশনায় দিকে দিকে সাড়া পড়ে যায়।

স্মৃতি ১৯৭১ বই সম্পর্কে সম্পাদক রশীদ হায়দার সবিনয় নিবেদনে লেখেন ‘এইসব রক্তাপ্লুত রচনা সহৃদয় পাঠককে মুহূর্তেই স্পর্শ করে যায়, আবেগপ্রবণ করে তোলে। যাঁদের অতি আপনজন শহীদ হয়েছেন, তাঁদের শূন্যতা, কষ্ট, হাহাকার, বঞ্চনা, অবহেলা সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে আছে এবং থাকবে। আমি দৃঢ়তার সাথেই বলতে চাই, এই দুঃসহ কথামালা সম্পাদনা করা সম্ভব নয় বলেই, মহাপরিচালক ড. কামালের পরামর্শ ও নির্দেশ অনুসারে আমি শুধু সচেষ্ট থেকেছি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে উল্লিখিত বুদ্ধিজীবী কবে, কোথায়, কার দ্বারা, কীভাবে শহীদ হয়েছেন, সেই তথ্যগুলিই যথাযথ রাখতে।
রশীদ হায়দার কোনো কৃতিত্ব নিতে চাননি। তিনি আরও লিখেছেন ‘সম্পাদক হিসেবে আমার নাম মুদ্রিত হলেও আমি নিজেকে কখনোই ‘সম্পাদক’ বলতে চাই না, বলি, ‘সংগ্রাহক’। কারণ ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০ সাল পর্যন্ত ১৩টি খণ্ডে যে তিন শতাধিক লেখা ছাপা হয়েছে, তার মধ্যে প্রকৃত লেখকের সংখ্যা ২০-২৫ জনের বেশি নয়, কিন্তু অবশিষ্ট লেখকবৃন্দ? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই ‘অলেখক’দের মধ্যে অনেক লেখকের লেখা পড়ে আমার চোখ ভিজে উঠেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছে, মনে হয়েছে আমি অনেকেরই অন্তরের রক্তক্ষরণের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’

এই হচ্ছে আমাদের নির্ভার অনন্য রশীদ হায়দার। যার অক্লান্ত পরিশ্রম, ক্রমাগত তাগাদায় এই মহার্ঘ্য লেখাগুলো, উদ্ধার করেছেন, আমাদের দুঃসহকালের মর্মন্তিক যাতনা তুলে ধরেছেন, রেখে গেছেন ভবিষ্যৎকালের কাছে স্বাধীনতার সাক্ষ্য, কিন্তু তিনি কোনো ক্রেডিট নিতে চাননি। যখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে অকৃতজ্ঞদের মিছিল…।

বিশিষ্ট সাংবাদিক শহীদ আ ন ম গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ঝর্ণা জাহাঙ্গীর লিখেছেন স্বামীকে নিয়ে ‘এমন সময়ে বারো তেরো জন লোক এসে বাড়ির দরজায় দাঁড়াল। হাতে বন্দুক, পরনে ইউনিফরম। গেট খুলে দুজন বাড়ির ভিতরে ঢুকে বারান্দায় দাঁড়ানো মোস্তফার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, এটা কী মোস্তফা সাহেবের বাড়ি? মোস্তফা কোথায়?

এগিয়ে এল মোস্তফা, কোলে অভী, বলল, ‘আমি মোস্তফা’।
ওরা বলল, ‘কাইন্ডলি আমাদের সাথে আসুন। ভযের কিছু নেই, আমরা আপনাকে পূর্বদেশ অফিসে নিয়ে যাবো। ওখানে আপনার আইডেনটিটি কার্ডটা একটু পরীক্ষা করবো।’

না, ঐ মুহূর্তে ভয় পায়নি মোস্তফা। ও তো জানে সাংবাদিকদের কেউ কোনো ক্ষতি করবে না। আইডেনটিটি কার্ডটি ঔ সময়ে তার পরে থাকা পাঞ্জাবির পকেটেই ছিল। শুধু অভীকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো মোস্তফা।’ গোলাম মোস্তাফা চলে গেলেন, গেলেন তো গেলেন, চিরকালের জন্য গেলেন। একাত্তরে, পাকিস্তানি হায়েনা সৈন্যদের পরাজয়ের পূর্ব মুহূর্তে এমন মৃত্যু আয়োজন পৃথিবীর কোথাও কোনো রাষ্ট্র দেখেছে? দেখেনি, কিন্তু মুসলমান হয়ে মুসলমানদের বাংলাদেশে দেখিয়েছে রক্তচোষা পাকিস্তানি সৈন্যরা আর ওদের সমর্থক এই দেশে জন্ম নেয়া, বেজন্মারা…।

আমরা তো লেখাটা পড়ে মর্মবেদনায় পীড়িত। কিন্তু আ ন ম গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ঝর্ণা জাহাঙ্গীর যখন লিখছেন, ভাবুন সেই মর্মন্তিক মুহূর্তগুলো? ঝর্ণা জাহাঙ্গীরের এই যে স্বামীকে নিয়ে স্মৃতিভাষ্য লিখলেন, রশীদ হায়দার আদায় করলেন, আদায়ের পিছনে কতো পরিশ্রম টেলিফোন ছিল, একজন লেখক হিবেসে আমি জানি। কিন্তু তিনি কাজটি করেছেন একাত্তরের একজন গেরিলার গতিতে, নিঃশব্দে, গোপনে কিন্তু লক্ষ্যভেদী।

রশীদ হায়দার ১৯৮৮ সালে স্মৃতি ১৯৭১ সম্পাদনা করতে করতে তেরোটি খণ্ড করেছিলেন। অনেক বছর পর বাংলা একাডেমি তেরো খণ্ডকে চারখণ্ডে প্রকাশ করেছে। রশীদ হায়দার ‘সবিনয় নিবেদন’ নামে ভ‚মিকাও লিখেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন ‘১৯৭১ এর স্মৃতি বেদনার। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির রক্ত আর পাশবিক যন্ত্রণার ইতিহাস। মহান মুক্তিযুদ্ধে বর্বর পাকিস্তানীদের হাতে লক্ষ লক্ষ নারী, পুরুষ, শিশু, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, প্রকৌশলীসহ অনেক বাঙালি নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার বেদীমূলে উৎসর্গ করেছেন বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, ভাই-বোন, বন্ধুদের। প্রিয়জন হারানোর বেদনা স্মৃতির মণিকোঠায় চিরকাল জাগরুক থাকে। অশ্রু ‍সজল সেই স্মৃতি কখনো ভুলবার নয়। স্মৃতি একাত্তর প্রথম খণ্ড গ্রন্থে ৭১ এ প্রিয়জন হারানো ছিয়ানব্বই জন বীর শহীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে অমৃত স্মৃতিকথা লিখেছেন নিকট জনেরা।’

ফিরে তাকাই রশীদ হায়দারের অন্যান্য রচনাবলীর দিকে। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়, ১৯৬৩ সালে। নাটক, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ মিলিয়ে সত্তরটি বইয়ের মালিক তিনি। কাজ করেছেন অনেক বড় বড় জায়গায়। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র, কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলা একাডেমির পরিচালক পদ থেকে অবসরে গেছেন তিনি। কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার পুরস্কার পেয়েছেন অনেক। রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির পুরস্কার, রাজশাহী সাহিত্য পুরস্কার….।

২০১৩ সালে দিল্লির ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট বাংলাদেশের প্রথম যে দুজন গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করে, রশীদ হায়দার একজন ছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক ও কানেক্টিকাট বিশ^বিদ্যালয়ে বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন। লেখক ও সংগঠক হিসেবে রশীদ হায়দার নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়।

চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়, রশীদ হায়দার আপনি আছেন, থাকবেন আমাদের মাঝে সৃষ্টির কালো কালো তিলের মাঝে আলোর দ্যুতি হয়ে।