মহিলা সমিতিতে মঞ্চস্থ হলো ‘লালজমিন’

আগের সংবাদ

রেলের উন্নয়নে সংস্কার জরুরি

পরের সংবাদ

ডিজিটাল যুগে এনালগ রেল

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২০ , ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০২০ , ১২:৫৮ অপরাহ্ণ

২৫ হাজার কর্মীর প্রায় সবাই হাজিরা দেন খাতায়।
অধিকাংশের বেতন হয় স্টেশন থেকে হাতে হাতে।
মাসে ১-২ দিন হাজিরা দিয়েও বেতন নেন অনেকে।

দেশের টেকনাফ থেকে তেতুঁলিয়া পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল ব্যবস্থায় উপবৃত্তি পায় স্কুল শিক্ষার্থীরা। মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তারিখে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছে যায় নির্ধারিত অর্থ। আবার সচিবালয়, সংসদ, নির্বাচন কমিশনসহ দেশের প্রায় সব কটি মন্ত্রণালয় ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় ডিজিটাল পদ্ধতিতেই কর্মীদের হাজিরা নিশ্চিত করা হয়। তাদের বেতন-ভাতাও চলে যায় ব্যাংক হিসাবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ রেলওয়েতে এখনো টালি খাতায় স্বাক্ষর করে হাজিরা দিতে হয়।

মান্ধাতার আমলের বেতন বইয়ে স্বাক্ষর করেই হাতে হাতে নিতে হয় বেতন কিংবা পেনশনের টাকা। আর এ সুযোগে অনেক অসৎ কর্মী মাসে এক বা দুদিন হাজির হয়ে পুরো মাসের হাজিরা বইতে স্বাক্ষর করে বেতন তুলে নেন। বিনিময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার হাতে তুলে দেন নির্ধারিত মাসোহারা। আবার চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা মাস শেষে বেতন বা পারিশ্রমিক নিতে গেলেও কর্মকর্তাদের খুশি করতে হয়। রেলওয়েতে এ বিষয়টা বলতে গেলে ‘ওপেন সিক্রেট’।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেলের প্রতিটি বিভাগে কর্মীদের বেতন হয় টিকেট বিক্রির টাকা থেকে। আবার অবসরে যাওয়া কর্মীরাও দূরদূরান্ত থেকে জোন বা বিভাগীয় অফিসে এসে পেনশন বা ভাতার জন্য ধরনা দিয়ে পড়ে থাকেন। যদি টিকেট বিক্রি হয় তো পেনশন পান, অন্যথায় ফিরে গিয়ে আরেক দিন আসতে হয়ে। এ যন্ত্রণা চলছে যুগের পর যুগ ধরে। অথচ প্রায় সব মন্ত্রণালয়ে পেনশন চলে যায় গ্রহীতার ব্যাংক একাউন্টে। গত এপ্রিল মাসে বেতন ও পেনশনের ২৬-২৭ লাখ টাকা নিয়ে একটি স্পেশাল ট্রেন ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়া নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হয়। সে সময় প্রশ্ন ওঠে আর্থিক নিরাপত্তাসহ রেলের নানাবিধ ব্যবস্থাপনা নিয়েও।

যদিও এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, রেলের সব কর্মীর বেতন ব্যাংক একাউন্টে দেয়ার কাজ চলছে। আর হাজিরা ডিজিটাল করার কাজটি আমরা শুরু করেছি। করোনা সংক্রমণের কারণে তা আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে করোনা নিয়ন্ত্রণে এলে আবারো কাজ শুরু হবে।

রেল সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ২৫ হাজারের কিছু অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৪-৫ হাজার কর্মী অস্থায়ী। যারা লে-ম্যান, গেট কিপার, ওয়ে-ম্যানসহ নানাবিধ কাজে নিয়োজিত। রেলের কর্মীরা পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ৪৮২টি স্টেশনে কর্মরত। এছাড়া বেশ কিছু কর্মী কর্মরত আছেন রেলের সৈয়দপুর, পার্বতীপুর, পাহাড়তলীসহ অন্যান্য ওয়ার্কশপে। তাদের প্রায় সবার ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্ট থাকলেও বেতন নিতে হয় স্টেশন মাস্টারের ঘরে রাখা খাতায় স্বাক্ষর করে। আবার হাজিরাও দেন সেকশনে রাখা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের মাধ্যমে। ফলে দুর্নীতি ও অসততার অবারিত সুযোগ থেকে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো কোনো স্টেশনে অনেক কর্মকর্তা দৈনিক হাজিরা না দিয়েও মাসে এক বা দুদিন গিয়ে পুরো মাসের হাজিরা স্বাক্ষর করেন। আবার রেলের ওয়ে-ম্যান, লে-ম্যান, লাইনস-ম্যান হিসেবে যারা কাজ করেন; তারা গ্রুপ লিডারের কাছে হাজিরা দেন। এসব ক্ষেত্রে গ্রুপ লিডার মাসিক কিছু মাসোয়ারার নিয়ে হাজিরা দেখানোর কাজটি সুচতুরভাবে করে যান। এখানে কোনো নজরদারি বা ঝটিকা পরিদর্শনের ব্যবস্থা না থাকায় মাঠ পর্যায়ে এ পুকুর চুরির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটে যাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আবার রেলের নিরাপত্ত বাহিনী আরপিএফ বা রেল পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর অনেক সদস্য আছেন যারা রেলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত। তাদের অনেকেই নিয়মিত হাজিরা দেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতি মাসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কিছু বকশিস দিয়ে তারাও নিয়মিত বেতন-ভাতা পেয়ে যান। যার ফলে রেলের লোকসানের বোঝা দিনে দিনে ভারি হচ্ছে।

আবার সারাদেশে ১৩৬টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে অপারেটিং স্টেশন ১০৬টি ও নন-অপারেটিং ৩০টি। প্রতিটি বন্ধ স্টেশনেই এক বা দুজন কর্মী কাজ করেন এবং বেতন-ভাতা পান, অথচ এসব স্টেশনে কোনো ট্রেন থামে না। ফলে টিকেট বিক্রি নেই, নেই কোনো রকম আয়ও। রেলের লোকসান বাড়ার এটাও অন্যতম কারণ বলে মনে করেন অনেকেই।

এ বিষয়ে রেলের এডিজি (অপারেশন) মিয়া জাহান ভোরের কাগজকে বলেন, রেলের মোট ২৫ হাজারের মতো কর্মী কাজ করে। এর মধ্যে ২ হাজার ৭০০ গেট ম্যানসহ প্রায় ৫ হাজার অস্থায়ী কর্মী রয়েছেন। এসব কর্মীর বেতন-ভাতা স্বাধীনতার আগ থেকেই স্টেশনে হাজির হয়ে বেতন বইতে স্বাক্ষর করে নিতে হতো। কিন্তু বর্তমানে আমরা প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মীর বেতন-ভাতা ডিজিটাল অর্থাৎ ব্যাংক একাউন্টে দিই। আবার লে-ম্যান, গেট-ম্যানসহ কিছু কর্মীর বেতন এখনো হাজির হয়ে খাতায় স্বাক্ষর করে দিতে হচ্ছে। তবে অতি দ্রুত এসব কর্মীর বেতন ব্যাংক একাউন্টে দেয়া সম্ভব হবে।

কর্মীদের হাজিরার বিষয়ে তিনি বলেন, রেলের সব কর্মীকে হাজিরা খাতায় সই করে হাজিরা দিতে হয়। তবে কর্মকর্তাদের কোনো হাজিরা খাতা নেই। স্বাধীনতার এত বছরেও কেন ডিজিটাল হাজিরা হয়নি? এ প্রশ্নের জবাবে মিয়া জাহান জানান, ২০১৯ সালে রেলওয়ে একটা প্রকল্প গ্রহণ করে। বেনু রঞ্জন সাহা নামের একজন চিফ সিগন্যালিং অ্যান্ড টেলি-কমিউনিকেশন (সিএসটি) ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্বে রেলের সমগ্র স্টেশনসহ ওয়ার্কশপগুলোতে হাজিরা ডিজিটাল করার কাজ শুরু হয়। কিন্তু রেল ভবন ও কমলাপুর স্টেশনের কিছু কাজ করার পরে করোনার কারণে সে কাজটি আপাতত বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে কমলাপুরে মোট ৩০ জনের মতো বুকিং ক্লার্ক ডিজিটালি হাজিরা দেন বলেও জানান তিনি।

মিয়া জাহান আরো জানান, করোনা সংক্রমণ বন্ধ হয়ে গেলে ডিজিটাল হাজিরাসহ টিকেটিং সিস্টেম, রেলের অবস্থান, রেল কতটা বিলম্বে ছাড়বে, কোন ট্রেনের কতটা টিকেট খালি আছে সব কিছু স্টেশনে দাঁড়িয়ে বা মোবাইলে জানা যাবে।

এদিকে নিচু স্তরের কিছু ওয়ে-ম্যান বা লে-ম্যানের হাজিরা নিয়ে নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন বলে জানিয়েছেন রেলের পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সরদার শাহাদাৎ হোসেন। তিনি বলেন, এখনো আমরা হাজিরা যেহেতু ডিজিটাল করতে পারেনি সে কারণে খাতায় সই করে কর্মীরা হাজিরা দেন। তবে মাঠে অর্থাৎ লাইন দেখভালের দায়িত্বে থাকা লে-ম্যান-ওয়ে-ম্যানদের প্রতিদিন স্টেশনে এসে হাজিরা খাতায় সই করার বাধ্যবাধকতা নেই। এই সুযোগে গ্রুপ লিডারের সঙ্গে যোগসাজসে কর্মস্থলে হাজির না হয়েও বেতন তোলার ঘটনা ঘটতে পারে। তবে আমরা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঝটিকা তদন্তে যাই। সেখানে যদি কাউকে পাওয়া না যায় তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া হয়। এটা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি হাজিরা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হয়।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়