ছাগল বিক্রি করে খড় কিনছেন গো-খামারিরা

আগের সংবাদ

মাহফুজ ও তারেকের ডিএনএ সংগ্রহ

পরের সংবাদ

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে হুমকিতে উপকূলের জেলেরা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২০ , ৫:১৩ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০২০ , ৭:১৮ অপরাহ্ণ

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে হুমকির মুখে জেলে জীবন। ধারাবাহিকভাবে নদী ও সমুদ্রে জীবিকা নির্বাহের পট পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনে। এমনটাই দাবি করছেন চরাঞ্চলের জেলেরা। বন্যা, ঝড় জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডোর তাণ্ডব, নদী ভাঙন ও জোয়ারের গতির তীব্রতায় নদী-সমুদ্রে মাছ উৎপাদন কমে যাওয়ায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। একমাত্র পেশা জেলে জীবন ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন অনেক জেলে। এছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে না পাওয়ায় কোন কোন জেলে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

উপজেলার নদী ও সমুদ্র মোহনায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী জেলেরা জানান, নদী প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের সঙ্গে মানুষের অযাচিত আচরণের কারণে। যার জন্য বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তারা পরিবার নিয়ে শঙ্কিত। বাধ্য হয়ে বদলাতে হচ্ছে জীবন-জীবিকা।

ভাঙন কবলিত নদী উপকূলে বসবাসরত জেলেদের প্রতি বছরে একাধিকবার বসতবাড়ি অন্যত্র স্থাপন করতে হয়। সেই সঙ্গে জেলে শিশুরাও স্বপ্ন ভাঙা শৈশবের স্মৃতি বয়ে বেড়ায় সাড়া জীবন। উপকূলের জনজীবনটাই যেন দুঃস্বপ্ন। হাতছানি দিয়ে ডাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত কোনো এক সভ্যতায়। এমনটাই বলছেন ধারাবাহিক জীবনে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার শিকার জেলেরা।

চরফ্যাশনের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ট্রাস্টের ভোলা জেলা সহকারী পরিচালক রাশিদা বেগম জানান, কার্বনের উষ্ণতায় মেরু অঞ্চলের বরফ গলে নদী ও সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ছে। নানা দুর্যোগে বন্যা, খরা, ঝড় জলোচ্ছ্বাস ও টর্নেডো এবং লবণাক্ততা বাড়ার ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার শিকার হতে হচ্ছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের।

মাছ শিকারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলারা।

আসলামপুরের প্রবীণ জেলে সাজাহান ফরাজি বলেন, নদীকে মানুষ তার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যবহার করছে। ইঞ্জিনচালিত বোট বা নৌকা ট্রলারের প্রতিযোগিতার কারণে এবং কল-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে নদী দূষিত হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় মাছ বেশি শিকার ও মাছের প্রজনন কমার জন্য নদীতে আজ মাছ নেই। ফলে নদী হারিয়েছে তার জীববৈচিত্র্য।

ঢালচর ইউনিয়নের জেলে আবদুর রহিম (৫২) নাসির (৭২) বেলাল (৩৪) ফারুক (৩৫) আবদুস সালাম (৫২) বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সাগর উপকূলে বসবাস করা সত্তেও সাগরে গিয়ে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বন্যা, তুফানের মধ্যে মাছ শিকার করা সম্ভব হচ্ছে না। দুই যুগ আগেও নদী-সাগরে মাছ শিকার করে অনেক জেলেই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে রাতারাতি জীবন বদলে ফেলতেন। বর্তমানে নদী ভাঙনের ফলে এবং বন্যা তুফানে আমাদের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে গেছে।

স্থানীয় জেলে মৃত রহিমের স্ত্রী রোশনা বিবি (৬০) বজলুর রহমানের স্ত্রী ছকিনা বেগম জানান, ২০ বছরে নদী ভাঙনে ১২ বার ভাঙনের শিকার হয়ে বসত বাড়ি হারিয়ে এখন নিঃস্ব অবস্থায় জীবনযাপন করছি।

ইয়ানুর বেগম (৬০) জানান, আমাদের ঢালচরে প্রায় এক একর জমি ছিল। কিন্তু নদী ভাঙনে সব হারিয়ে এখন জীবিকা সংকটে আছি।

একই এলাকার জেলে দুলাল ও সফিক বলেন, সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলার ও জাল হারিয়ে ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি। এছাড়া নদী সাগরে মাছের সংকট দেখা দেয়ায় জেলে পেশা ছেড়ে বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজছি।

চরফ্যাশনের মুজিব নগর ইউনিয়নের জেলে সালাহ উদ্দিন মাঝি বলেন, চলতি বছরে সাগরের গভীরে মাছ শিকার করতে গিয়ে হঠাৎ টর্নেডোর আঘাতে ১৬ জন জেলেসহ ট্রলার ও জাল হারিয়েছি। ১০ জন জেলে উদ্ধার হলেও ৬ জেলে নিখোঁজ হয়ে যায়।

চর কুকরি-মুকরি, মাদ্রাজ, হাজারিগঞ্জসহ বিভিন্ন চারাঞ্চলে ঝড়-তুফান নদী ভাঙনে সংগ্রাম করে হাজার হাজার জেলে বসবাস করছে। এসব জেলেরা নদী ও সমুদ্রে মাছ শিকার করে। তবে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ভোলার উপকূল এলাকাগুলো এখন মাছ শূন্য।

খালে পড়ে আছে মাছ ধরার নৌকা।

জেলেদের জীবিকা নির্বাহে সংকট দেখা দেয়ায়, মেঘনার উপকূল ঘেষা খালে ও চরাঞ্চলে শত শত ট্রলার এখন অলস পড়ে থাকে। সকাল দুপুর ও পড়ন্ত বিকেল গড়িয়ে গেলেও ডিঙ্গি বা ট্রলারের রঙিন পতাকাগুলো বাতাসে উড়তে দেখা গেলেও দীর্ঘদিন ধরে নদীতে যাচ্ছে না এসব ট্রলার।

উপজেলা জলবায়ু ফোরামের সভাপতি এম আবু সিদ্দিক বলেন, জলবায়ুর চিত্রপট পাল্টে যাওয়ায় ঋতু চক্রের ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। যার জন্য নদী ও সাগরে মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন হয়েছে। অনভিজ্ঞ জেলেরা ঘুরে ফিরে একই এলাকায় মৎস্য শিকারে যাওয়ায় মাছ কম পাচ্ছে তারা। এছাড়া বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পানির উচ্চতা ও জোয়ারের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে। এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে। বৈশ্বিকভাবে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব না কমাতে পারলে পুরো মানব জাতিই এক চ্যালেঞ্জিং সংকটে পড়বে বলে মনে করি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মারুফ হেসেন মিনারের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, সম্প্রতি অতি বৃষ্টির রেকর্ড বিগত ১০ বছরের বৃষ্টিপাতের চেয়ে বেশি হওয়ায় এবং আগের বছরগুলোর তুলনায় ঝড়বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় নদী ও সমুদ্রে জীবিকা নির্বাহে জেলে পেশা কমছে। এছাড়া নদী ও সাগরে মাছের সংখ্যা কমলেও বড় মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অঞ্চলের জেলেরা মূলত দিন এনে দিন খাওয়ার ফলে মাছের অভয়ারণ্য গভীর সমুদ্রে তারা কম যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, স্থানীয় নদী উপকূলে মাছের বিচরণ ক্ষেত্র পাল্টে যাওয়ায় উপকূলীয় নদীতে মাছের সংখ্যা কমেছে। জেলেরা এসব অঞ্চলে মৎস্য শিকারে যাওয়ায় সম্প্রতি মাছের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে জেলেরা যদি সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাছের অভয়ারণ্য গভীর সমুদ্র ও নদীতে মাছের বিচরণ এলাকায় যায় তাহলে তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। পাশাপাশি তারা সঠিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ভোলা-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, চরফ্যাশন উপজেলার নদীভাঙন কবলিত এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়াও কার্বন নিঃসরণে বেড়িবাঁধের ঢালে বৃক্ষ রোপণও করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভোলা জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ পরবর্তী মেঘনা নদীর পানি সমতল বিপদ সীমার ১১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে। যা স্মরণকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর ফলে বেড়িবাঁধের বাইরে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়িবাঁধের উচ্চতাও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ভোলা জেলার বেড়িবাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধিতে পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়