বাফুফে নির্বাচন: ভোট গণনা শুরু

আগের সংবাদ

ড. কামাল কাউন্সিলে না এলে নতুন নেতা নির্বাচন

পরের সংবাদ

‘অদ্ভুত আঁধার’ থেকে পরিত্রাণের আলো চাই

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২০ , ৭:০৮ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০২০ , ৭:১৫ অপরাহ্ণ

পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে এসব নরপিশাচ কী ধরনের শিক্ষা অর্জন করে ‘কলেজ’ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে? এ প্রশ্ন বক্ষে ধারণ করে গণধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েটি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে কাতরভাবে যদি তাকায় তার কি কোনো জবাব আমরা দিতে পারব? নাকি তার চোখের দিকে চোখ রেখে তাকানোর নৈতিক সাহসটুকু আমরা পাব? জানি, সুস্থভাবে আমরা তার চোখের দিকেও তাকাতে পারব না, তার কাতর প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দিতে পারব না।

প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সাভারে খুন হয়েছে স্কুলছাত্রী নীলা রায়। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে তাকে খুনই করতে হবে এমন মধ্যযুগীয় চিন্তার পশ্চাতে ‘নেপথ্য শক্তি’র প্রয়োজন হয়। এমন খুনির পেছনে নিশ্চিত ‘আশ্রয়’ থাকা অস্বাভাবিক নয়। বরং ‘শেলটার’ আছে কিংবা থাকে বলেই অপরাধীর নিজের ভেতরকার পশুশক্তি দুর্দমনীয় নৃশংসতা নিয়ে প্রকাশ পায়। সমাজের চোখে বিবেচিত ‘অপরাধ’কে এরা ‘অধিকার’ ভেবে বসে থাকে। আর তাই নীলা রায়ের মতো মেয়েরা অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করেন, নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করা হয়। নীলা রায়ের মতো একের পর এক হত্যাকাণ্ড সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষকে বিচলিত ও বিমর্ষ করে। খুনি মিজানুর রহমান যে পরিণত বয়স্ক গণমাধ্যমে তার ছবি দেখে বুঝা যায় না। তাকে বড়জোর কিশোর বলা যেতে পারে। তাই আমরা আরো বেশি বিচলিত ও বিমর্ষ বোধ করছি। কারণ শিশু-কিশোরদের মধ্যে এমন ভয়ঙ্কর ও নৃশংস মনোভাব জেগে উঠলে সমাজের ভবিষ্যৎ অভিযাত্রা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ’। কবি জীবনানন্দ দাশ মানবসৃষ্ট কোন বিপর্যয়ের কারণে তার কবিতায় এমন চরণের বিন্যাস করেছিলেন জানি না। জানি না, কেন তিনি এমন আক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু বিগত কয়েক দিনের ঘটে যাওয়া সামাজিক অনাচার দেখে উদ্ধৃত চরণটিই মনের মধ্যে খেয়ালে-বেখেয়ালে নিত্যই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। আমরা সাভারের ঘটনা বলেছি। নীলা রায়কে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংসতায় পরিবারের স্বজন-আত্মীয়দের দুঃখ ও বেদনার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কিন্তু জীবনের সব চাওয়া-পাওয়ার অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছে নীলা রায়। কোনো রকমের বোধশক্তি দিয়ে নীলা তার জীবনের যন্ত্রণাকে আর স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু সিলেটের ‘এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে’ ছাত্র নামধারী পশুদের দ্বারা যে গৃহবধূটি গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিনি তার জীবনে এক মুহূর্তের জন্যও কি এই বেদনার কথা ভুলতে পারবেন? পারবেন না। ফলে তার বেঁচে থাকার তীব্র যন্ত্রণা আমাদের পক্ষে অনুমান করাও অসম্ভব। গৃহবধূটির জীবনের এই অন্তহীন ট্র্যাজেডির কোনো শেষ নেই! মর্মে মর্মে ও পলে পলে অনন্ত বেদনার সারাৎসার স্পর্শ করে করেই তাকে জীবনযাপন করতে হবে। ‘জীবন-যন্ত্রণা’ যে কী বস্তু তা তিনিই উপলব্ধি করতে পারবেন আর কেউ নন!

আমরা যে ‘অদ্ভুত আঁধারে’র কথা বলছিলাম, আমরা যে নেপথ্য শক্তি বা অপরাধীর আশ্রয়ের কথা বলছিলাম সিলেটে ঘটে যাওয়া বিকৃত-অপরাধের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। সমাজে সেই অন্ধকারের সপ্রকাশ ইঙ্গিত গণধর্ষণের এ ঘটনায় আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এ ঘটনায় উপলব্ধি করা যায় আমরা কতটা অন্ধকারে পতিত হয়ে গেছি। আমাদের সমাজে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনাও ঘটে! এ শুধু অন্ধকার নয়, জীবনের চরম এক বিকৃতি! এই বিকৃত উল্লাসের পেছনেও ‘নেপথ্য শক্তি’, ‘আশ্রয়’ কিংবা ‘শেলটার’ জাতীয় কিছু একটা আছে! সেই ‘শক্তি’ যদি না থাকত তাহলে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে বেঁধে রেখে পশুরা গৃহবধূটির সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারত না। ‘শক্তি’ তাদের ছিল। সরকারদলীয় রাজনৈতিক সংগঠনের পরিচয়টিই ছিল প্রধান আসামিসহ কয়েকজনের সব শক্তির উৎস! নিজেদের ছাত্রলীগ কর্মী দাবি করে দীর্ঘদিন নানা অপরাধ সংঘটনের মাধ্যমে তারা ‘হাত পাকিয়েছে’। সাভারের নীলা রায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামির মতো সিলেটের অপরাধীরা কিশোর নয়- রীতিমতো যুবক। পরিণত বয়স্ক ও সংঘবদ্ধ যুবকদের দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হন গৃহবধূটি। আমরা যে নেপথ্য শক্তির কথা বলছিলাম সেই শক্তির উৎসই অপরাধীদের স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের বিকৃত ইন্ধন জোগায়! ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে দুর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে বিচরণকারী সেসব যুবক এমন নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছে। ছাত্রলীগ তাদের রক্ষা করবে এই ছিল তাদের ভরসা! কিন্তু ছাত্রলীগের ইতিহাস অনেক গৌরবের, অনেক স্পর্ধারও। বিকৃতমনস্করা তা বুঝতেই পারেনি, আফসোস! বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগ কখনো পশুদের আশ্রয়শালা হতে পারে না।

ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের কথা নাইবা বললাম, কলেজপড়ুয়া কোনো ছাত্রের দ্বারা ‘ছাত্রাবাসের ভেতর’ এমন ঘটনা ঘটতে পারে এ কথা চিন্তা করতেও আমরা বিস্মিতবোধ করি! যত খারাপ ছাত্রই হোক যিনি একবার কলেজের ‘চৌকাঠ মাড়িয়েছেন’ তার ন্যূনতম এক ধরনের ‘রুচি’ থাকে। অন্তত এমনটিই বিশ্বাস আমাদের। ছাত্ররাও খারাপ কাজ করে, মানুষের মধ্যে এমন কম ব্যক্তিই আছেন যারা ছোটখাটো কোনো খারাপ কাজ করেননি- ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষের প্রবৃত্তি (instinct)। কিন্তু সেই খারাপেরও একটা সীমা থাকে, মাত্রা থাকে! এমসি কলেজকাণ্ড আমাদের সেই বিশ্বাসের মূলেও কুঠারাঘাত করেছে! এটি কোনো খারাপ কাজ নয়, এর সঙ্গে অতি নিকৃষ্ট খারাপেরও কোনো তুলনা হয় না। একে ‘বিকৃত’, ‘নারকীয়’ ও ‘পৈশাচিক’ বললেও সেই ঘটনার জঘন্যতাকে পরিস্ফুট করা সম্ভব নয়, সেই ঘটনার মর্মান্তিকতাকেও স্পর্শ করা সম্ভব হয় না। এমসি কলেজ প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া সেই বিকৃত ও পৈশাচিক ঘটনা আমাদের সব প্রকার সামাজিক রীতি-নীতি, মূল্যবোধ, সংস্কার-সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি ধর্মীয় মূল্যবোধকে কেবল প্রশ্নবিদ্ধই করে না বরং সিলেটবাসীর মতো সমগ্র দেশবাসীর মানবতাবোধকে লজ্জায় অবনত করেছে। কলেজের ‘ছাত্রাবাসে’ গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনায় শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেও লজ্জায় অবনত করেছে।

পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে এসব নরপিশাচ কী ধরনের শিক্ষা অর্জন করে ‘কলেজ’ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে? এ প্রশ্ন বক্ষে ধারণ করে গণধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েটি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে কাতরভাবে যদি তাকায় তার কি কোনো জবাব আমরা দিতে পারব? নাকি তার চোখের দিকে চোখ রেখে তাকানোর নৈতিক সাহসটুকু আমরা পাব? জানি, সুস্থভাবে আমরা তার চোখের দিকেও তাকাতে পারব না, তার কাতর প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দিতে পারব না। রাজনৈতিক শক্তি বা আশ্রয়ের দম্ভে বিকৃত-নরপিশাচরা যে ঘটনা ঘটিয়েছে তাতে কেবল কলেজপড়ুয়া নন, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠগ্রহণকারীর পক্ষেই লজ্জার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আমরা যে নেপথ্য শক্তির কথা বারবার উল্লেখ করেছি, এমসি কলেজকাণ্ডে আটকদের অধিকংশই পুলিশের হেফাজতে আছে। সেই সূত্রে তাদের জীবনী শুনেও তাদের শক্তির প্রমাণ পাই। ধরা পড়ার পর থেকে আটককৃত নরপিশাচদের যে জীবনবৃত্তান্ত বেরিয়ে আসছে তা ভয়ঙ্কর সব গল্পের মতোই! এমসি কলেজে ছাত্রলীগের ‘কমিটি নেই’ বলে কেন্দ্র বিবৃতি দিলেও দিনের পর দিন যেহেতু ছাত্রলীগের নামে এরা কলেজ ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, অতএব কিছু দায় ছাত্রলীগকে নিতেই হবে। আবার ছাত্রলীগ হিসেবে নানা অনিয়মে ‘ছাড়’ দেয়ায় কলেজ প্রশাসনকেও দায় নিতে হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষ জবাবদিহিতার বাইরে থাকতে পারে না। করোনাকালে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। অথচ এর মধ্যেই সংঘবদ্ধ অপরাধীদের আখড়া গড়ে উঠেছে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে! দিনের পর দিন সেই আখড়ায় অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার ‘সুযোগ’ যে প্রশাসন থেকে দেয়া হয় অথবা ‘জোরপূর্বক’ যে প্রশাসনের কাছ থেকে সুযোগ আদায়ে দুষ্কৃতকারীরা সক্ষম হয় সেই ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ মার্কা প্রশাসনকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে কলেজ প্রশাসনের ভ‚মিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ প্রশ্ন অবান্তর নয়। আমরা কখনো বলি না যে, প্রশাসন ধর্ষণ বা কুকর্মের সঙ্গে জড়িত, তবে এ কথা তো বলা যায় যে, করোনাকালে ছুটি ঘোষিত হওয়ার পর প্রশাসনিক নজরদারি সক্রিয় থাকলে এমন কাণ্ড ঘটতেই পারত না। আর ধর্ষণকাণ্ডের পর এমসি কলেজ প্রশাসনকে পুনরায় ‘কলেজ ছুটি’ বা ‘হোস্টেল বন্ধে’র ঘোষণাও দিতে হতো না। সুতরাং প্রশাসনিক ঢিলেমিকে আমরা তো প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পারি। বিশেষ করে আমাদের যাদের ঘরে কন্যা সন্তান আছে তাদের মুখের দিকে তাকিয়েও আমরা নিজেদের অপরাধী ভাবি। কন্যাদের সামনে লজ্জায় অবনত থাকি।

বিগত সপ্তাহে অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয়ে গেল ‘কন্যা দিবস’। এই দিবসটি পালনের কয়েক দিন আগে থেকে গণমাধ্যমের প্রধান খবরই ছিল ধর্ষণ ও নারী হত্যা। অমানবিক ও বিকৃত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে খাগড়াছড়িতেও। সেখানে প্রতিবন্ধী বালিকাকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে! অর্থাৎ গত মাসের শেষ সপ্তাহটি সামাজিক অনাচারের তীব্র দহনের মধ্য দিয়ে পার করেছে বাংলাদেশ। যাদের ঘরে কন্যা সন্তান আছে তাদের জন্য সময়টি অত্যন্ত দুর্বিষহ! কন্যাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা নিজেদেরও এক রকম অপরাধী ভাবি, দেশব্যাপী নারীর নিরাপত্তাহীনতায় কন্যাদের সামনে লজ্জায় অবনত থাকি। চারপাশের এমন পাশবিক ঘটনায় সৃষ্ট হতাশা ও আতঙ্ক আমাদের দু-পাশের দু-কাঁধের ওপর নিত্যসঙ্গী ফেরেস্তাদের স্থান দখল করে নিয়েছে! সত্যিই বিকৃতি ও ভয়ঙ্করতার ‘এক অদ্ভুত আঁধার’ আমাদের চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। এই অদ্ভুত আঁধার থেকে পরিত্রাণের আলো চাই, মুক্তি চাই।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়