সামাজিক অপরাধ ও প্রতিকার

আগের সংবাদ

এমপি হাসানাতের সুস্থতার জন্য মাদ্রাসা-মন্দিরে প্রার্থনা

পরের সংবাদ

হেলাল হাফিজ

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ কবি

মোহাম্মদ আলী

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১, ২০২০ , ৯:৩০ অপরাহ্ণ

বাঙালি জাতি হিসেবে আত্ম-পরিচয়ের সংকট মুক্তির ও ঊনসত্তরের রক্তমাতাল করা সময়ে আমরা দেখতে পাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া তরুণ কবি হেলাল হাফিজের মিছিলে যাওয়ার আহ্বান। বাংলা কবিতার শহরে নান্দনিকতার ফেরি নিয়ে প্রবেশ করে চিরতরুণ কবি হেলাল হাফিজ। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি লিখে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন তিনি অথচ একটি কবিতার বইও প্রকাশ হয়নি তখন। একটি কবিতা লিখে সচেতন সাহিত্য মহলে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন। হেলাল হাফিজ বাংলাদেশ সৃষ্টির ঊষালগ্নে বাংলা কবিতায় হাতেখড়ি, তখন বাঙালি জাতি ছিল স্বাধীনতা-উন্মুখ, দেশ ছিল এক ধরনের টালমাটাল। ওই অগ্নিগর্ভ সময়ে হেলাল হাফিজের চিরদ্যুতিময় পঙ্ক্তি বাংলা কবিতায় তথা স্বাধীনতাকামী মুক্তি সেনানি বাঙালির গহীন টিলার অন্ধকারে মশালের মতো আলো জ্বালালো।

হেলাল হাফিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ‘যে জ্বলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) সালে। মাত্র ৫৬টি কবিতা লিখে হেলাল হাফিজ বহুল পরিচিতি লাভ করলেন, সমকালীন কবিতার রাজকুমার এবং ব্যক্তিগত জীবনের চিরকুমার হিসেবে পরিচিত হেলাল হাফিজ। বাংলা সাহিত্যে কেন বিশ্ব কবিতার পরিমণ্ডলেও বোধহয় এতো অল্প লিখে এতো তুমুল আলোচনায় আসা কবির সংখ্যা বিরল। বিগত তিন যুগের কাছাকাছি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বই হেলাল হাফিজের ‘যে জ¦লে আগুন জ্বলে’ বললে অত্যুক্তি হবে না। সমকাল সচেতন কবি হেলাল হাফিজের কবিতা, প্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ আর বিরহের অকল্পনীয় নৈপুণ্য ও মমতা শব্দের মালা গেঁথে কবিতাপ্রেমীদের অনির্বচনীয় ভালো লাগার স্বাদ দিয়ে চলেছেন।

‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি লিখে আসলেই তার অমরত্ব করায়াত্ত হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত জীবনে একবারও মিছিলে না যাওয়া, বোহেমিয়ান কবি হেলাল হাফিজ আলস্যকে সঙ্গী করে অনিকেত জীবন অতিবাহিত করতে লাগলেন। নন্দনতত্তে্বর ভিত্তির ওপর কবিতার মানদণ্ড বিবেচিত হলেও সামাজিক মানুষ হিসেবে কবি দায়বদ্ধ সমাজের প্রতি। কারণ কবি তো সমাজ বিচ্ছিন্ন কোনো জীব নয়। হেলাল হাফিজের কবিতার দেহ তল্লাশি করলে আমরা দেশ, কাল, প্রেম, দ্রোহ, সমকাল ও স্বদেশ চেতনার সন্ধান পাই। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এক দশক যেতে না যেতেই নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে সামরিক শাসনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল’ জারি, মৌলিক গণতন্ত্রের লেবাসে দেশকে ক্রমাগত বিপর্যস্ত করে তোলে বিশেষ করে পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের ব্যক্তি ও সমাজের সকল প্রকার স্বাধীনতা হরণ, শাসনের নামে শোষণ। বাক-স্বাধীনতা, মিছিল, সমাবেশ এমনকি নাগরিকের মৌলিক অধিকারও হয় রহিত। পূর্ববাংলার জনজীবন এক প্রকার দলিত হয়, সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র, হেলাল হাফিজের কবিতায় আমরা এই ক্রান্তিকালে অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বান শুনতে পাই। দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করলেন সময়ের সেরা দাবিটি-
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

সময়ের সেরা উচ্চারণটি হেলাল হাফিজ করলেন বাঙালির সবচেয়ে সংকট ও উত্তেজনার সময়ে। আগুনে কেরোসিন ঢালার মতো ধপ করে জ্বলে উঠলো তারুণ্য, প্রখর দীপ্ত শপথে শত্রু হননের প্রতীজ্ঞায়। হেলাল হাফিজের নিজের ভাষ্য, সময় তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন সময়ের প্রয়োজনীয় দাবিটি, আমরা যদি বলি সময়ের শ্রেষ্ঠ শপথ কবিতাটি।

কবিতায় আছে অসভ্য সভ্যতার বামদিক, মানুষের বিবেকের সদর দরজায় একটা ঝাঁকুনি। সচেতন করেন সভ্যতার মানুষকে কৌশলে, শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গিতে। আজকের অসভ্য অস্ত্র সভ্যতার প্রতি তার অনাস্থা, মানবিক জাদুর কাঠি দিয়ে মানবিক ও মনুষ্যত্বের, প্রেমের ও শিল্পের, এক নতুন পৃথিবী তিনি প্রত্যাশা করেন। যে সভ্যতা মানুষের কল্যাণে আবিষ্কৃত অস্ত্রকে মানববিনাশী কাজে ব্যবহার করে সেই সভ্যতাকে তিনি খারিজ করতে চান।
অসভ্য সভ্যতা যখন ধীরে ধীরে অশ্লীল হতে লাগলো কবিতার শরীরে তিনি পরিবর্তন আনলেন, সমকাল সচেতন কবি চারপাশের অস্থিরতা, মানুষের কপটতা, নষ্ট রাজনীতি, কৃত্রিম সংকট, মানুষের লোলুপতায় সবুজ বীজতলায় যখন পাথর বসলো তখন বড্ড অস্থির। চোখের সামনে কৃত্রিম প্লাবনে সব উবে যাচ্ছে, বৃক্ষ হারাচ্ছে তার সবুজ পিরান, মৃত্তিকায় পুড়াচ্ছে সুঘ্রাণ, চারপাশের হাহাকারে মানবতাবাদী কবির দৃঢ় প্রত্যয়-
আমি আর আহত হবো না,
কোনো কিছুতেই আমি শুধু আর আহত হবো না।
পাখি যদি না দেয় উড়াল, না পুড়ে আগুন,
অদ্ভুত বন্ধ্যা হলে উর্বরা ফাগুন, আমি আহত হবো না।
প্রেমের কবি, প্রেমিক কবি তার কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় ব্যক্তিগত প্রেমিকা ও প্রেমকে শৈল্পিক ছাপে জীবন্ত করেছেন তার নান্দনিক পঙ্ক্তিমালায়। প্রেমিকের সাথে মিলনে কবি যেমন আনন্দিত হন, বিরহেও তেমনি বেদনায় ভারাক্রান্ত হন। তার কোমল উচ্চারণ-
পরাণের পাখি তুমি একবার সেই কথা কও
আমার সূর্যের কথা, কাক্সিক্ষত দিনের কথা
সুশোভন স্বপ্নের কথাটা বলো, শুনুক মানুষ।
মানুষকে শুনাতে কৃপণতা নেই স্পষ্টবাদী কবি হেলাল হাফিজের। তাইতো পরাণের পাখির কাছে প্রেমিক কবির আবেদন আরো একবার সেই অমৃত কথা কত। এই অমৃত কথা তিনি সারাজীবন শুনতে চেয়েছেন, সেখানে কখনও কখনও নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে পাঁচ দুপুরের নির্জনতাকে খুন করে খুনি হয়েছেন। তবে সেই খুন কবি নিজেই হয়েছেন। পাঁচ দুপুরের নির্জনতার খুনি কবি হেলাল হাফিজ ‘বেদনা বোনের মতো’ ইচ্ছে ছিল, প্রতিমা, হিরণবালা, তুমি ডাক দিলে, অমীমাংসিত সন্ধি, হৃদয়ের ঋণ ইত্যাদি কবিতায় এঁকেছেন শর্তহীন প্রেমের জলছবি, মৌনতাগ্রাসী পাখির প্রেমাকুলতা অষ্টপ্রহরের খামখেয়ালি ভালোবাসা। সম্প্রতি প্রকাশিত ভোরের কাগজের সাক্ষাৎকারে কবি হেলাল হাফিজের উক্তিটি খুবই প্রাসঙ্গিক-
‘আমার জীবনে চারটা জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক নম্বর অক্সিজেন, দুই শস্যদানা, তিন নম্বর প্রেম, চার হলো কবিতা। এই চার জিনিস ছাড়া আর কোনো কিছুর প্রতি আমার লোভ নেই, আকাক্সক্ষা নেই।’
আত্মার একটি অবস্থার নামই কবিতা- বলেছেন ভের্লেন মালার্ম। হেলাল হাফিজের সেই আত্মা কষ্টের ফেরিওয়ালা, হরেক রকম কষ্ট ফেরি করে বেড়ান শৈশব হতে পরিণত মানুষ পর্যন্ত। কষ্টকাতর বেদনাবোধের কবি, তার সমকালের নষ্ট সময় অতিক্রমকালে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের নষ্টামির কাঁটায় বিদ্ধ ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত। তার নষ্ট সময়ের কষ্টকে নিপুণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন ভুল রমণীর ভালোবাসা থেকে ভুল নেতার জনসভার তীব্রতা পর্যন্ত। নান্দনিক বেদনার বরপুত্রের একান্ত ব্যক্তিগত কষ্টকে এমনভাবে প্রকাশমুক্তি ঘটিয়েছেন নিজস্ব, যন্ত্রণা পরিণতিতে মিশে গেছে শাশ্বত আবেদন সম্পৃক্ত সর্বজনীনতায়-
কষ্ট নেবে কষ্ট
ঘরের কষ্ট পরের কষ্ট পাখি ও পাতার কষ্ট
একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে
প্রেমের কষ্ট ঘৃণার কষ্ট নদীর আর নারীর কষ্ট
অনাদর ও অবহেলার তুমুল কষ্ট
কার পুড়–ছে জন্ম থেকে কপাল এমন
আমার মত ক’জনের আর
সব হয়েছে নষ্ট।
যৌন-মনস্তাত্তি্বক তত্ত্ব (চংুপযড়ংবীঁধষ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ) ফ্রয়েডের মানুষের মানসিক বিকাশ বিষয়ে একটি বৈপ্লবিক তত্ত¡। তিনি মানসিক বিকাশকে কাম তথা যৌনতায় সম্পৃক্ত করেন। ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের যৌন বাসনাগুলো যদি ভালোভাবে পূর্ণ না হয়, তবে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফ্রয়েডের বিবেচনায় মানুষের জীবনমুখী শক্তি তরোসয় লিবিডোর নিয়ন্তা, লিবিডো ও যৌনপ্রবৃত্তি প্রায় সমার্থক, ভালোবাসা অথবা আকর্ষণের মাধ্যমে এটার প্রকাশ। গত শতকের অনেক কবিমনের নিগূঢ়তম স্তরে কাজ করেছে কাম প্রেরণা। শৈশব কৈশোরের মাতৃহীনতা অনেকটা অনাদর, নান্দনিক দুঃখ প্রত্যাশী হেলাল হাফিজের কবিতায় ফ্রয়েডীয় আবেদন পরিলক্ষিত হয়। ‘ভ‚মিহীন কৃষকের গান’ কবিতার নিগূঢ় স্তরে কামের বাসনা তবে শিল্পিত কাম ও প্রেমের পূজারি কবি এখানে কামের আবেদন গঠনেও সচেতন, প্রকরণে শৈল্পিক। যদিও তার অনেক কবিতায় আমরা প্লেটোনিক প্রেমের প্রকাশ দেখতে পাই কিন্তু এখানে ফ্রয়েডীয় কামেও তিনি নান্দনিকতা প্রকাশে দ্বিধাহীন। তাইতো শব্দচয়ন কিংবা কামের আবেদনের বাক্য নির্মাণে হেলাল হাফিজের প্রকাশ অশোভন শব্দবর্জিত এবং বিজ্ঞানসম্মত-
মাত্র ইঞ্চি দুই জমি চাই
এর বেশি কখনো চাবো না
যুক্তিসঙ্গত এই জৈবনিক দাবি খুব বিজ্ঞানসম্মত
তবুও ওটুকু পাবো না
এমন কী অপরাধ কখন করেছি।
মানুষের দুঃখ, বেদনা, উৎপীড়িত, লাঞ্ছিত জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দুঃখবাদ। বাংলা কাব্য সাহিত্যে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কবিতায় বেদনা, রিক্ততা, হতাশা, ব্যর্থতার করুণ ক্রন্দন শোনা গেছে। দুঃখের বহ্নিজ্বালায় জ্বলেছে তার কবিসত্তা। তার দুঃখবাদ জড়বাদী দর্শন এবং মানবপ্রীতি থেকে উদ্ভ‚ত। ষাটের দশকের কবি হেলাল হাফিজের দুঃখ-শোককে আমরা সোজা রেখায় দুঃখবাদ বলতে পারি না, আবার হেলালকে আমরা চবংংরসরংঃ বা হতাশাবাদীও বলতে পারি না। তিনি নিয়তি তাড়িত দুঃখের যেমন ফেরিওয়ালা আবার নান্দনিক দুঃখের চাষিও বলতে পারি। তার দুঃখ জন্ম থেকে জীবনের একমাত্র মৌলিক কাহিনী এবং এই কাব্যিক চাহিদার মৌলিক দাবির অন্যতম উপাদান এই দুঃখ।
তবে যে সবসময় এই বহ্নিশিখার পথ নিজেই মাড়িয়েছেন এমন কিন্তু না নিয়তিও তাকে পুড়িয়ে খাঁটি করেছেন শৈশব, কৈশোর এবং পরিণত বয়সে। তাই তার কবিতার পোস্টমর্টেম করলে বেরিয়ে আসে-
আমার শৈশব বলে কিছু নেই
আমার কৈশোর বলে কিছু নেই,
আছে শুধু বিষাদের গহীন বিস্তার,
দুঃখ তো আমার হাত-হাতের আঙুল-আঙুলের নখ
দুঃখের নিখুঁত চিত্র এ কবির আপাদমস্তক।
হেলাল হাফিজ সকল আয়োজনে বিষাদের গহীন বিস্তার। ফরাসি কবি লুই আরাগঁ বলেছেন- ‘কবিতার ইতিহাস তার টেকনিকের ইতিহাস। কবিতার টেকনিকের প্রধানতম অঙ্গ হল তার ছন্দ।’ কাব্যভাষা উন্নত, প্রবুদ্ধ ও বিকশিত চৈতন্যের ভাষা। কাব্যভাষা আলাদা হয়ে যায় তার বিষয়ের জন্য যেমন, তেমনি তার শব্দ ব্যবহারের জন্য, ছন্দ ব্যবহারের জন্য। হেলাল হাফিজ ছন্দ সচেতন কবি। বাংলা কবিতার প্রধান তিন ছন্দকেই সচেতনভাবে তিনি তার কবিতায় প্রয়োগ করেন। গদ্যছন্দও তিনি প্রয়োগ করেন। আবার আলঙ্কারিকরা, ‘ব্যঞ্জনাকে’ই কবিতার প্রাণ বলেছেন। তার কবিতার সবচেয়ে বড় গুণ ব্যঞ্জনা। প্রকৃতপক্ষে শব্দসমষ্টি তখনই কবিতা হয়ে ওঠে যখন কবিতার শব্দগুলো অপূর্ব ব্যঞ্জনায় বেজে ওঠে। তাছাড়া কবিতা ব্যবহৃত একটি শব্দ যখন যথার্থ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে তখন তা শিল্পরূপ লাভ করে আর তখন অশোভন শব্দ বলে কিছু থাকে না।
আবার হেলাল হাফিজ তার অধিকাংশ কবিতায় বক্তব্যকে সরাসরি না এনে রূপক, উপমা আর প্রতীকের সাহায্যে অপূর্বভাবে তুলে ধরেন-
তুমি কে হে?
সোনালী ছনের বাড়ি তছনছ করে রাতে
নির্বিচারে ঢুকে গেলে অন্দর-মহলে
বেগান পুরুষ, লাজ-শরমের মাথা খেয়ে
তুমি কে হে?
কবিতা সাহিত্যের আদিম শাখা। যখন পৃথিবীর মানুষের কোনো অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তখনো মানুষের মুখে কবিতা ছিল। মানুষ যখন তার মনের ভেতরের ভাব, চিন্তা-ভাবনা, আবেগ ও অনুভ‚তিগুলো ছন্দোবদ্ধ আকারে প্রকাশ করে, তখনই সেটা হয়ে ওঠে কবিতা। তবে এটি কবিতার কোনো সংজ্ঞা নয়। অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি ইতিহাসের চেয়ে বড়।’ এডগার এলান বলেছেন, ‘কবিতা হলো সৌন্দর্যের ছন্দময় সৃষ্টি।’ কার্লাইল বলেছেন, ‘কবিতা হলো মিউজিক্যাল থট।’ এগুলো দার্শনিকদের সংজ্ঞা কিন্তু কবিরা তাদের কবিতায়ই ও এই অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বারবার। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে মধ্য আশির দশকের স্বৈরশাসনের মাতাল হাওয়ায় লেখা ৫৬টি কবিতায় হেলাল হাফিজ অসাধারণ কারুময় শৈল্পিক সত্তা ও নান্দনিকতা প্রেম, সমকাল ও স্বদেশকে এঁকেছেন, অল্প চরণের কবিতায় বৃহৎ বিষয় তুলে আনার মুন্সিয়ানা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তার অবিকল মানুষের মতো কথা বলা কবিতাগুলো তিনি দিয়ে গেলেন আমাদের, বেদনার নৌকায় যাত্রী হয়ে একদিন শরীরীভাবে হয়তো মহাকালে চলে যাবেন। দিয়ে যাবেন দিনযাপনের ফসল-
আমার কবিতা আমি দিয়ে যাবো
আপনাকে, তোমাকে ও তোকে।
শৈশব কৈশোর যৌবনে পেরিয়ে বার্ধক্যের শেষ লগ্নে এসেও তিনি কখনও বেদনাকে ছেড়ে থাকেননি। বেদনা যে তার পরম আপন। জীবনও তাকে হতাশ করেনি উজাড় করে দিয়েছে সেই নীল বেদনা। কখনও কখনও নিজের মতো করে বেদনাকে নিজেই সহোদরার মতো করে খুঁজে নিয়েছেন। তবে আফসোস তার-
‘এটা এমনই একটা আকালের দেশ, যেখানে নান্দনিক দুঃখ দেওয়ার মানুষের বড্ড অভাব ফলে কিছু বেদনা, কিছু দুঃখ আমি নিজেই আমার ভেতর তৈরি করে নিয়েছি এবং চেষ্টা করেছি এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করার।’
এই নান্দনিক দুঃখ দেয়ার মানুষের সন্ধানে ক্ষরণের লাল স্রোতে আজীবন উল্টো স্রোতে ভেসেছেন। দুঃখঘাতে সংগোপনে নিজেকে নির্মাণ করতে চেয়েছেন জননীর জৈবসারে বর্ধিত বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদতেন কবি। শৈশবে সাধ হতো নিজেই কবর হওয়ার। নিজেকে ছিঁড়ে খুঁড়ে নিজের ভেতরের বেদনাকে বাইরে দেখতে চেয়েছেন, শিল্পের সাধনায় দেখাতে চেয়েছেন-
কী দারুণ বেদনা আমাকে তড়িতাহতের মতো কাঁপালো তুমুল
বেদনার নাম করে বোন তার শুশ্রুষায়
যেন আমাকেই সংগোপনে যোগ্য করে গেলো।
এই সংগোপনে যোগ্য হওয়ার পথে তিনি ঋণী তার নারীদের কাছে, যেমনটা ঋণী ফুলের কাছে মৌমাছিরা তাইতো তার দৃঢ় শপথ হিরণবালার প্রতি।
যে হিরণবালার সুকুমল স্পর্শে তিনি বেঁচে উঠেছেন। তার হেলেন, সবিতা, শঙ্করী অথবা হিরণবালা কোনো অলীক নারী নয়। যাপিত জীবনে কবি তাদের স্পর্শে নিজের নিথর আঙুলে সুর বাজিয়েছেন। শৈল্পিক সৃষ্টি ও নান্দনিক বোধের দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রিয়তম নারী তাকে সঞ্জীবনী ও বাজানোর ব্যঞ্জনা দিয়েছে। আজন্ম তিনি তাদের কাছে ঋণী-
নারী-খেলার অভিজ্ঞতার প্রেম এবং পবিত্র ঋণ
তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখে সত্যি কি আর শোধ হয়েছে?
বিষাদের গাঁথুনি দিয়ে কবিতার স্কেচ আঁকলেও হেলাল হাফিজ স্বদেশের মানুষ নিয়ে আশাবাদী। প্রেমের মোড়কে কবিতা হলেও সামাজিক মানুষ হিসেবেও দায়বদ্ধ কবি। চোখের সামনে দেখছেন মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে প্রশাসন জাঁতাকলে পিষে ফেলছে। পতন হচ্ছে মানুষের, মনুষ্যত্বের, প্রত্যাশিত স্বদেশের, পাল্টে যাচ্ছে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সবকিছু এবং নিজের জীবনের অনেক কিছু এই পরিবর্তন চিত্র কাব্য দৃষ্টিতে চিত্রায়ণ করেন।
প্রেমের মোড়কে তার কবিতায় সমকাল ভাবনা চিরভাস্বর। ‘দুঃখের আরেক নাম’ কবিতায় পাপ, পঙ্কিলতা থেকে উদ্ধারের আহ্বান, নারীর নিবিড় স্পর্শে জেগে উঠতে চাওয়ার আকুতি হেলাল হাফিজের, তবে জেগে উঠলেন প্রায় অর্ধযুগ পরে, প্রত্যাবর্তন কবিতায়। কিন্তু পেছনে রয়ে গেলো ‘কস্টলি’ অতীত। পোড়াতে বড্ড ইচ্ছুক পোড়খাওয়া কবি। জন্মাবধি পোড়ালেন নিজেকে তাইতো দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ। কবি সমকাল, স্বদেশ ও সমাজের বাইরে কেউ নন। তার তৃতীয় চোখের এ কাব্য বিশ্লেষণ ‘প্রজাতন্ত্রে’র দশক খণ্ডে কাব্যরসিকদের জন্য প্লেটো যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তা উল্লেখ করা যেতে পারে। হেলাল হাফিজের কবিতা সাহসের পক্ষে কল্যাণকর ছিল, সমকাল সংকট যেমন উঠে আসছে কবিতায় তেমনি সংকট তীব্রতার প্রাচীর ভেঙে বিজয় আলিঙ্গনের পথ বাতলে দেয়া আছে। আমরা বলতে পারি দ্রোহ, প্রেম, বিরহের পক্ষে ছিল তার কবিতা।

এসআর