ছাড়া পেলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

আগের সংবাদ

এই মর্মব্যথা কোথায় রাখি

পরের সংবাদ

বাবলি

আন্দালিব রাশদী

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১, ২০২০ , ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

আপনি যোগ দেবার পর আপনার গাম্ভীর্য মুগ্ধ হয়ে হেডস্যার আপনাকে গার্লস হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট হতে বললেন। আপনিও আমাদের সামনেই গদগদ হয়ে উকিলরা যেভাবে হাকিমদের বলে হেডস্যারকে বললেন, মাচ অবলাইজড।
মানে আপনি রাজি হয়ে গেলেন।
হেডস্যার আপনাকে নিয়ে ছাত্রীদের ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সুপারের দুই রুমের চাবিও আপনার হাতে তুলে দিলেন এবং বললেন, শুধু খেয়াল রাখবেন যাতে কোনো স্ক্যান্ডাল না হয়।
অনেকদিন পর ছাত্রীরা একজন গার্জিয়ান পেল। তবে এতটা গম্ভীর চেহারার গার্জিয়ান তারা আশা করেনি। হোস্টেলের অনেক খবর আমাদের কানে আসে।
সদ্য ক্লাস সেভেনে এক ছাত্রী এক রাতে আপনার রুমের দরজায় টোকা দেয়। আপনি তখন ক্লাস টেনের ছাত্রীদের হোমওয়ার্ক চেক করছিলেন। আপনি দরজা খুলতেই মেয়েটি ভীষণ কাঁদতে থাকে?
আপনি জিজ্ঞেস করেন, কি হয়েছে বলো মা।
কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি যা বলে তার মূল কথা হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে মে মারা যাবে। একটা গোপন জায়গা দিয়ে তার শরীরের সব রক্ত বেরিয়ে যাবে। মেয়েটির চেয়ে বেশি খাবড়ে গেলেন আপনি। হাতের কাজ ফেলে, কোনোভাবে গায়ে শার্ট আর গলায় মাফলার পেঁচিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে একটি রিকশায় উঠলেন এবং বারবার জিজ্ঞেস করলেন, মা তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে? আপনি তাকে থানা সদর হাসপাতালে নিয়ে এলেন। ততক্ষণে মেয়েটির চোখের অশ্রুপাত অনেকটাই কমে এসেছে।
ডিউটি ডাক্তার নাসিমা বেগম একটি পর্দার আড়ালে মেয়েটিকে নিয়ে একটুখানি দেখেই বেরিয়ে এসে আপনাকে তিরস্কার করতে শুরু করল; আপনি কিসের টিচার হয়েছেন? আপনাকে কে মেয়েদের হোস্টেলের সুপারভাইজার বানিয়েছে? বেসিক হেলথ এডুকেশন নেই আপনার, কী আশ্চর্য! এমন হলে যদি হাসপাতালের আন হয় তাহলে ডেইলি এমন পাঁচশ মেয়ে অ্যাটেন্ড করতে হবে।
তারপর ডাক্তার নাসিমা আরো দু’একটা ধমক দিয়ে সস্তা দামের সরকারি সাপ্লাইয়ের এক প্যাকেট স্যানেটারি ন্যাপকিন আর ‘মাসিকের সময় করণীয়’ এই শিরোনামের এক পৃষ্ঠার একটি লিফলেট আপনার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, এই মেয়েকে নিয়ে ফিরে যান। ওর কিছুই হয়নি। ম্যানস্ট্রয়েশন শুরু হয়েছে। সব মেয়েরই হয়। এটা কোয়ায়েট ন্যাচারাল। শুনুন এ ধরনের কোনো প্যাসেন্ট নিয়ে আপনাকে যেন হাসপাতালে আসতে না দেখি। ফেরার পথে মেয়েটিকে প্যাকেটটি দিয়ে বলেন, তোমার কিচ্ছু হয়নি মা। এটা সব মেয়েরই হয়। এটা কোয়ায়েট ন্যাচারাল।
আর মেয়েটি তখন হা করে আপনার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই মেয়েটির নাম তিথি। ছাত্রীকে নিয়ে আপনার হাসপাতাল ভিজিটের কাহিনী নিয়ে টিচার্স রুমে অনেক হাসাহাসি হয়েছে। তবে এটা ঠিক সকলেই আপনার সরলতা ও আন্তরিকতার প্রশংসা করেছে।
আমার কানে এসেছে আপনি মশারি টাঙ্গান না। আপনি ভুল করছেন। আমাদের এলাকায় এনোফিলিস ও ডেঙ্গু দুই ধরনের মশাই আছে। মশাগুলো খুব ড্যাঞ্জারাস। একবার বিছানায় পড়লে খুব ভুগবেন কিন্তু। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে, এটা মনে রাখবেন।
দুঃখিত, চিঠিটা দীর্ঘ হয়ে গেল। একটু বিস্তারিত না লিখলে বোঝানো মুশকিল। সব মিলিয়ে আমার চিঠির সারমর্ম হচ্ছে আপনার হোস্টেল সুপার হওয়াটা আমার পছন্দ হয়নি।
অবশ্য আপনি বলতেই পারেন তোমার পছন্দ-অপছন্দে আমার কি এসে যায়? কিছু এসে যায় বলেই তো নিষেধ করছি।
চিঠিটি একান্তই ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগতই রাখবেন। এর কোনো জবাব দেবারও প্রয়োজন নেই।
নিবেদন, আসসালামু আলাইকুম
ইসমত আরা
শিক্ষক, জীববিজ্ঞান।

যাদব চক্রবর্তী বইয়ের ভেতর চিরকুট :
১. আপনি হারমোনিয়াম বাজাতে জানেন আপনাকে দেখলে কেউ বিশ^াস করবে না। আপনি যে গান গাইতে জানেন এটা আমাদের হেডস্যারেরই আবিষ্কার। আমাদের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্ব বরাবরের মতো নূর হোসেন স্যারের। হুদাল্লিল মুত্তাকিন স্যারের পর তিনিই নেক্সট সিনিয়র। হেডস্যার তাকে ডেকে বললেন টিচারদের পার্ফরম্যান্স বাড়াতে হবে। এবার গান গাবে দু’জন।
আমি অবাক হই। গত পাঁচ বছর একমাত্র আমিই গেয়েছি? নতুন শিল্পী তাহলে কে?
হেডস্যার আপনাকে ডেকে বললেন, তোমার বায়োডাটাতে এক্সট্রা-কারিকুলায় অ্যান্টিভিটিজ-এ গান ছিল বলে মনে পড়ছে। তুমি তাহলে গান গেয়ো।
আপনি বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নুইয়ে বললেন, জ্বি স্যার।
নূর হোসেন স্যার বললেন, তাহলে একদিন রিহার্সেল দিতে হবে।
আপনি বললেন, দরকার হবে না।
সুতরাং আপনার মতো অসামাজিক গম্ভীর মানুষকে না খাটিয়ে একেবারে মঞ্চেই আপনার নাম ঘোষণা করে বলল আপনি গান গাইবেন।
আপনি মঞ্চে ঢুকে আমাদের এলাকার বিশিষ্ট হারমোনিয়াম বাদক ওস্তাদ মীর মোহাম্মদকে বিনীতভাবে সরে যেতে বলে নিজেই রিডে আঙ্গুল বসালেন এবং গলা ছেড়ে গাইলেন :
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি
হাসি হাসি পরব ফাঁসি, দেখবে ভারতবাসী
আমি হাসি হাসি পরব ফাঁসি, দেখবে ভারতবাসী
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।
গান শেষ হতেই হেডস্যার যখন দাঁড়িয়ে হাত তালি দিলেন, আমরা কি আর বসে হাততালি দিতে পারি। তিনি বললেন, আর একটা গাও।
আপনি গাইলেন :
আমার না যদি থাকে সুর
তোমার আছে তুমি তা দেবে
তোমার গন্ধহারা ফুল
আমার কাছে সুরভি নেবে,
এরই নাম প্রেম।
এবার তেমন তালি পড়ল না, কারণ স্কুলের মেয়েগুলো আপনার দিকে হা করে থাকতে থাকতে হাত তালি দিতে বুলে গেছে। তারা বিশ্বাস করতে পারছে না, এই মানুষটি তাদের গুরুগম্ভীর কাইয়ুম স্যার।
-ইসরত আরা
২. আমি আমার পুরনো জীবনটা মুছে ফেলে নতুন একটি জীবন শুরু করতে চাই। শুরু করতে চাই আপনার সাথেই। কিন্তু কিভাবে এবং কবে শীঘ্রই জানাবেন, আমি প্রস্তুত।
৩. আপনার কোনো সাড়া পাচ্ছি না। আমার ভেতরটা খুব অস্থির হয়ে উঠেছে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছি না। -ইসমত
৪. কাল আপনি ক্লাসে আসেননি। হেডস্যারের পিয়ন হোস্টেল ঘুরে এসে বলল, আপনি সেখানেও নেই। আমি যে কোনো সময় চলে আসতে পারি এই ভয়ে পালিয়ে আছেন? আপনি একটা কাপুরুষ। -ইসমত
৫. একটি খামবন্ধ চিঠি। অনুমান, ঘটনার ঠিক আগের দিন চিঠিটি এসে থাকতে পারে। আদৌ পড়বেন না, কিংবা সময় করে পড়বেন এমন একটি চিন্তা থেকে খামটি ছিঁড়েননি।
জনাব আবদুল কাইয়ুম,
এটাই আমার শেষ চিঠি।
দখিনদুয়ারি গার্লস হাইস্কুলে যোগ দিয়েই গাম্ভীর্যের ছদ্মবেশে আপনি প্রেমের এ কোন ফাঁদ পেতেছিলেন যে ছাত্রীরা ধরা দেবার আগে আমিই ধরা দিলাম। আমার নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে। আমার দুর্বলতা প্রকাশিত হয়ে পড়ল। আপনি হয়তো চাননি, তবুও আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। আমি মোবারকের বিকল্প খুঁজছিলাম। একটু দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছি আপনি সে বিকল্প নন। সাহসী মানুষের বিকল্প কখনো কাপুরুষ হতে পারে না। মোবারক আর যাই হোক কাপুরুষ নয়। বৌ পেটাতে সাহস লাগে।
সেই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় আমি গান গাইলাম না, হেডস্যারকে বললাম আপনার এতো ভালো গানের পর আমার গান তেমন মর্যাদা পাবে না। কই, আপনি তো কোনোদিন বলেননি, কেমন গাও, দু’লাইন শোনাও তো।
যেমনই গাই, মোবারক আমাকে কাছে ডেকে বলে, একটা গান শোনাও তো, একটা বিরহের গান।
আপনি আভাসে ইঙ্গিতে আমার কাছে আপনার পৌরুষ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তাই না? আমি নিজেই যখন এগিয়ে আসতে চাইলাম অমনি আপনার পৌরুষ চুপসে গেল!
আপনার গার্লস হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট হওয়াটা আমি পছন্দ করিনি, এখনো করি না। একবার একটা কিছু নিয়ে ফেঁসে গেলে তা বিশ্বসংবাদ হয়ে যাবে- এখানে আর ফেরা হবে না, আপনার আগের চারজনের একজনও ফিরতে পারেননি। আপনিও পারবেন না।
আমি দখিনদুয়ারির মানুষ, আমাকে তো এখানে থাকতেই হবে। আপনি এসেছেন দেড়শ কি দুশ কিলোমিটার দূর থেকে। চাকরিটা যদি আপনার খুব দরকারি না হয়ে থাকে, তা হলে অনুরোধ করব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যান। আপনার এখানে থাকা আমার জন্য অস্বস্তিকর হবে, হয়তো আপনার জন্যও তাই হবে। যদি এখনো আপনার স্ত্রী থেকে থাকেন তার কাছে ফিরে যান, আমি তো মোবারকের সাথে আছিই। কিন্তু কোনোভাবে আমার দুর্বলতাটুকু মোবারক যদি বুঝে যায়, নির্মম প্রতিশোধ নিতে আপনার দিকেই ছুটবে। মোবারক সহিংস প্রকৃতির মানুষ।
একটাই তো জীবন, দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
আপনি সত্যিই ভালো গান করেন। অংক চিটার হিসেবে আপনি অনেক সুনাম কামাই করেছেন। হোস্টেল সুপার হিসেবেও। এক জীবনে আর কি চাই? আপনার সাথে আর দেখা না হোক এই কামনায় ইসমত আরা, শিক্ষক, জীববিজ্ঞান।

স্যার সেদিন আমাদের ক্লাসেই ছিলেন। জ্যামিতির বৃত্ত পড়াচ্ছিলেন। এ সময় হেডস্যারের পিয়ন এসে তাকে খবর দেয় জরুরি দরকারে স্যার তাকে ডাকছেন। হাতের চক নিয়েই তিনি বের হন। কিন্তু দশবারো গজ না যেতেই কোত্থেকে ছুটে আসা দু’জন খাটো মাপের মানুষ তার দুটি হাত ধরে পেছনে টেনে এনে দ্রুত হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল।

স্যার, ইসমত আরা ম্যাডামের চিঠিতে একটা ক্লু ছিল। সেই সাথে লেডিস হোস্টেলের দারোয়ান কাম নাইট গার্ড শামসুদ্দিন মোল্লা ওরফে শামসুকে তুলে নিয়ে বেদম পিটুনি দেয়ায় তাকে দিয়ে যে স্টেটমেন্ট দিইয়েছে তাতে মোবারক হোসেনের নামই এসে যায়। একবার মোবারক লেডিস হোস্টেলের গেট পর্যন্ত এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, ইসমত আরা কি এখানে আসে? ক’দিন আগে একবার এসে জিজ্ঞেস করেছে আবদুল কাইয়ুম প্রতিদিন গানের রেওয়াজ করেন?
শামসু দুটো প্রশ্নের জবাবেই না বলেছে, কখনো আবদুল কাইয়ুমের রুম থেকে গানের আওয়াজ ভেসে আসেনি, আর ইসমত আরাকে গত তিন বছরে লেডিস হোস্টেলে আসতে দেখিনি।
গত সাধারণ নির্বাচনে যে ক’টা ভোটই কাস্ট হোক না কেন মোবারক হোসেন নির্বাচিত এমপি গোলাম হাক্কানের বিরোধী দলের প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে, অন্যদিকে গোলাম হাক্কানের পুত্র গোলাম রাব্বানের শিশ্নের অংশবিশেষ কাটার দায়ে অভিযুক্ত তহুরা বেগম মোবারক হোসেনের আপন ফুপোতো বোন। ফলে তাকে রিমান্ডে নিয়ে পেটানোটা সহজ হয়ে যায়।
ভীষণ মার দিয়ে আদায় করা ১৬৪ ধারার স্টেটমেন্টে উল্লেখ করে যে মোবারক জানতে পেরেছে যে নিহত ব্যক্তি তার নারী সহকর্মী হবার সুযোগে বিবৃতিদাতার স্ত্রী ইসমত আরার সাথে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলতেন এবং কু-প্রস্তাব দিতেন। স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য তিনি মাস্টার সাহেবকে একটা ছোট শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। মেরে ফেলতে চাননি। মাস্টার সাহেব যে মরে গেছেন এটাও বুঝতে পারেননি।
পুলিশের বিশাল সাফল্য তিন সপ্তাহের মধ্যে আবদুল কাইয়ুম হত্যারহস্য উদ্ধার। একবার রিমান্ডে নিতে পারলে রাম ধোলাই দিয়ে আর গরম ডিম থ্যারাপির ভয় দেখিয়ে যে কোনো ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় করে নেয়া যায়। মোবারক হোসেনের জামিন হয়নি, আপাতত হবার সম্ভাবনাও নেই।
বিব্রতকর প্রশ্ন এড়াতে হেডস্যার ইসমত আরাকে বেতনসহ এক মাসের এবং তিন মাসের অবৈতনিক ছুটি মঞ্জুর করেছেন। জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ইসমত আরার সমতল পেট স্ফিত হয়ে উঠছে। প্রায় সবাই বলছে, বাচ্চাটা মোবারকেরই, দুর্নাম রটনাকারীদের মতে বাচ্চাটা অবশ্যই আবদুল কাইয়ুমের। শালা তলে তলে মহাশয়তান। অন্যরা বলছে হাত দিয়ে ছুঁয়ে তো আর কাউকে প্রেগন্যান্ট বানানো যায় না। এর চেয়ে বেশি সুযোগ আবদুল কাইয়ুম পাননি।
আবদুল কাইয়ুম স্যারের লাশ নিতে কেউ আসেনি। মামলা চালাতেও কারো উৎসাহ ছিল না। স্কুলের গভর্নিং বডিই স্থানীয় গোরস্তানে তাকে সমাহিত করে এবং মোবারক হোসেনের জামিনের কোনো বিরোধিতা না করায় তারও বেরিয়ে আসতে অসুবিধে হয়নি। চার মাসের ছুটির শেষ দিন স্কুলে যোগ না দিয়ে ইসমত আরা ম্যাডাম ব্যক্তিগত কারণে শিক্ষকতার চাকরি থেকে পদত্যাগের চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আবার গণিত ও জীববিজ্ঞানের শিক্ষক নেবার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো। মোট আটজন আবেদন করেন, সাতজনই জীববিজ্ঞানের, একজন কেবল গণিতের। ইন্টারভিউতে ডাকার আগেই সিদ্ধান্ত হয় ভালো হোক মন্দ হোক সেই একজনকেই নিতে হবে। নতুবা এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়েদের সমস্যা হবে। এমনকি একজন দুষ্ট সাংবাদিক স্কুল কমিটিকে ঝামেলায় ফেলতে জেলা বার্তায় খবরটা ছাপিয়েও দিতে পারে।
অংকের জন্য যিনি এলেন তার নাম আহসানউল হক। তিনি বেশ গরমের মধ্যে স্যুট পরে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলেন। স্কুলে পড়াতে শুরু করে বেশ সুনামও কামাই করেন, ক্লাসে যে বুঝত না তাকে ক্লাসের বাইরেও বুঝিয়ে দিতেন। সরটা একটু মেয়েলি ধরনের। আমার বাবা তাকে আমাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার হবার প্রস্তাব দিলে তিনি পড়াতে রাজি হলেন কিন্তু থাকতে রাজি হলেন না। তিনি স্কুল থেকে বেশ দূরে একটা বড় বাসাই ভাড়া নিলেন। আবার এটাও বললেন তার স্ত্রীর এখানে আসার সম্ভাবনা নেই, কারণ বাচ্চাটা চট্টগ্রামের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস থ্রি-তে পড়ছে। স্যার যেহেতু পরের মাস থেকে আমাকে পড়াতে সম্মতি দিয়েছেন এজন্য তাকে ধন্যবাদ দিয়ে একটা চিঠি লেখার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু সে সময় অর্থনীতি স্যারকে লেখা আমাদের বিলকিস আকতারের একটি প্রেমপত্র ধরা পড়ে যাওয়ায় আমি সাহস পাইনি। অবশ্য বিলকিস আমাকে বলেছে, স্যারই তাকে বিট্রে করেছে এবং চিঠিটা হেডস্যারের হাতে দিয়েছে, আর বিলকিসকে বলেছে কেমন করে চিঠি পাঠালে যে তা আমার কাছে না এসে হেডস্যারের কাছে চলে গেল। নাকি হেডস্যারকেই লিখেছিলে?
স্যার সেদিন আমাদের ক্লাসেই ছিলেন। জ্যামিতির বৃত্ত পড়াচ্ছিলে। এ সময় হেডস্যারের পিয়ন এসে তাকে খবর দেয় জরুরি দরকারে স্যার তাকে ডাকছেন। হাতের চক নিয়েই তিনি বের হন। কিন্তু দশবারো গজ না যেতেই কোত্থেকে ছুটে আসা দু’জন খাটো মাপের মানুষ তার দুটি হাত ধরে পেছনে টেনে এনে দ্রুত হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল। এই দৃশ্যটি আমাদের কারো কারো চোখে পড়েছে, কিন্তু স্যার যে গ্রেপ্তার হচ্ছেন তা আমরা বুঝিনি। আমরা ক’জন পেছন পেছন হেঁটে কিছুদূর এগোবার পর অপেক্ষাকৃত লম্বা একজন আমাদের ধমক দিয়ে বললেন, স্টপ দেয়ার। তারপর ইংরেজিতে যা বললেন আমরা বুঝতে পারলাম তার মানে, আর এগোবে না, এগোলে তোমাদের অ্যারেস্ট করা হবে।
তাকে আর হেডস্যারের রুমে নেওয়া হয়নি। ধুলো উড়িয়ে একটি গাড়ি তাকে নিয়ে চলে গেল। কি হয়েছে জানার জন্য সিনিয়র ক্লাসের ছাত্রী হিসেবে আমরা যখন হেডস্যারের রুমের সামনে তিনি বললেন, তোমাদের জানার দরকার নেই। এটা বড়দের ব্যাপার।
এতোদিন বড়দের ব্যাপার বলতে আমরা যা শুনে এসেছি তার প্রায় সবই লজ্জাজনক। এসব কাজ দরজা বন্ধ করেই করা হয়। তাহলে কি স্যার অন্য কোনো নারীর সাথে এমন কিছু করে এসেছেন যা ঠিক হয়নি! তবে আমাদের হুদাল্লিল মুত্তাকিন স্যার বললেন, ব্যাপারটা খুব ড্যাঞ্জারাস। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে আহসানউল হক সিরিয়ায় আইএস-এ যোগ দেবার জন্য জেহাদিদের রিক্রুট করছেন।
স্যার কি বলেছেন পুরোটা আমরা আসলে বুঝিনি। তবুও বলেছি, আচ্ছা তাই না কি।
আরো শুনলাম স্যারকে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল-এ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে নাকি স্যার ফরফর করে সব বলে দেবেন। মুত্তাকিন স্যার আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, সাবধান আহসানউল হকের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করতে যেয়ো না, তা হলে ফেঁসে যাবে।
গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবার পথে তার বাড়িতে যা কিছু আছে সব জব্দ করা হয় শুনে আমার ক্লাসমেট নয়নতারা ফিসফিস করে বলে, আমার কি হবে? আমাকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য স্যারকে একটা পার্সোনাল চিঠি লিখেছিলাম!
আমি বললাম, যদি ওরা তোর চিঠি পায় তোকেও জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল-এ নিয়ে যাবে। আমিও তো লিখতে লিখতে শেষ পর্যন্ত আর লিখিনি। নয়নতারা বলল, তোর অনেক বুদ্ধি। তারপরই চোখ উল্টে অজ্ঞান হয়ে ফ্লোরে শুয়ে পড়ল। জ্ঞান ফিরল বটে, কিন্তু হেঁটে আর তার বাড়ি যাওয়া হলো না, রিকশা ভ্যানে উঠিয়ে নিতে হলো।
এতোগুলো ঘটনার পর স্যার আপনার আগমন। আমরা আপনাকে শুভেচ্ছা ও স্বাগতম জানাই।

এসআর