সেদিন থেকে

আগের সংবাদ

ছাড়া পেলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

পরের সংবাদ

গল্প

আপনবাস

শুক্লা পঞ্চমী

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১, ২০২০ , ৮:৪৫ অপরাহ্ণ

‘আমার এ ঘর বহু যতন করে ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে’- এই গানটি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৪ সালে শান্তিনিকেতনে বসে লিখেছিলেন। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ শোকগ্রস্ত অবস্থায় অর্থাৎ পুত্র শমীন্দ্রনাথের অকাল মৃত্যুর পর ভীষণরকমভাবে ভেঙে গিয়ে গানটি লিখেছিলেন। গানটি যে বিষাদের এবং অপেক্ষার, তা প্রতিটি চরণে চরণে অনুভব করা যায়। রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় ছিল বসন্তের কোনো এক উৎসবে পুত্র শমীন্দ্রনাথ ফিরে আসবেন। ‘মায়া’ সন্তানের প্রতি পিতার সহজাত হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। তিনি কবিই হোন বা বিজ্ঞানী। অপাত্যস্নেহের কাছে সবই যে তুচ্ছ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও পিতৃস্নেহের ঊর্ধ্বে নন।

আজ হঠাৎ করে গানটির কথা মনে পড়ল। বিশেষ করে এই চরণ দুটি ‘আমার এ ঘর বহু যতন করে ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে’। আহা কী মমতা জড়িয়ে আছে চরণ দুটিতে! ঘরের প্রতি দরদমাখা বাণী, আর হয় না। কত সহজ অথচ কতটা আবেগ। ঝাড়পোছা শুধু সৌন্দর্যবৃদ্ধি নয় এর সাথে রয়েছে নিজের অস্তিত্ব। যা ভালোবাসার, পরম মমতার। ‘সংসার’- কথায় আছে সংয়ের সার। সত্যিই তাই, দুদিনের জন্য এসে মায়া বাড়িয়ে তারপর চলে যাওয়া। আসলে আমরা কেউই যেতে চাই না। উদাহরণ টানলে আবারো রবীন্দ্রনাথকেই আনব। ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’।

চাইলেই কী সব হয়? হয় না। তা জেনেও আমরা চাই। বর্তমানে পৃথিবী প্রাকৃতিক দুর্যোগাক্রান্ত। ‘করোনা’ নামধারী এক ভাইরাস পুরো পৃথিবীটাকে জব্দ করে ফেলেছে। নিয়ে নিয়েছে নিজের হাতের মুঠোয়। আমরা মানুষ চোখ দিয়ে শুধু দেখছি কিছুই করতে পারছি না। জানি না এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ কিনা। অসহায়ের মতো হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি। মাঝে মাঝে ভাবি এই যে বেপরোয়া গতি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, আমরা ছুটছিলাম সোনার হরিণের লোভে। হচ্ছিলাম স্বেচ্ছাচারী, কিছুটা স্বার্থপরও। এটাও বোধহয় মানুষের প্রতি প্রকৃতির চপেটাঘাত। কোনো কিছুই এখন আর নিয়ন্ত্রণে নেই। চাইলেই মানুষের চলার গতি থামিয়ে দেয়া যাবে না। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব আর অর্থনীতির চাপ রোধ করা সহজে সম্ভব হবে না। পরিবর্তনশীলতা যুগের হাওয়া, না মানলে আমরাও পিছিয়ে যাব। ফিরে আসি আমার লেখার বিষয়বস্তুতে। ‘আমার এ ঘর বহু যতন করে ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে’- এই কথাগুলোতে রয়েছে সংসারের অন্তর্নিহিত দ্যোতনা।

আজকাল ঘরে বসে থাকে না কেউ। ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা মানুষকে প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে যায় বাইরে। চোখে পড়ার মতো নারীদের অংশগ্রহণ। তারা এখন আর স্বামীর অথবা অন্য কারোর হাতের দিকে চেয়ে থাকে না। নিজের আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচাতে যে আলাদা একটা স্বাতন্ত্র্য আছে নারীরা সেটা বেশ ভালো করেই অনুধাবন করেছেন। নারীদের এই অগ্রগতি বা আত্মসম্মানবোধটা অনেক আগে থেকেই ছিল। শুধু সুযোগের কারণে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়ে উঠেনি। তবে নারীদের বহির্মুখীর চাইতে অন্তর্মুখী ভাবটাই বেশি। তারা বাইরে কাজ করলেও ঘরের প্রতি রয়েছে অকৃত্রিম টান। সেটা টের পাওয়া যায় কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে। অথবা সপ্তাহের শেষান্তে। যেন মুখিয়ে থাকে কখন আসবে সেই প্রত্যাশিত সময়।

আমার চাকরি জীবন দীর্ঘসময়। একটা রুটিনের মধ্য থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যেমন খুব ভোরে ওঠা, তাড়াতাড়ি শুতে যাওয়া অন্যান্য টুকিটাকি কাজ গুছিয়ে রাখা নিয়মমাফিক চলারই অংশ। দীর্ঘ চাকরি জীবনে বর্তমান পরিস্থিতির মতো লম্বা ছুটি আর পাইনি। আমার অবাক লাগে খুব বিশেষ প্রয়োজনে যখন বাইরে যাই। দশটা এগারোটার দিকে মানুষ কী করে? কেমন ধরনের লোকজন চলাচল করে, কোন ধরনের হকার ডাকে। অদ্ভুত লাগে। কাজে থাকলে এইসব ছোটখাটো আনন্দগুলো উপভোগ করা যায় না। হ্যাঁ, এরকম ছুটিছাটা যে পাই না তা নয়। কিন্তু তখন এভাবে ভাবিনি। একটু অলসতা কিছুটা অন্যমনস্কতা, চোখ থেকে এড়িয়ে গেছে অনেক কিছুই।

ঘর, চাকরিজীবী মানুষদের কেমন টানে? পুরুষ বা নারী এই ক্ষেত্রে আমি আলাদা করে দেখছি না। কারণ এখন পুরুষদের প্রায় সমপরিমাণই নারীরা কাজ করে। চাকরি বাদই দিলাম। বর্তমানে চোখে পড়ার মতো নারীদের অংশগ্রহণ দেখা যায় অনলাইন বিজনেসে। খুব সহজেই ফেসবুক পেইজ খুলে কোনো একটা প্রডাক্ট নিয়ে চলে আসছেন লাইভে। তাছাড়া রয়েছে খাবার-দাবার, পোশাকাদি। বলতে গেলে এখন আর থেমে নেই কেউ। সেখানেও রয়েছে অন্যরকম কর্মব্যস্ততা। নিজেকে গুছিয়ে ঘর গুছিয়ে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করে তারপর আসা। পুরুষদের ক্ষেত্রেও বলি অনেকেই এখন সংসারের কাজে হাত লাগান। বিশেষ একটা পরিবর্তন দেখা যায় রান্নার ক্ষেত্রে। মোটামুটি বলতে গেলে গড়ে ষাট-সত্তর ভাগ পুরুষ রান্না কাজটি বেশ উপভোগ করেন। আমি বলছি না উনারা প্রতিদিন করেন। আগে যেমন ভাবা হতো রান্নাবান্না শুধু মেয়েদের কাজ, এখন আর এমনটি নয়। এটারো লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে রেস্টুরেন্টগুলোর জন্য। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ‘মাস্টার শেফ’-এর প্রচারণা বড় ভূমিকা রেখেছে।

ছিমছাম পরিপাটি থাকতে শুধু মেয়েরা কেন পুরুষরাও ভালোবাসেন। যাপিতজীবনে পরিবর্তন এসেছে নানাভাবে। ছিমছাম গুছানো, কিছুটা বিলাসিতা। বলতে গেলে এটাও এক ধরনের প্রতিযোগিতা। সময় সামনের দিকে টানে এটাই নিয়ম। যেহেতু নারী-পুরুষ উভয়েই বাহিরমুখে, সেখানে সবারই সব ধরনের অভিজ্ঞতা থাকা উচিত।

করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে আমরাও যখন অন্যান্য দেশের মতো লকডাউন পরিস্থিতিতে পড়লাম, সেই থেকে আমাদেরও চলার গতিতে ছেদ পড়ল। পায়ে পড়ল অলিখিত বেড়ি। বন্দি না হয়েও বন্দি জীবনযাপন করছি। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে কিছুটা অনিয়ম এসে যুক্ত হলো। আগের মতো ভোরে ওঠা নিয়ম করে ঘুমুতে যাওয়া, কোনোটিই আর নিয়ন্ত্রণে নেই। যেহেতু ভাইরাসটা ছোঁয়াচে সেহেতু সবার সাথে সবার বিচ্ছিন্নতা জরুরি। ভাবনা-চিন্তা না করে নিজেকে বাঁচাতে পরিবারকে বাঁচাতে প্রথমেই বিদেয় করলাম কাজের বুয়াকে। আমার পাঁচজনের সংসার হলেও, বড় মেয়ে থাকে বিদেশে। বর্তমানে চারজনের মধ্যে প্রধান ভ‚মিকা আমারই। সকলের দেখভাল ও অন্যান্য সাংসারিক দায়িত্ব অজান্তেই নিজের মধ্যে চলে এসেছে। যে কাজগুলো আগে যেমন মনে হতো অসম্ভব, ধরা যাক কাপড়কাচা, বাসনমাজা, মসলাবাটা, ঘরদোর মুছা পরিষ্কার করা সব। এখন আর তেমনটা মনে হয় না। প্রথমদিকে একটু অসুবিধা হলেও আস্তে আস্তে বেশ খাপখাইয়ে নিয়েছি। আগে যা যা এড়িয়ে যেতাম, সেসবের প্রতি দৃষ্টি আরো বেড়ে গেছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সযতনে সতেজ করে তুললাম সব। আমার রান্নাঘর, আমার ড্রয়িংরুম, শোবার ঘর, বারান্দা সব কিছুতে এসেছে একটা পরিচ্ছন্ন ভাব। ধুলোর পরত পরা অ্যালোভেরা গাছগুলো চকচক করছে। ভিতরের জেলের সতেজভাব বাইরে প্রকাশ পাচ্ছে টসটস রসে।

ছোটবেলা থেকে আমি খুব আলসে। বড় পিসির কাছে বড় হয়েছি। মাঝেমাঝে বলত ‘শ্বশুরঘর করে খেতে হবে না। দুইদিন পর বিদায় করে দিবে’- মনে মনে হাসতাম। লেখাপড়া শিখছি কেন তবে। পড়াশুনাও করব আবার বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেও খাটব, লাভ হলো কী? ছোটবেলা লেখাপড়া করতে চাইতাম না। গলা ফাটিয়ে পড়া মুখস্থ করা ভালো লাগত না। একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম। পড়াশুনা করব না। সারাজীবন ধরে পরিশ্রম করতে পারব না। এখন পড়াশুনা করো পরে গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে কাজ করো। জীবনে আরাম-আয়েশ তাহলে কোথায়? পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় সহপাঠী কবিতার বিয়ে থেকে এসে, মনের এই বালুচরি অবস্থা হলো। সরব পড়া থেমে গিয়ে নীরব পঠনে নিজেকে যুক্ত করলাম। মায়ের চোখ ফাঁকি দেয়া বোধহয় সম্ভব নয়। মায়ের চেয়ে পিসি আরো দুই ধাপ এগিয়ে। একদিন রেগে গিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন ‘তুমি ভাবছো লেখাপড়া বন্ধ করে দিলে বিয়ে দিয়ে দিব, খুব ভুল। গ্র্যাজুয়েশনের আগে ওই কল্পনা মাথায় এনো না! আর একেবারেই যদি মন না বসে তাহলে রান্নাবান্না শিখো। বুঝলাম, সুবিধা করতে পারব না। এর চেয়ে লেখাপড়াই ভালো। আমার পিসি ছিলেন সর্ববিদ্যায় বিশারদ। তার গুণের অন্ত নেই। স্কুলের চাকরি, সংসার তার মধ্যে সেলাইয়ের কাজ। বই পড়ার নেশাও ছিল অসম্ভব।

একদিন আমাকে ডেকে বললেন। শোন, কর্ম আর ক্যারিয়ার এক জিনিস নয়। সবাই কাজ করে খায় কিন্তু সবাই মেরুদণ্ড সোজা রেখে চলতে পারে না। মেরুদণ্ড সোজা করে চলতে গেলে লেখাপড়া লাগবে। কথাটা কানে বাজল। কৈশোরকালীন বৈশ্বিক মনকে বশে আনতে চেষ্টা করলাম।

শিশুকাল কেটেছে গ্রামে। হাওড় অঞ্চলে বাড়ি। বর্ষাকালে জলে টইটম্বুর আর হেমন্তকালে নদীর তলায় জল। আমার মা ছিলেন খুব শৌখিন আর পরিপাটি। মায়ের জন্ম শহরে হলেও বিয়ে হয়ে আসলেন গ্রামে। আমার দেখা একটা স্মৃতি এখনো মনে জ্বলজ্বল করছে। একদিন পর পর মাটি দিয়ে ঘর লেপা হতো। মাটির একটা হাঁড়িতে মাটি গোবর একসাথে মিশিয়ে ভিজিয়ে রাখতেন। একটা ছেঁড়া জালের টুকরো চুবিয়ে ঘর লেপতেন। ঘর লেপার পর মা ছেঁড়া জালটা খুব ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকাতেন। বাবা মাকে টিপ্পনি কেটে বলতেন, মায়ের নাকি শুচিবাই। মা বলতেন, না! রবীন্দ্রনাথের গানটা শুনো নাই

‘আমার এ ঘর বহু যতন করে ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে’- ঘর হচ্ছে লক্ষ্মীর স্থান। যতন না করলে কি আসবেন? লক্ষ্মী বড় চঞ্চলা দেবী। তাকে আটকানো এতো সহজ নয়। লক্ষ্মী বটেই। লক্ষ্মী এখন আর দেবী নন পরিচ্ছন্নতার প্রতীক। এই সংকটকালীন এসে এটা বুঝেছি। এবং টেরও পাচ্ছি, ঘরকে এড়িয়ে বাহিরকে টানা যায় না। যতই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটি না কেন, ভালোবাসার নীড়কে তুচ্ছ করে বৃহৎ হওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথের গানের আর একটি চরণ ধরেই বলি, ‘জ্যোৎস্না রাতে সবাই বনে! যাক। আমি আঁকড়ে ধরে থাকি আমার এই ছোট্ট নীড়।’

এসআর