শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে কখন

আগের সংবাদ

মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান জরুরি

পরের সংবাদ

মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কা

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কোন পথে আমরা?

শাখাওয়াত হোসেন শাহ্

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ , ১০:২৯ অপরাহ্ণ

মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কা বা সেকেন্ড ওয়েভ অব প্যানডেমিক বলতে মূলত মহামারির পুরনো রূপে ফিরে আসাকে বোঝায়। ‘এটি মহামারি সংক্রান্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ধারণা নয় বরং অনেকটা আবেগনির্ভর শব্দচয়ন’- এমনটাই বলেন যুক্তরাজ্যে ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মাইক টিলডেসলি। সমুদ্রের ঢেউ যেমন কখনো বেড়ে ওঠে আবার একসময় নেমে আসে, সেকেন্ড ওয়েভ ব্যাপারটিও তা-ই। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে করোনার সংক্রমণের হার প্রথমদিকে বেড়ে যাওয়ার পর তা এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই হার আবারো বেড়ে যায়।

মূলত এটিই হচ্ছে দেশগুলোতে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা বা সেকেন্ড ওয়েভ। লক্ষ করলে দেখা যাবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা চীন এবং নিউজিল্যান্ড কিছুদিন করোনামুক্ত থাকার পরও দেশগুলোতে পুনরায় মৃদু করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়। এক্ষেত্রে একে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা বলা যাবে না। কারণ দেশ দুটিতে করোনার পুনরায় সংক্রমণ ঘটেছে সত্যি, কিন্তু তা উল্লেখযোগ্য হারে ছিল না যা মূলত ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের পরিস্থিতির বিপরীত। তাই শুধুমাত্র ফের সংক্রমণ মানেই কিন্তু সেকেন্ড ওয়েভ নয়। পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি আর কঠোর লকডাউন নিশ্চিতের মাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলো ধীরে ধীরে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল যা পরবর্তী সময়ে আবারো বেড়ে যায়। অর্থাৎ সামান্য সময়ের জন্য করোনা ভাইরাসকে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াই ছিল তাদের ভুল যার মাশুল গুনতে হচ্ছে এখনো।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কা নিয়ে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মাঝে করোনাভীতি কমছে। দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের পর সবার মাঝে যে সতর্কতা দেখা যাচ্ছিল তা এখন অনেকটাই কম। কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি লক্ষ করা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ লকডাউনের শিথিলতা। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে চলেছে। লঞ্চ ও বাস টার্মিনালগুলোতেও একই চিত্র যা দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হুমকিস্বরূপ। মনে রাখা ভালো, ইউরোপসহ সব দেশ যারা বর্তমানে অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন তাদের এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ সংক্রমণ বৃদ্ধি। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকেই দৃষ্টি দেয়া যাক। করোনার ভয়াল থাবায় দেশটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। দেশটির জিডিপি রেকর্ড পরিমাণ সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। অনেক নাগরিক হয়ে পড়েছে কর্মহীন। তাদের করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি আবারো আগের অবস্থান ফিরে পাবে কিনা তা নিয়ে আছে সংশয়। তাই আমাদেরও এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। নতুবা করোনার দ্বিতীয় করাল গ্রাসে হুমকির মুখে পড়বে দেশের অর্থনীতি। সরকারের পক্ষে সব বৃহৎ কর্মযজ্ঞ করা সম্ভব হলেও তা তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন এতে সাধারণ জনগণের সহায়ক ভ‚মিকা থাকবে। নতুবা ঘাটতি থেকেই যাবে। তবে দ্বিতীয় ধাক্কা যে অবশ্যম্ভাবী এমনটা নয়। সেটি নির্ভর করছে সংক্রমণ কোনদিকে এগুচ্ছে। অর্থাৎ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ।

গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, কম তাপমাত্রায় করোনা ভাইরাস দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। তাই শীতকালে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ ঘটার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। কারণ এই মুহূর্তে দেশের তাপমাত্রার সাপেক্ষে অনেকটা সাধারণ গতিতে ঘটে চলেছে সংক্রমণ।

কিন্তু যেহেতু কম তাপমাত্রায় করোনার স্থায়িত্ব দীর্ঘ, তাই আসন্ন শীত মৌসুমে এই ভাইরাস ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। স্পষ্টতই, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে আমাদের। তাই পুনরায় সংক্রমণ রোধে প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি। কারণ সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে থাকা মানেই সেকেন্ড ওয়েভের প্রাথমিক ধাপ আরম্ভ হওয়া। তাই সর্বপ্রথম যেটা প্রয়োজন তা হলো দেশে করোনার এন্টিজেন পরীক্ষা আরো বৃদ্ধি করা যাতে সংক্রমণের হার কোনদিকে যাচ্ছে সেটি অনুমান করা ও তৎপরবর্তী সিদ্ধান্ত দ্রæততম সময়ের মধ্যে নেয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের মাঝে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি ও পরিস্থিতি মোতাবেক লকডাউন নিশ্চিত করা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শীত মৌসুমে সংক্রমণ হার বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে খুব যে কাঠখড় পোড়াতে হবে না সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই এটি নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও তার অঙ্গসংগঠন কঠোর ও দৃশ্যমান ভ‚মিকা রাখতে পারে। জনসমাগম ঘটে এমন স্থানসমূহের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আইন অমান্যে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তির বিধান কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারে। ইউরোপের দেশগুলো কিন্তু তাদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এনেছিল কঠোর স্বাস্থ্যবিধি ও লকডাউন নিশ্চিতের মাধ্যমেই যা আমাদের জন্য এক দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ।

যেহেতু স্বাভাবিকভাবেই শীত মৌসুমে দেশের হাসপাতালগুলোতে ঠাণ্ডা ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ থাকে অন্য সব মৌসুমের চেয়ে বেশি, সেহেতু পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। প্রথমত, ঠাণ্ডাজনিত বা করোনা ভাইরাসজনিত সব ওষুধ যেন মজুত থাকে সে ব্যাপারে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিশেষায়িত কোভিড হাসপাতালগুলো পুনরায় চালু করা উচিত। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনে বিশেষ টেলিমেডিসিন সেবা অব্যাহত রাখা ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখবে যা দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য বাড়তি চাপ সামাল দিতে ইতিবাচক ফল দেবে। এর ফলে রোগীদেরও ভোগান্তির আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যাবে। সে সঙ্গে প্রয়োজন সব ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে কৌশলগত ক‚টনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা যেন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হওয়া মাত্রই তার সুফল দেশের মানুষ ভোগ করতে পারে। এর পাশাপাশি দেশের সব বন্দরে করোনা পরীক্ষায় কঠোরতা নিশ্চিত করা জরুরি। কেননা তা না হলে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও তা পুনরায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। এছাড়াও করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত শীতকালীন সতর্কতা ঢালাওভাবে প্রচার অব্যাহত রাখার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে দেশের সব ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসমূহ যা নিঃসন্দেহে ভাইরাসটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রণী ভ‚মিকা রাখবে। কারণ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ মানেই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ।

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস।

[email protected]

এসআর