মেসি যা করেন বার্সার ভালোর জন্য করেন

আগের সংবাদ

জয়ের খরা কাটাল নিউজিল্যান্ড

পরের সংবাদ

ভুলে যাই বিষণ্ণতা

নীতুল জান্নাত নীতি

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ , ৯:১২ অপরাহ্ণ

কেস স্টাডি ১
কিছুদিন আগে মেয়ের ঘর পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে তার মা ঘরে ঢুকতেই লক্ষ করলেন টেবিলের ওপর একটি নোটপ্যাডে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, Im such a disappointment to everyone. নোটটি পড়ার পর স্বভাবতই ঘাবড়ে গেলেন মহিলা। তবে কি ভালো নেই তার মেয়ে? অথচ চোখের সামনেই মেয়ে ঘুরছে দিব্যি হাসিমুখে। অন্তরালে কি ঘটছে মেয়েটির মনে, সেই চিন্তায় তিনি বুঁদ হয়ে রইলেন সারা বিকাল।

কেস স্টাডি ২
আদিত্য প্রচণ্ডরকম প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর একটি ছেলে। দেখা হলে হাসিমুখে ছাড়া কথাই বলে না। সমাজসেবাতেও অবদান আছে তার। অথচ ছেলেটির মা প্রায়ই লক্ষ করেন তার ছেলের হাতে গভীরভাবে কাটা দাগ। মধ্যরাতে ছেলের রুমের জানালা দিয়ে উড়ে যায় সিগারেটের ধোঁয়া। তবে কি সবই তার লোক দেখানো? ছেলেটা কি ভালো নেই?

কেস স্টাডি দুটি পড়ার পর নিশ্চয়ই অনেকে নিজের সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে বেড়াচ্ছেন, হয়তো খুঁজে পাচ্ছেন নিজেকে এদের দলে। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন লোক ডিপ্রেশন নামক এই ব্যাধিতে ভুগছে। এর মধ্যে হয়তো আপনি, আমিও আছি। অবচেতনভাবে আমরা প্রায় সবাই বিষণœতায় ভোগী। কিন্তু সেই বিষণœতার মাত্রা ছাড়ানোটাই হচ্ছে চিন্তার বিষয় এবং সময়মতো এর চিকিৎসাও কিন্তু প্রয়োজন। বাংলাদেশেও দিন দিন বিষণœতার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু বিষণœতাও যে একটা রোগ, সেটাই অনেকে বোঝে না, বা বুঝলেও তা স্বীকার করতে চায় না। এটি ধীরে ধীরে একটি মানুষকে তিলে তিলে শেষ করতে যথেষ্ট।

আপনি কি জানেন, ডিপ্রেশনেরও প্রকারভেদ আছে। উপরের দুটো কেস স্টাডিতে দেখা যায় যে, দুজন মানুষই স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা, আচার-ব্যবহার করছে। অথচ তবুও তারা আলাদা। মানসিক যন্ত্রণাকে অসুখ ভাবতে না চাওয়াটাই একসময় তাদের পৌঁছে দেয় ডিপ্রেশনের লাস্ট স্টেজে। এভাবেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকে। কেন ডিপ্রেশন নামক ব্যাধিতে ভোগী আমরা? যদিও নির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকে না এই ব্যাধির পেছনে, তবুও কিছু না কিছু নির্দিষ্ট কারণজনিত একজন ব্যক্তির মাঝে বিষণ্ণতার পর্ব শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা আরো ডালপালা ছড়ায়। বিষণ্ণতা যে কি পর্যায়ে যেতে পারে একজনের মানুষের মনে তা যারা এ রোগে ভুগছেন একমাত্র তারাই বুঝতে পারেন। তারা কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পারেন না কোনো কোনো ক্ষেত্রে, কোনো কিছুতে উৎসাহ পান না, ঠিকমতো কারো সঙ্গে কথা বলেন না, সারাদিন কান্নাকাটি করেন। এদের মধ্যে অনেকেই ইন্ট্রোভার্ট হয়ে যান, কারো সঙ্গেই কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। যখনই কেউ একাকিত্বকে উপভোগ করতে শেখে, তখনই বুঝতে হবে তিনি এই পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রথমে কেউ সহজে বুঝতে পারে না অবশ্য। দিন দিন অবস্থা আরো খারাপের দিকে নিয়ে যায়। শুধু বিষণ্ণতা রোগের কারণে তার নিজের তো বটেই, তার সন্তানদের জীবন পর্যন্ত বিপর্যস্ত হতে পারে। রিসার্চে দেখা যায়, যেসব মা গর্ভাবস্থায় এই ব্যাধিতে ভুগেন তাদের সন্তানদের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশে বাধা ঘটে। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এর থেকে কি মুক্তি নেই? অবশ্যই আছে। আমার মতে, এর চিকিৎসক এক অর্থে রোগী নিজেই হতে পারে। এর পর্যায়ক্রমটা শুধু নির্দেশ করে ঠিক কোন পর্যায়ে একজন ডিপ্রেশন রোগীকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। একটু চেষ্টা করলেই বেরিয়ে আসা যায় এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে। আজকে আমরা আলোচনা করব উপায়গুলো নিয়ে।

নিজেকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া
এটা চিরন্তন সত্যি যে একটা মানুষ নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালো বুঝে এবং জানে। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বড়জোর আপনার দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে আপনাকে মেডিসিন প্রেসক্রাইব করতে পারে এবং পরামর্শ দিতে পারে। বিষণ্ণতার প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেকে জানুন ভালো করে। সমস্যাগুলোকে একটি বস্তুর মতো উপলব্ধি করুন, সমাধান খুঁজুন। কারণ একমাত্র আপনিই ভালো জানেন যে আপনি আসলে কি চান।

একা না থাকা
একাকিত্ব কোনো ভয়াবহ অভ্যাস নয়। নিজেকে একটু-আধটু সময় দিতে একা থাকা যেতেই পারে। তবে যখনই দেখবেন আপনি একাকিত্বে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, বুঝবেন আপনি বিষণ্ণতায় কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত। অদ্ভুত চিন্তাধারা, হতাশা তখনই আপনাকে চেপে ধরবে। সুতরাং প্রাথমিক সমাধান একটাই। একা থাকা থেকে বিরত থাকুন। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবকে সময় দিন। দরকার হলে তাদের সঙ্গে খোলাখুলিভাবে কথা বলুন।

নিজের শখগুলোকে প্রাধান্য দেয়া
শখ নামক বস্তুটি নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু লালনের অভাবে অনেক শখই হারিয়ে যায়। নিজের মধ্যে উদ্দীপনা জাগাতে হলেও শখগুলোকে আঁকড়ে ধরুন। চর্চা করুন প্রিয় সংগীত, লেখালেখি, ছবি আঁকা বা রান্নাবান্না। জীবনে অনেকটাই নতুনত্ব ফিরে আসবে। নিজের সৃজনশীলতায় নিজেই অভিভ‚ত হতে শুরু করবেন।

ঘোরাফেরা
বিষণ্ণতা ৫০ শতাংশ কমাতে ঘোরাঘুরির বিকল্প নেই। ঘুরে আসুন প্রিয় জায়গাগুলো থেকে। ট্রাভেলিং আপনার মনকে সতেজ করে তুলবে, ফুরফুরে অনুভূতি দেবে। বিষণ্ণতায় ভোগার সময়টাই পাবেন না।

নিজেকে দৃঢ় রাখা
আবেগ জিনিসটা একরকম সর্বনাশা বলেই ধরা হয়, যদি সেটা হয় আরো সস্তা আবেগ তবে তো কথাই নেই। জি, আবেগকেন্দ্রিক ঘটনাসমূহই মূলত বিষণ্ণতার মূল উৎস। ভুলে যেতে শিখুন, ঘুরে দাঁড়াতে শিখুন। মনে রাখবেন, নিজেকে প্রাধান্য দেয়াটা আগে। যে পথ আপনার নয়, সে পথ ছেড়ে আসতে শিখুন। বিষণœতা ভয়াবহ ব্যাধি নামে পরিচিত হলেও এটি নিরাময়যোগ্য। নিজেকে বুঝুন, জানুন। প্রাধান্য দিন নিজের ভালো লাগাগুলোকে। এরপরও যদি মনে হয় আপনি থমকে যাচ্ছেন বারবার, তাহলে পরামর্শ নিন চিকিৎসকের। মনে রাখবেন, দিনশেষে ভালো থাকাটা সবার আগে জরুরি।

শিক্ষার্থী, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি
ঢাকা।

এসআর