সাত ভাষায় জানা যাবে ববিতাকে

আগের সংবাদ

বরগুনায় বর্বরতা: রিফাত হত্যা মামলার রায় আজ

পরের সংবাদ

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস আজ

নিরাপত্তা শঙ্কা বাড়ছে কন্যাশিশুর মা-বাবার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ , ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ , ১:৪৫ অপরাহ্ণ

কোভিড-১৯ সংক্রমণের সময় জুলাই মাসে দ্বিতীয়বারের মতো কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন গৃহিণী মুনীরা সুলতানা। এ নিয়ে মুনীরার স্বামী বা পরিবারের অনান্য সদস্যের কোনো আক্ষেপ নেই। তবে মুনীরার শাশুড়ির প্রত্যাশা ছিল এইবার তার নাতি হবে। এই কথা বহুবার বলেছেন। মুনীরা বলেন, বাবা-মার কাছে প্রত্যেক সন্তানই প্রিয়। দুই মেয়ে বলে কখনো মন খারাপ হয় না। শাশুড়ি মুখে একটু হা-হুতাশ করেন তবে কখনো কোনো খারাপ আচরণ করেননি।

‘পুত্র সন্তান ছাড়া বংশ রক্ষা হয় না’ সমাজে এই ধারণা প্রচলিত। পুত্র সন্তানের আশায় পরপর তিন কন্যাসন্তানের বাবা-মা রতন সাহা ও দীপা সাহা দম্পতি। তবে বাসাবোর বাসিন্দা রতন ও দীপা জানেন ও বিশ্বাসও করেন ছেলে-মেয়েতে কোনো পার্থক্য নেই। দীপা বলেন, আমার বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। মেজো মেয়ে ক্লাস ফোরে। মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টি সব সময়ই ভাবায়। চারপাশে যা ঘটছে এমন ভাবনা প্রতিটা বাবা-মায়েরই। কন্যাসন্তান হয়েছে বলে অভিমানে স্ত্রীর মুখ দেখেননি, স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন কিংবা কন্যাসন্তান জন্ম মানেই শোক ও হা-হুতাশ করা এমন পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। এখন আর কন্যাসন্তান হলে খুব বেশি একটা নেতিবাচক মনোভাব চোখে না পড়লেও কুমিল্লার তনু, টাঙ্গাইলের বাসে রুপা, নোয়াখালীর নুসরাত এবং সম্প্রতি সাভারের নীলা হত্যার ঘটনার মতো অজস্র ঘটনায় আতঙ্কিত হন কন্যাসন্তানের অভিভাবকরা। কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা তাদের পিছু ছাড়ে না।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু। এদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই কন্যাশিশু। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী ধর্ষণের মতো ঘটনা ক্রমশই বেড়ে চলছে। চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৪৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি মাসের প্রথম ২৫ দিনে ঘটেছে ৫৯টি ঘটনা। সেই হিসেবে দেশে কমপক্ষে চারজন নারী ধর্ষণের শিকার হন। ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন এবং ২০১৮ সালে ৭৩২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনার মাত্র শতকরা তিন ভাগ মামলায় অপরাধীরা শাস্তি পান।

অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু মনে করেন, সমাজে কন্যা ও পুত্র সন্তানের জন্ম নিয়ে যে বৈষম্যমূলক মানসিকতা ছিল তার ৭০ শতাংশই পরিবর্তন হয়েছে। ৩০ শতাংশের মধ্যেও অনেকে কন্যাসন্তান জন্মের বিষয়টি মেনে নিলেও তারা মনে করেন বংশ রক্ষার জন্য পুত্র সন্তান দরকার। তাদের মধ্যে অনেকেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পোষণ করেন।

তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, আমার এই মতের সঙ্গে কারো দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে মেয়েদের জন্য বর্তমান সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ কন্যাসন্তানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। সমাজ ও অর্থনীতির কাঠামোতে নারীর অংশগ্রহণ এখন দৃশ্যমান। এই চিত্র কন্যাসন্তানের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। যেসব নারী শীর্ষ পর্যায়ে স্বমহিমায় অবস্থান করছেন তাদের দেখে অন্য মেয়েরা অনুপ্রাণিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার মেয়েদের উপবৃত্তি দিচ্ছে। শিক্ষা ও চাকরিতে অগ্রধিকার দিচ্ছে। যা মানসিকতা পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তবে এটিও ঠিক ধর্মীয় আইন, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার রক্ষায় অনেকেই মুখে না বললেও পুত্র সন্তানের প্রত্যাশা করেন।

ওয়াহিদা বানু বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলছে। যা কন্যাসন্তানের অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। এখনকার বাবা-মা সন্তানদের একা ছাড়তে চান না। স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও দেখা যায় মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছেন বাবা-মা। সন্তানদের নিরাপত্তা দিতে অনেক মা চাকরিও ছাড়েন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থাকাটা জরুরি। আর যেসব কমিটমেন্ট আছে সেগুলো বাস্তবায়ন জরুরি।

জাতীয় কন্যাশিশু একডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলিও মনে করেন পুত্র-কন্যাশিশু জন্ম নিয়ে পরিবারের নেতিবাচক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ কমেছে। তবে কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, কন্যাসন্তানের জন্ম হলে এখন হয়তো অনেকেই মন খারাপ করেন না। কিন্তু নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে একটি পরিবারে কন্যাশিশুরা যে পরিমাণ না শুনে বড় হয়, একটি ছেলের ক্ষেত্রে তা নয়। চারপাশের নানা ঘটনা অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিরাপত্তা দিতে না পারার শঙ্কা থেকে অনেক কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ‘আমরা সবাই সোচ্চার, বিশ্ব হবে সমতার’ প্রতিপাদ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। কন্যা শিশুর প্রতি জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য রোধে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুষ্ঠু বিকাশের বিষয়টিকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে ২০০০ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি সরকারি আদেশের মাধ্যমে শিশু অধিকার সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনকে কন্যাশিশু দিবস হিসেব পালনের লক্ষ্যে ৩০ সেপ্টেম্বরকে ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। তখন থেকেই প্রতিবছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে এ বছর দেশে ৫ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত পালিত হবে শিশু অধিকার সপ্তাহ। এ বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার ৫ অক্টোবর হওয়ায় ওই দিন বিশ্ব শিশু দিবস এবং ৬ অক্টোবর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হবে। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস পালিত হবে আজ বুধবার।

পিআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়