মানবিক বাংলাদেশ দিবস ও উন্নয়নের রূপকার

আগের সংবাদ

রাজস্ব আয়ে গতি আসুক

পরের সংবাদ

শুধু কি সাহেদরাই দায়ী

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ , ১০:২৪ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ , ১০:২৪ অপরাহ্ণ

এই ভদ্রলোকের সম্বন্ধে যেসব তথ্য ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায় আমাদের দেশে ডিটেকটিভ গল্প যারা লেখেন তাদের এখন আর বিদেশি কাহিনীর ছায়া অনুসরণ বা কায়া ধরে টানাটানি করার দরকার নেই, দেশের ভেতরেই প্রচুর খাঁটি জিনিস উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গিয়েছিল লুটপাটের কাজকর্ম; তাতে আর বিরতি পড়েনি। প্রতারণাও শুরু হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গেই। লুণ্ঠন ও প্রতারণা দুটোই এখন বেশ অপ্রতিহত গতিতে চলছে।

করোনা চিকিৎসা ধরিয়ে দিল চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার হাল পতনে কতটা উন্মুখ। পাবলিক প্রাইভেট কোনো হাসপাতালেই করোনা রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা ছিলই না বলা যায়, কোনোমতে যখন অল্পস্বল্প আয়োজন করা গেল তখন দেখা গেল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবীদের সুরক্ষার ব্যবস্থাতে ভীষণ ঘাটতি। টেস্টিং ল্যাবরেটরি খোলা হয়েছে তো টেকনিশিয়ান নেই, যন্ত্রপাতিও ঠিকমতো কাজ করছে না। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই, নমুনার সংগ্রহ অপর্যাপ্ত। এসবই স্বাভাবিক। কারণ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুবই অল্প, তদুপরি সেখানে ভয়াবহ রকমের লুটপাট চলছে। এর কিছুটা মাত্র আভাস পাওয়া গেল এই খবর থেকে যে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের ঠিকাদাররা জোচ্চুরি এবং যোগসাজশের মাধ্যমে এক দুই নয়, ১০০ কোটি টাকা ইতোমধ্যেই হাতিয়ে নিয়েছেন। ঠিকাদারদের একজন নকল কিট সরবরাহ করে টাকা বুঝে নিয়ে হজম করে ফেলতে প্রায় সক্ষমই হয়েছিলেন, একটি হাসপাতাল সন্দেহ প্রকাশ করাতে ধরা খেয়েছেন। তার মতো অনেক দক্ষই যে অধরা রয়ে গেছেন তাতে সন্দেহ কী! খাদ্যে ভেজাল মেশানোর চেয়েও চিকিৎসায় ভেজাল ঢুকিয়ে দেয়া যে অধিক প্রাণঘাতী এটা তাদের কে বোঝাবে, কেই-বা নিবৃত্ত করবে? ওদিকে চিকিৎসা খাত দুঃসহরূপে কেন্দ্রীভ‚ত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতা নেই যে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবেন, সব কিছু আসে ওপর থেকেই। টেস্ট করানোর জন্য পাবলিককে যে কড়ি গুনতে হবে এই সিদ্ধান্তটাও ওপরেই গৃহীত।
প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর কোনো কোনোটি এগিয়ে এসেছে। কিন্তু দেখা গেল বিপন্ন চিকিৎসাপ্রার্থীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এমন সব অঙ্কের টাকা তারা হাতিয়ে নিচ্ছে যেটা শুনলে সুস্থ মানুষেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা। প্রতারণার অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়েছেন একজন হাসপাতালওয়ালা। তার এক হাসপাতালের দুই শাখা। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে গেছেন করোনা মোকাবিলায় বিনা মুনাফায় সেবা দেবেন বলে। তার ল্যাবরেটরিতে টেস্টিং হবে। তার হাসপাতাল উন্মুক্ত থাকবে চিকিৎসাসেবার জন্য। তা তিনি কাজে কোনো তৎপরতার অভাব দেখাননি। তার দপ্তর থেকে হাজার হাজার ভুয়া সার্টিফিকেট ছাড়া হয়েছে, কত কোটি টাকা আয় করেছেন এবং কত লোককে যে বিপদে ফেলেছেন কে জানে। তবে এটা জানা গেছে যে ধরা পড়ার আগে নিজের ভুয়া স্বেচ্ছাসেবী কাজের জন্য ১ কোটি ৯৬ লাখের একটি বিল তিনি দাখিল করেছিলেন, অল্পের জন্য সফল হননি। তার হাসপাতালে করোনা রোগীদের ভর্তিও করা হয়েছে, টাকাও নেয়া হয়েছে যথারীতি, কিন্তু সেখানে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। যে জন্য তার নিজের পিতা যখন করোনায় আক্রান্ত হন তখন তাকে নিজের হাসপাতালে না এনে অন্যের হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। পিতা মারা গেছেন। প্রতারক ভদ্রলোকের কর্মপ্রতিভা বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তিনি অনেক কাজে যুক্ত ছিলেন। ধরা পড়ার পর জানা গেছে যে টাকা জাল করাতেও নিয়োজিত ছিলেন। তাকে ধরতেও বিস্তর কষ্ট হয়েছে। তার কর্মচারীরা ধরা পড়েছেন, তিনি সবাইকে ফাঁকি দিয়ে একটানা নয় দিন লুকিয়ে ছিলেন, নাকি দেশের ভেতরেই; ধরা পড়লেন দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে, বোরখা পরে, নারী সেজে পগারপার হয়েই গেছিলেন, অল্পের জন্যই কাত হয়েছেন। এমনটাই তো আমরা শুনতে পেলাম। আরো গভীর কিছু থাকলে জানেন তা অন্তর্যামী। সর্বশেষ অস্ত্র মামলায় সেই ভদ্রলোকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে।

এই ভদ্রলোকের সম্বন্ধে যেসব তথ্য ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায় আমাদের দেশে ডিটেকটিভ গল্প যারা লেখেন তাদের এখন আর বিদেশি কাহিনীর ছায়া অনুসরণ বা কায়া ধরে টানাটানি করার দরকার নেই, দেশের ভেতরেই প্রচুর খাঁটি জিনিস উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গিয়েছিল লুটপাটের কাজকর্ম; তাতে আর বিরতি পড়েনি। প্রতারণাও শুরু হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গেই। লুণ্ঠন ও প্রতারণা দুটোই এখন বেশ অপ্রতিহত গতিতে চলছে। প্রতারক এই ভদ্রলোকের নাম মোহাম্মদ সাহেদ; কিন্তু সেটা তার একমাত্র নাম নয়; সাহেদ করিম, মেজর করিম, কর্নেল চৌধুরী ইত্যাদি যখন যেমন তখন তেমন নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তার অসাধারণ বাস্তববুদ্ধি তাকে বাতলে দিয়েছিল যে সাফল্যের জন্য গুটিকয়েক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত রাজনৈতিক যোগাযোগ। সেটা তার ছিল, নিজেকে তিনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির একজন সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উচ্চ মহলে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। র‌্যাব যখন তার হাসপাতাল সিল করে দিচ্ছে তখনো তার নৈতিক সাহস অক্ষুণœ ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করার। প্রতারক ভদ্রলোক এটাও বিলক্ষণ জানতেন যে যুগটা হচ্ছে মিডিয়ার, মিডিয়াকে ঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারলে অনেকেই কুপোকাৎ হবেন। তা মিডিয়াকে তিনি ঠিকমতোই ধরেছিলেন। আমরা দেখিনি, তবে যারা দেখেছেন তারা বলেছেন যে টক শোতে তাকে নিয়মিতই দেখা যেত। আর নিয়ম তো এই যে মিডিয়াতে যত দর্শনদান ততই প্রতিপত্তি বৃদ্ধি। সেটা তার ক্ষেত্রে ঘটেছে। সাধারণ দর্শক তো অবশ্যই এমনকি সরকারের পদস্থ লোকেরাও অনুমান করেছেন ইনি রাস্তাঘাটের লোক নন, অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার বিচরণ তাতে সহজতর হয়েছে। জানা যায় টিভির ওপর সবটা নির্ভরতা না রেখে, প্রিন্ট মিডিয়ার দিকেও তিনি নজর দিয়েছিলেন। তার ভিজিটিং কার্ডগুলোর একটিতে তার পরিচয় দৈনিক নতুন কাগজ নামের দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। কার্ডটি নাকি প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা। অকালে ধরা না পড়লে আমরা হয়তো একটি নতুন দৈনিকেরও দেখা পেতাম।

এ যুগের আরেক অস্ত্র সেলফি; ছবি তুলে মোবাইলে রেখে দেয়া, প্রয়োজনমতো প্রদর্শন করা। সাহেদ সে কর্তব্যকে মোটেই উপেক্ষা করেননি। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে বহু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে তার ছবি তোলা, অথবা তৈরি করা, অবস্থায় মজুদ রয়েছে। যেগুলো দেখে কর্তাব্যক্তিরা পর্যন্ত ধারণা করতেন যে ইনি মস্ত একজন কেউকেটা। তাতে আমলা ও রাজনীতিক, উভয় মহলেই তার গুরুত্ব বাড়ত এবং নিশ্চিত অবস্থানে থাকত।

একটা ছবি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনি তার ভুয়া কাজের জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে ঘটা করে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিসেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে। প্রবল বিক্রমে তিনি স্বাক্ষর দিচ্ছেন, তার ঠিক পাশে বসে রয়েছেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী, মন্ত্রীর পাশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। পেছনে বিভিন্ন ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান কয়েকজন কর্মকর্তা। এদের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব ও জননিরাপত্তা সচিব। সাহেদের জন্য এটি গৌরবের চিত্র। মন্ত্রী ও মহাপরিচালককে টেবিলে এনে পাশে বসিয়েছেন, অন্তত তিনজন সচিব কাতার ধরে দাঁড়িয়ে আছেন পেছনে, অন্য কর্মকর্তারা তো রয়েছেনই। তবে এটি এখন সামাজিক মাধ্যমে ও পরে সংবাদপত্রে চলে আসার ফলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিছুটা অসুবিধায় পড়েছেন, কারণ তিনি বেশ জোরেশোরেই বলে আসছিলেন যে চুক্তি সম্বন্ধে তিনি কিছুই জানতেন না।

এখন বলছেন হ্যাঁ, উপস্থিত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু চুক্তিতে কী আছে পড়ে দেখেননি। অসংখ্য কাগজ আসে, মন্ত্রীরা ওসব পড়েন না। তা ঠিক; কিন্তু কার সঙ্গে চুক্তি করছেন সেটা তিনি নিশ্চয়ই জানতেন এবং চুক্তি স্বাক্ষরের সব অনুষ্ঠানে নিশ্চয়ই তিনি উপস্থিত থাকেন না, তাহলে ওই বিশেষ অনুষ্ঠানটিতে হঠাৎ করে কেন হাজির হলেন? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। আসলে সরকারের নিজেরই তো জবাবদিহির দায় বলে কোনো কিছু নেই। প্রশ্ন করতে গেলে তো মুখ সামলাতে হয়। সদাপ্রস্তুত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভ্রæকুটি রয়েছে। ওই আইন আর যাকেই নিরাপত্তা দিক প্রশ্নকারীদের যে নিরাপত্তা দেয় না সেটা পরীক্ষিত সত্য। যে কেউ, যখন ইচ্ছা, মামলা ঠুকে দিতে পারে; সে ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য হোক কি হালের এমপিই হোন। আর মামলা দিলেই আর কোনো কথা নেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তক্ষণই ঝাঁপিয়ে পড়বে, ধরে-আনবে, জামিন দেবে না। জেলে পুরবে। এমনকি ধরে নিয়ে গেছে যে সেটাও অস্বীকার করতে পারে, ইচ্ছা করলে।

করোনায় উত্ত্যক্ত মানুষদের সঙ্গে প্রতারণার ব্যাপারে মোহাম্মদ সাহেদই যে একমাত্র ব্যক্তি এটা মনে করার কারণ নেই। অন্তত একজন তো ছিলেনই যিনি সাহেদ সাহেবের গুরু বলে দাবি করতে পারেন। ইনিও একটি স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। ভদ্রলোকের চার চার জন স্ত্রী। চতুর্থজন একজন চিকিৎসক। চিকিৎসক স্ত্রীটির সাহায্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে তিনি নমুনা সংগ্রহের এবং নমুনা পরীক্ষার পর সার্টিফিকেট প্রদানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অধিদপ্তর কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না দেখে; ওই সুযোগে সদ্ব্যবহার করে তাদের অনুপ্রবেশ। তারা যে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করছিলেন তা কিন্তু নয়, ভালো অঙ্কের টাকাই নিচ্ছিলেন। সর্বনিম্ন ৫ হাজার সর্বোচ্চ দশ; আর বিদেশপ্রত্যাগতদের জন্য একটাই বাধা হার, ১০০ ডলার। ২৭ হাজার নমুনা তারা সংগ্রহ করেন। প্রথম ১১ হাজার ৫৪০টি পর্যন্ত ঘটনা সঠিকই ছিল, নমুনা পরীক্ষা করেই সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছিল, কিন্তু মাঝপথে এসে বুদ্ধি গেল খুলে, তারা দেখলেন কেউ তো আর দেখছে না, পরীক্ষা-নিরীক্ষার অতসব ঝুট-ঝামেলার দরকার কী। তাই নমুনাগুলো নর্দমায় নিক্ষেপ করে তারা ইচ্ছামতো ডানে-বামে সার্টিফিকেট বিলি করা শুরু করে দিলেন। খবরে প্রকাশ ১৫ হাজার ৪৬০টি ভেজাল সার্টিফিকেট তারা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন। ধরা না পড়লে আরো দিতেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়