নীলা হত্যাকাণ্ডে শঙ্কিত সমাজ

আগের সংবাদ

শুধু কি সাহেদরাই দায়ী

পরের সংবাদ

মানবিক বাংলাদেশ দিবস ও উন্নয়নের রূপকার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ , ১০:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ , ১০:২৯ অপরাহ্ণ

মনুষ্যত্বপূর্ণ কর্ম ও লোকহিতকর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করে মানবিক গুণাবলির চর্চা ও বিকাশে নিয়োজিত রাষ্ট্রকে মানবিক রাষ্ট্র বলা যায়। শোষিত-নিপীড়িত, অত্যাচারিত, নির্যাতিত বাঙালির চ‚ড়ান্ত মুক্তি এবং একটি আত্মমর্যাদাশীল মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম-বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মানবিক দিক তিনি বাংলাদেশের সংবিধানে সংযোজন করেন। জুলিও কুরি শান্তি পদকে ভ‚ষিত বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলা ভাষায় দেয়া ভাষণটিও ছিল মানবিক বিবেককে জাগ্রত করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদাত্ত আহ্বান।

বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী সময়ে মানবিক বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য তেমনভাবে সামনে না এলেও ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেন। তিনি দেশের ইতিহাসে প্রথম ‘বয়স্ক ভাতা’, ‘বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত মহিলা ভাতা’, ‘অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা’, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘গৃহায়ন’, ‘আদর্শ গ্রাম’, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচিসহ অনেক মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনার উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির ফলে মানবিক বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত সূচিত হয়। এ চুক্তির ফলে ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনা অর্জন করেছেন ইউনেস্কোর ‘হুপে-বোয়ানি শান্তি’ পুরস্কার। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সাফল্য। ১৯৯৫-৯৬ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ৪১.৫ শতাংশ হলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১০ বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে ১১.৩ শতাংশে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার মার্কিন ডলারে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্র্ভ ছাড়িয়েছে ৩৯ বিলিয়ন ডলারে।

নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বের অসাধারণ গুণ হলো নিপীড়িত, বঞ্চিত, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মানুষের প্রতি শেখ হাসিনার ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ অসহায়, এতিম, বৃদ্ধ, নারী, শিশু, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগগুলোও বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘বিপুল জনপ্রিয় নেত্রী হলেও শেখ হাসিনা আসলে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের কণ্ঠস্বর। বর্তমান করোনা দুর্যোগেও ঘনবসতির বাংলাদেশকে রক্ষা করতে তার উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রণোদনাসহ সুবিধাবঞ্চিত ৫০ লাখ পরিবারকে ২ হাজার ৪০০ টাকা করে দিয়েছে তার সরকার। ১২ আগস্ট ২০২০ তারিখে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, দেশের ৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৩টি ঘরহীন পরিবারকে সরকারি খরচে ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। ২০১৬ সালের ২ জানুয়ারি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা এতিমদের দিতে এসেছি। কারণ আমরা নিজেরাও বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়েছি। এতিম হওয়ার কষ্ট আমি আর রেহানা ছাড়া মনে হয় আর কেউ বেশি জানে না।’

২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ে নতুন ঠিকানা পেয়েছে ৬৭ বছর মানবেতর জীবন-যাপনকারী লাখ লাখ অধিবাসী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভাবনী নেতৃত্ব-দর্শন মানবিক বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলেন এবং ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘… এখানে কে হিন্দু, কে মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধÑ এটা কোনো কথা নয়। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিকভাবে তাদের আশ্রয় দিয়েছি।’ ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে বাংলায় প্রদত্ত ভাষণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ৫ দফা প্রস্তাব পেশ করার আগে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমার হৃদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। কেননা আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীতসন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ছবি। … আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই, অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয়, মানব কল্যাণ চাই।’ কমনওয়েলথ সম্মেলনেও তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে সদস্যভুক্ত দেশগুলোর জোরালো সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছেন। জাতিসংঘের ৭৩তম অধিবেশনে ১৭৮টি রাষ্ট্রের ভোট পেয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে শেখ হাসিনার প্রদত্ত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ এবং ‘শান্তির সংস্কৃতি’ প্রস্তাব ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে গৃহীত হয়েছে।
মানবিকতার দৃষ্টান্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রিয় বাংলাদেশ অর্জন করেছে অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ২০১৭ সালে ব্রিটিশ মিডিয়া ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ এবং অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন ইউনিভার্সিটি ‘মানবতার চ্যাম্পিয়ন’ ঘোষণা করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। পোপ ফ্রান্সিস এবং বিল গেটসকে পেছনে ফেলে ২০১৭ সালে বিশ্বের সেরা মানবিক নেতা মনোনীত হয়েছেন শেখ হাসিনা। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে ঢাকা সফরে এসে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আঁলা বেরসে বলেছেন, বাংলাদেশ মানবিক রাষ্ট্র। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সেটাই করে দেখিয়েছে। এমন মানবিক বাংলাদেশের পাশে সুইজারল্যান্ড সবসময় থাকতে চায়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ‘শেখ হাসিনা : দ্য মাদার অব হিউম্যানিটি’ শিরোনামে স্টোরি করেছে ইউরোপের ম্যাগাজিন ‘ডিপ্লোম্যাট’। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর হিউম্যান লিডারশিপ এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন যে, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি বিশাল হৃদয়ই যথেষ্ট। বাংলাদেশ কোনো উন্নত রাষ্ট্র নয়, অফুরন্ত সম্পদও নেই দেশটির, তারপরও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা বিশ্বমানবতার নেতৃত্ব নিয়েছেন।

সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের নীতি-আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যের আলোকে রাষ্ট্রের ধরন বা শ্রেণি-বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয়। শেখ হাসিনা প্রায় দুই যুগ ধরে এ দেশের রাজনীতির প্রভাবশালী নিয়ামক, মহান শিল্পী, জীবন্ত এক কিংবদন্তি। বিশ্বের অন্যতম সৎ, দক্ষ ও সেরা প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতিসহ তিনি অর্জন করেছেন পঞ্চাশের অধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও পদক। বাংলার মানুষও মনে করে, শেখ হাসিনা দেশের গর্ব, দেশিকোত্তম ব্যক্তি, সর্বোত্তম পথনির্দেশক, দেশহিতব্রতী মানবিক শাসক। তার মনুষ্যত্ববোধ ও লোকহিতব্রতী কর্ম রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। শেখ হাসিনার উদ্ভাবনী চিন্তা ও ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে উন্নয়ন তত্ত¡’ বাংলাদেশের মানবিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। তার চিন্তা-চেতনা, নীতি, তত্ত¡, দর্শন ও কর্ম ‘মানবিক রাষ্ট্রের ধারণা’ সম্পর্কে বিশ্বকে নতুন দিগন্ত দিয়েছে। ব্যক্তিজীবনেও তিনি নীতিবান, ধার্মিক, দয়াশীল। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দেশমান্য শেখ হাসিনার জন্মদিনকে ‘মানবিক বাংলাদেশ দিবস’ হিসেবে পালন করা হলে তা হবে মুক্তিকামী রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য অধিক প্রেরণার এবং মানবিক বিশ্বের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত। তাই ২৮ সেপ্টেম্বরকে ‘মানবিক বাংলাদেশ দিবস’ ঘোষণার প্রস্তাব করছি।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : গবেষক ও কলাম লেখক।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়