চাকরি আত্তীকরণেও ঘুষ!

আগের সংবাদ

যমুনা সার কারখানার সার নিচ্ছেন না ডিলাররা

পরের সংবাদ

চিরসংগ্রামী নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক

ঝর্ণা মনি

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ , ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ

‘ঘাতকের রক্তচক্ষু মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে/ স্বজনের রক্তে ভেজা এই বাংলায়/ বুকে কষ্টের পাথর চেপে/ চোখে অশ্রুর সমুদ্র নিয়ে/ ক্লান্তিহীন তুমি ছুটে যাও গ্রাম থেকে গ্রামে/ শহরের পোড়া বিধ্বস্ত বস্তিতে;/ মায়ের মমতা দিয়ে বুকে নাও দুখিনীরে।’

স্বজনের রক্তে ভেজা স্বদেশের নিরন্ন মুখে অন্ন তুলে দেয়ার কঠিন সংগ্রামে ক্লান্তিহীন চরণে তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। পেছনে তাড়া করে বেড়ায় বুলেট, গ্রেনেড, বোমা। ঘাতকের উদ্ধত পিস্তলের সামনে মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে নিঃশঙ্ক চিত্তে, দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। শোক, অনিশ্চয়তা, অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের ঝড়ো দিনগুলো বুকে ধারণ করে পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের মিশন নিয়ে আলো হাতে চলছেন আঁধারের যাত্রী।

তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশে^ উন্নয়নের রোলমডেল। বাংলাদেশের দুঃখি মানুষের আশ্রয়স্থল। নব পর্যায়ের বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মাতা। উন্নত, সমৃদ্ধ, ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার। স্বাধীন বাংলাদেশে ’৭৫ পরবর্তী সফল রাষ্ট্রনায়কের সাড়ে সাত দশকের পথচলা, সাফল্য গাঁথা কর্মময় জীবন কুসমাস্তীর্ণ ছিল না, পুরো পথচলাই কণ্টকাকীর্র্ণ। টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর তীরে বাঙালির চিরায়ত গ্রামীণ পরিবেশে, দাদা-দাদির কোলে-পিঠে মানুষ হওয়া শেখ হাসিনার শৈশব-কৈশোরে পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে বন্দি, রাজরোষ আর জেল-জুলুম ছিল যার নিত্য সহচর। রাজনীতি তার রক্তে মেশা। স্কুল জীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি শেখ হাসিনার। নেতৃত্বে আসেন ষাটের দশকে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভানেত্রী (ভিপি) নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে।

ছাত্রলীগ নেত্রী হিসেবে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ঘরে ঘরে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফার লিফলেট বিলি করা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারের পর প্রচণ্ড দমন-নির্যাতন-নিপীড়ন সময়েও থেমে যাননি তিনি। বাঙালির ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে গৃহবন্দি ছিলেন শেখ হাসিনা। পঁচাত্তরের পনের আগস্ট নির্মমরাতে ঘাতকের নির্মম বুলেটে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ সময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তার অনুপস্থিতিতে তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় ১৯৮১ সালে। ডাক আসে দেশমাতৃকার হাল ধরার।

এক বোন ছাড়া বাবা-মাসহ পরিবারের সবাইকে হারিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জীবন পেরিয়ে সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশে ফেরেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে। সেদিন প্রতিক‚ল আবহাওয়া উপেক্ষা করে হাজার হাজার জনতা জড়ো হয়েছিল তেজগাঁওয়ের পুরনো বিমানবন্দরে। বুকে শোক চেপে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে দেশের মানুষের উন্নয়নে সঁপে দেন নিজেকে।

এরপর দীর্ঘ ২১ বছর সামরিক জান্তা, স্বৈরশাসন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে চলে একটানা অকুতোভয় সংগ্রাম। জেল-জুলম, অত্যাচার কোনো কিছুই তাকে টলাতে পারেনি এক বিন্দু। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তার সরকারের আমলেই ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। সম্পাদিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। বাংলাদেশ অর্জন করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। দারিদ্র্য হ্রাস পায়। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ক্রীড়াসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। কিন্তু বাঙালির বিশ্ব জয়ের এই স্বপ্নসারথীর পথ সবসময়ই স্বাপদসংকুল।

জেল-জুলুমের সঙ্গে বারবার বন্দুক তাক করা হয়েছে তার দিকে, সন্ত্রাসীর বোমা-গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে- আর তিনি অবিরাম ছুটে চলেছেন লক্ষ্য অর্জনে। ২০০৪ সালের একুশ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় নেতাকর্মীদের মানববন্ধনে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তবে পৈশাচিক ওই হামলায় প্রাণ হারান আইভী রহমানসহ ২৪ জন। মৃত্যু উপত্যকায়ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান অকুতোভয় শেখ হাসিনা। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য হাজির করা হয় ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’। মিথ্যা মামলা, কারাগার, ষড়যন্ত্র- মৃত্যুভয় পেরিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ে দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে বাংলাদেশ।

বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা ‘নীলকণ্ঠ পাখি’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সততা, নিষ্ঠা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় যুক্ত হয়েছে অজস্র সাফল্য।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সমুদ্র জয়, ছিটমহল সমস্যার সমাধান, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন নতুন উড়াল সেতু, মহাসড়কগুলো ফোর লেনে উন্নীত করা, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ ডলারে উন্নীত, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করা, দারিদ্র্যের হার হ্রাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়া, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত করা, বছরের প্রথম দিনে বই উৎসব, নারী নীতি প্রণয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, ফোর জি চালু, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, দলে ও সরকারে শুদ্ধি অভিযানসহ অসংখ্য সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার অবদান আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়ন এবং দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ভ‚ষিত হয়েছেন অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পদক, পুরস্কার আর স্বীকৃতিতে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে শেখ হাসিনার নেয়া পদক্ষেপ জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।

তবুও বিশ্বনন্দিত এই নেতাকে প্রতি মুহূর্তে পাড়ি দিতে হচ্ছে দুর্গম গিরি কান্তার মরু। সরকারেও থেকে তাকে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করতে হচ্ছে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি অসীম সাহসে লক্ষ্য অর্জনে অবিচল। গ্রাম-বাংলার ধূলোমাটি আর সাধারণ মানুষের মাঝে বড় হওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা আর বাংলাদেশ আজ অভিন্ন। কবি সুবোধ সরকার তার ‘বাংলাদেশ’ কবিতায় যথার্থই বলেছেন, ‘নদীর নাম রেখেছিলাম শেখ হাসিনা/ কোনো পাষাণ আজও বলেনি বাংলাদেশকে ভালোবাসি না।/ সুখ আছে, কষ্ট আছে/ আছে গরিব ভাইবোন/ ও মা তোমার শীতল পাটি/ বিছিয়ে দিলে কখন?’

এমএইচ