প্রসঙ্গ : স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ

আগের সংবাদ

এমসি কলেজের ঘটনায় ছাড় নয়

পরের সংবাদ

করোনা ও বন্যার দুর্যোগকালে দুর্বৃত্তদের আস্ফালন

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ , ১০:৪৪ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ , ১০:৪৪ অপরাহ্ণ

বিশ্বব্যাপী করোনা এখন দ্বিতীয় ঢেউ ছড়াচ্ছে। আমাদের এখানেও ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও করেছেন। সে কারণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তিনি প্রশাসন ও দলকে নির্দেশ দিয়েছেন। এমনিতেই গত প্রায় ৭ মাস করোনার সংক্রমণে সারাবিশ্বের মতো আমরাও নানাভাবে পর্যুদস্ত। তার ওপর এখন দ্বিতীয় ঢেউ যদি এসে পড়ে তাহলে আমরা কতটা নিজেদের সুরক্ষা দিতে পারব তা বলা মুশকিল। করোনা নিয়ে সারাবিশ্বের মতো আমরাও এক অজানা গন্তব্যে চলছি। ভ্যাকসিন আসার কথা প্রতিদিনই শোনালেও এর সত্যিকার প্রাপ্তি কবে ঘটবে তা এখনো নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। করোনার এমন বিপর্যয়ের সময় আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান হানা দিয়েছিল। তাতে আমাদের দেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তরের ঢল বাংলাদেশের গোটা উত্তরাঞ্চলকে প্লাবিত করে দেয়। বন্যা একবার নয়, চার চারবার উত্তরাঞ্চলের মানুষদের জীবনকে দুর্বিষহ করে দিয়েছে। এখনো বন্যা আর অতিবর্ষণে দেশের অনেক অঞ্চল ডুবে গেছে, মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্বীকার করতেই হবে এতসব দুর্যোগেও আমাদের মানুষ না খেয়ে মরার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সরকার, বেসরকারি, নানা সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারপরেও বলতে হবে বছরটা পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষের মতো আমাদেরও খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। তবে এতসব বিপর্যয়ের পরেও আমরা এখনো চলছি, কাজকর্মে যুক্ত আছি, দেশের অর্থনীতি সচল হচ্ছে। বিদেশ থেকে অভাবনীয় পরিমাণে রেমিট্যান্স পাচ্ছি, ব্যবসা-বাণিজ্যও প্রতিক‚ল নানা পরিস্থিতিতে চলছে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা এই মহাদুর্যোগেও টিকে আছি এটি কম নয়।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই মহাদুর্যোগের সময়ে একদিকে যেমন মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার পক্ষে অনেকেই অবস্থান নিয়েছেন, আবার অন্যদিকে এই সময়ে ত্রাণের সম্পদ লুটপাট করার কেউ কেউ চেষ্টা করেছে, করোনা চিকিৎসা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরে ক্রিয়াশীল একটি দুর্নীতিবাজ চক্র যেভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল, সেটি সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। তবে সুখের কথা হচ্ছে, গোটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই এখন নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এটি আমাদের খুব বিস্মিত করেছে যে, একটি অধিদপ্তরে গাড়িচালক থেকে সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত অনেককেই নানা ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে জড়িয়ে ছিলেন। তারা ভেবেছিলেন তাদের মসনদ কোনো কালেই ভাঙা যাবে না। কিন্তু করোনাকে প্রতিহত করতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যতটুকু পরিবর্তন আনতে হয়েছে সরকারকে, তার ফলে থলের বিড়াল বের হয়ে এলো একের পর এক। দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারাদেশে চিকিৎসাসেবার নামে নানা ধরনের কেনাকাটায় অর্থ লোপাটে জড়িত। সেটি এবার হাতেনাতে ধরা পড়ল। সেখানেই বেরিয়ে এসেছে শাহেদ, ডা. সাবরিনা কাণ্ড! এর সঙ্গে পুরা প্রশাসন কীভাবে জড়িত ছিল তার অনেক রহস্যও উন্মোচিত হতে থাকে। আসলে শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই নয়, বাংলাদেশের সবকটি মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত অধিদপ্তর, অফিস, কমবেশি নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত হয়ে আছে এটি স্বীকার করতে আমাদের বাধা থাকা উচিত নয়। অথচ আমাদের দেশে মেধাবী ছেলেমেয়েরা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করেন। তাদের যোগদানের শুরুটা ভালোই থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকেই ব্যক্তিগত লাভালাভ, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তি ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন। ক্যাডার সার্ভিস অনেকের কাছেই এখন খুব আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশ সফর, সম্পদ অর্জন এবং ব্যক্তিগত ভাগ্য পরিবর্তনে অনেকেই প্রশাসনিক পদ-পদবির সুযোগ-সুবিধাগুলোকে ব্যবহার করে থাকেন। এই সময়ে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর বেরিয়ে আসে লিয়াকত, প্রদীপসহ বেশকিছু পুলিশ কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতা, মাদক নির্মূল করার নামে নিরপরাধ মানুষ হত্যাসহ নানা অপকর্মের লোমহর্ষক ঘটনা। ফলে গোটা পুলিশ বাহিনী বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। এর ফলে গোটা কক্সবাজার অঞ্চলেই পুলিশ বাহিনীতে ঘটে বড় ধরনের রদবদল। কক্সবাজারের ঘটনা থেকে ধারণা করা যায় যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও আইন ভঙ্গ করা, স্বেচ্ছাচারিতার প্রকাশ ঘটা এবং অর্থ-বিত্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া কর্মকর্তার সংখ্যা একেবারে কম নয়। আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ক্যাসিনো কাণ্ড থেকে গত বছর যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে সেটি এখনো প্রয়োজনীয় বলে সব মহল থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। ফরিদপুর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি এবং তার ভাই ৩ বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার গল্প আওয়ামী লীগকেও হতবাক করেছে। এরকম অনেক ভুঁইফোড় নেতার অর্থ-বিত্তের কাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলেই লোকমুখে প্রচারিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগে এ নিয়ে চলছে শুদ্ধি অভিযান। ছাত্রলীগের রাশ অনেকটা টেনে ধরা গেলেও সিলেট এমসি কলেজে যে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন একজন নারী তা ছাত্রলীগের গত কয়েক মাসের অর্জনকে মøান করে দেয়ার জন্য যেন যথেষ্ট। তবে এ পর্যন্ত দুজন ধর্ষক ধরা পড়ায় মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। আসলে দেশের কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একশ্রেণির মাস্তান গড়ে উঠেছে, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনসহ কাউকেই তোয়াক্কা করে না। সিলেট এমসি কলেজের সুপারিনটেনডেন্ট ভবনে যারা বিনা অনুমতিতে থাকত তাদের সাহসের খুঁটি কোথায় পোঁতা আছে সেটি দেখার বিষয়।
ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিদা খানমের ওপর যারা হাতুড়ি নিয়ে আক্রমণ করেছে তাদের পেছনের কোনো মদদদাতা আছে কিনা সেটি দেখার বিষয়। আসলে সমাজের যেদিকেই তাকাই সর্বত্রই মূল্যবোধের অবক্ষয়, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, দ্বন্দ্ব-বিরোধ, সংঘর্ষ, লুটপাট, টাকা হাতিয়ে নেয়া যেন এক সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এটি এক-দুই বছরের কোনো বিষয় নয়। যুগ যুগ ধরে এই সমাজের ভেতরে যে অনিয়ম-দুর্নীতি বাসা বেঁধে উঠেছে এটি তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। বলা যাবে না যে এটি বর্তমান সময়কালের প্রবণতা। এর অতীত অনেক দীর্ঘ।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সমাজে এত মূল্যবোধের অবক্ষয়, ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের প্রবণতা কীভাবে এত বেশি জায়গা করে নিয়েছে। আপনি এখন সরকারের দেয়া বিভিন্ন ভাতা প্রদানের তালিকাটি যদি খুঁজে দেখেন তাহলে দেখবেন সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি সংস্থার লোকজন কীভাবে টাকার বিনিময়ে দুস্থ ও বিধবা মহিলা ভাতা বণ্টনে নয়ছয় করে বেড়াচ্ছে। এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও টাকা লুটপাটের নানা ঘটনা ঘটছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, নানা ধরনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে নিয়মের চেয়ে অনিয়মই বেশি চলছে। বাজারে দ্রব্যমূল্যের কথা কী আর বলব। তাহলে আমরা কাদের বিশ্বাস করব। আসলে আমাদের জাতিগোষ্ঠী গত তিন-চার দশকে অনেক বেশি চাকচিক্যে ভরে উঠছে। শিক্ষার হার বাড়ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, মানুষের আয়-উন্নতিও বাড়ছে। ওপরে উল্লিখিত অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, বখাটেপনা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ইত্যাদি থেকে মুক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। সে কারণেই দেখা যায় শহরের প্রতিটি পাড়ায় কোনো না কোনো তরুণ কিংবা বয়স্ক ব্যক্তি নিজের প্রভাব খাটিয়ে এমন অনেক কিছু করার সুযোগ পায়, যা তাদের অন্যদের ওপর কর্তৃত্ব করার অঘোষিত সুযোগ দিয়ে দেয়। এমনকি গ্রামেও এখন এমন প্রবণতা বেড়ে উঠছে। ফলে সর্বত্রই শক্তি প্রয়োগের আস্ফালন দেখা যাচ্ছে। এটি আমাদের সমাজ বিকাশের জন্য মোটেও সহায়ক নয় বরং ক্ষতিকর। আমাদের লাখ লাখ তরুণ লেখাপড়ায় যেখানে মেধাবী, যুক্তিবাদী, সৃষ্টিশীল, জ্ঞানগুণী মানুষ হয়ে ওঠার কথা ছিল, বাস্তবে সেটি দেখা যায় না। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মানের সংকট রয়েছে। মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা ও জীবন প্রণালি চর্চার সুযোগ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমে যাচ্ছে। সে কারণেই মিজানদের মতো বখাটেরা পিতা-মাতার বাড়িতে মাদকের আসর বসাতে পারে, নীলা রায় নামক একজন ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণে হত্যা করতে সাহস পায়, এলাকায় চাঁদাবাজি, মাস্তানি এবং গ্যাং তৈরি করতে পারে। দেশে বেশকিছু নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইফুল, অর্জুনদের মতো দখলদার ধর্ষক বিনা বাধায় চলতে পারে! প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মধ্যে শিক্ষা নেই, মানবতার শিক্ষাও নেই। মাস্তানি, শক্তি প্রয়োগ করে অসংখ্য তরুণ এভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য বুঝা হয়ে উঠেছে। এরা আজ এদল, কাল অন্য দল এ নামেই আবিভর্‚ত হয়। সুতরাং এখন যে শুদ্ধি অভিযানের কথা আমরা বলছি সেটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেমনিভাবে চলবে, একইভাবে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে প্রয়োগ ঘটাতে হবে, দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে গোটা প্রশাসন ব্যবস্থাকে। জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ওঠার সুযোগ যেন কারো না থাকে, তদবিরের সংস্কৃতিকে চিরতরে বিদায় দিতে পারলে আমরা খুব দ্রæত না হলেও ধীরে ধীরে সৃজনশীল, মেধাবী, যোগ্য ও যুক্তিবাদী মানুষ গড়ে তুলতে পারব। এই মানুষদের ঘুষ খেতে হয় না, দুর্নীতিও করতে হয় না। নিজের মেধা ও দেশপ্রেমে বেড়ে উঠলে দেশ সমৃদ্ধিশালী হতে পারবে। আমাদের সেই শিক্ষাই দিতে হবে, নিতে হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়