পাঁচদিন পর দুই সহযোগীসহ মিজান গ্রেপ্তার

আগের সংবাদ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি

পরের সংবাদ

নগরজুড়ে গ্যাস বোমা!

দেব দুলাল মিত্র

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ , ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ

পাইপলাইনের জালে রাজধানী মরণফাঁদ

তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন এখন রাজধানী ও আশপাশের এলাকাবাসীর জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা পুরনো গ্যাসলাইনের পাইপ ফেটে গোটা রাজধানী অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করছেন নগরবিদরা। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি এড়াতে বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞদের দেয়া পরামর্শ উপেক্ষিতই রয়েছে গেছে। দিন যত যাচ্ছে, পরিস্থিতি ততই জটিল হয়ে উঠছে। বছরে প্রায় এক হাজার অগ্নিকাণ্ড ঘটে গ্যাস থেকে; যা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩০ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৬৭ সালের দিকে রাজধানীর বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। আশির দশকে রাজধানীতে পাইপলাইনে গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। সেই থেকে তিতাসের গ্যাস সম্প্রসারণ বেড়েই চলছে। এখন সারাদেশে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার গ্যাসের পাইপলাইন আছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার বিতরণ ও সার্ভিস লাইন। রাজধানীসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকায় পাইপলাইনে গ্যাস বিতরণকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান হচ্ছে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন এন্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানি লি.। প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কিলোমিটার পাইপলাইন তিতাস গ্যাসের অধীন। এর মধ্যে রাজধানীতে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন রয়েছে। মাটির নিচে থাকা ৪০/৫০ বছরের এই পুরনো ও জরাজীর্ণ পাইপলাইনগুলো এখন নগরবাসীর জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই পাইপগুলো বদলে ফেলতে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

নগরবিদরা বলছেন, ব্যাপকহারে তিতাসের গ্যাসলাইন সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু পাইপলাইনের স্মার্ট ডাকটিং সিস্টেম বা ম্যাপ তৈরি করা হয়নি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবশ্যই এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে ড্রইং-ডিজাইনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তিতাস কর্তৃপক্ষ এই কাজটি করতে পারেনি। তিতাসের সব সংযোগ স্মার্ট ডাকটিং সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বছরের পর বছর যেখানে প্রয়োজন হয়েছে, সেখানেই পাইপ বসিয়ে গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনাহীনভাবে রাজধানীর আয়তন চারদিকেই বর্ধিত হওয়ায় নতুন নতুন ছোট-বড় রাস্তা ও বাসস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তিতাস এসব এলাকায় কোনো ধরনের ম্যাপ ছাড়াই গ্যাসের সংযোগ দিয়েছে। ফলে মাটির নিচে গ্যাসের পাইপলাইন জালের মতো রাজধানীকে ছেঁকে ধরেছে। অন্যদিকে মাটির ওপরে হাইরাইজ ভবনসহ বহুমাত্রিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পরিত্যক্ত লাইনেরও খোঁজ মিলছে না। এছাড়া এলাকাভিত্তিক ‘সার্কিট ব্রেকার’ তৈরি করে সেফটি নেট গড়ে তোলার জন্য সরকার পদক্ষেপ নিয়েও তা থেকে আবার পিছিয়ে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিস্টেমের কার্যকারিতা বোঝানোর পরও সরকার তা গ্রহণ করেনি।

অবৈধ পাইপলাইনের ছড়াছড়ি : ঢাকা, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় তিতাস গ্যাস কোম্পানি গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে। এই সব এলাকাতেই অবৈধ গ্যাসের পাইপলাইনের ছড়াছড়ি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একবার তাদের

তদন্তকালে এসব এলাকায় পাইপলাইনে ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৫টি অবৈধ গ্যাস সংযোগের প্রমাণ পায়। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা এরপরও দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তিতাসের সব জোনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রাহককে বৈধ সংযোগের পরিবর্তে অবৈধ সংযোগেই বেশি উৎসাহ জোগায়। এক বা দুই চুলার একটি সংযোগ দিলেই মাসে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত পকেটে ঢোকাতে পারে। এছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটর সংযোগ দেয়া হলে টাকার অঙ্ক বহুগুণ বেড়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের প্রতিটি এলাকাতেই অবৈধ গ্যাস সংযোগ সবচেয়ে বেশি। অভিযানে কখনো অবৈধ সংযোগ কেটে দেয়া হলে তিতাসের ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই আবার মোটা টাকার বিনিময়ে গোপনে পূর্ণসংযোগ দেয়।

প্রতিশ্রুতিতেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ : গ্যাসলাইন থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলছে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন হয়, তদন্ত চলে। ঘটনার সঙ্গে কারো অবহেলা বা দোষ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সবকিছুই প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। একটি বড় ঘটনা ঘটার পর সবাই বেশ তৎপর হয়ে উঠলেও কয়েকদিনের ব্যবধানে তা চাপা পড়ে যায়। নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকার মসজিদে গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা অতীতেও অনেক ঘটেছে। কিন্তু দোষীরা সাসপেন্ড হয়েও এক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। এর আগেও গ্যাস থেকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর কিছুদিন সবাই প্রতিবাদ জানায়। তারপর আবার সব চাপা পড়ে যায়।

পুরান ঢাকায় তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনের বেহাল দশা : রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তিতাসের গ্যাসলাইনের পাইপের বেহাল দশা। বিভিন্ন সময় গ্যাসলাইনের পাইপ লিকেজ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নগরীর বেশির ভাগ স্থানেই ৫০/৬০ বছরের পুরনো পাইপলাইনেই গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনের বেহাল দশা। কয়েক মাস আগে মিটফোর্ড থেকে চকবাজার হয়ে মোগলটুলি এলাকার রাস্তার সংস্কার কাজ হয়। একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। এসময় রাস্তা খুঁড়তেই তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনের ভয়াবহ অবস্থা বেড়িয়ে আসে। কিন্তু পুরনো পাইপলাইন সংস্কারের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ভোরের কাগজকে বলেন, ভূমিকম্প যদি ৫ দশমিক ৫ মাত্রা অতিক্রম করে তাহলে মাটির নিচের গ্যাসের পাইপের সংযোগস্থলগুলো ফেটে গ্যাস বের হতে শুরু করবে। ভূমি যখন নড়বে তখন পাইপগুলো ফেটে যাবে। তখন যদি বিদ্যুতের শর্টসার্কিট হয় তাহলে বৈরুতের বিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানিও ঘটতে পারে। অনেকেই ধুঁকে ধুঁকে মরবে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের আইনের সঠিক প্রয়োগ করে। আইন না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে দোষীদের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ হয় না। বহু বছর ধরে তিতাসের দুর্নীতি চললেও সঠিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ইকবাল হাবিব বলেন, এই মুহূর্তে তিতাসের পরিত্যক্ত লাইনগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। লাইনগুলো মূল লাইন থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করার পর সিল করে দিতে হবে। মহল্লাগুলোকে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে গ্যাসের লাইনে ‘সার্কিট ব্রেকার’ সিস্টেম করলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে। এই কাজের দায়িত্ব তিতাসের আগেও ছিল। কিন্তু করেনি, কেউ জবাবও চায়নি। মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য এই কাজটি করা বেশি জরুরি।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মোহাম্মদ আল মামুন বলেন, অবৈধ গ্যাস সংকট একটি বড় সমস্যা। বিশেষ অভিযান চালিয়ে তিতাসের আওতাধীন এলাকায় আগামী দুই মাসের মধ্যে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। কাজটি কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব নয়। ইতোমধ্যেই আমরা কাজ শুরু করেছি। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমআই