মঞ্চে ও ছোটপর্দায় আসছে ‘ইনডেমনিটি’ নাটক

আগের সংবাদ

এমন রাত আগে দেখেননি কোহলি

পরের সংবাদ

আরব ভাইরা ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াবে না কেন?

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ , ৬:১২ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ , ৬:২৪ অপরাহ্ণ

রাজনৈতিক ঘটনা বোধহয় ফিলিস্তিনিদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই। তা না হলে ট্রাম্পের মতো ধুরন্ধর বৃহৎ ব্যবসায়ী গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও মার্কিনি নির্বাচনী পদ্ধতির ফাঁকফোকরে এবং শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের টানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কীভাবে? কিন্তু হয়েছেন ঠিকই। এবারো তেমন সম্ভাবনা কম নয় বহু বিতর্কিত ‘ফ্লোরিডা’ ফ্যাক্টরের মাধ্যমে। যে কৌশলে জর্জ বুশ জুনিয়র গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আলগোরকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত।

ফিলিস্তিনিদের যাযাবর অবস্থার অবসান ঘটাতে স্বাধীন ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র’ গঠন অপরিহার্য। এ উদ্দেশ্যে তাদের লড়াইটা দীর্ঘদিনের। স্বাধীন ইসরাইলি রাষ্ট্র গঠনের পর এটা আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে ইঙ্গ-মার্কিন প্রমুখ সাম্রাজ্যবাদী বলয় তাদের পক্ষে না থাকলেও আরব দুনিয়া এক সময় তাদের পক্ষে ছিল। এমনকি ভারতসহ গণতন্ত্রী তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ তাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিল। যে কারণে ইসরাইলের সঙ্গে তাদের অনেকে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি, এমনকি ভারতও। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।

কিন্তু স্বার্থ প্রায়ই নীতিনৈতিকতা ও মানবিকবোধকে ছাড়িয়ে যায়। তাই ফিলিস্তিনি স্বার্থের পক্ষে তৃতীয় বিশ্বের ওই উদারনৈতিক ঐক্যে চিড় ধরে। এর বড় কারণ সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক-কূটনৈতিক স্বার্থের টান। সে ক্ষেত্রে ইঙ্গ-মার্কিন, বিশেষ করে মার্কিনি কূটনীতির ভূমিকাই ছিল প্রধান।

গণতন্ত্রী বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে ভারত এ ব্যাপারে তার অবস্থান পরিবর্তন করে মার্কিনি সহযোগিতার টানে। পাকিস্তান অবশ্য জন্মলগ্ন থেকে মার্কিনি তাঁবেদারি করা সত্তে্বও এ বিষয়ে তাদের পূর্ব ভ‚মিকায় অনড় থাকে। কিন্তু বড় বিস্ময়কর ঘটনা হলো ইসরাইলের ফিলিস্তিনিবিরোধিতার অন্যায়-অনাচার সত্তে¡ও আরব দুনিয়া, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ফিলিস্তিনি স্বার্থের পক্ষে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা গ্রহণ করেনি।

আরব লীগ বা ওআইসি যদি তাদের তেল ক‚টনীতি নিয়ে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে একাট্টা হয়ে ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থের মোকাবিলা করত তাহলে সমস্যার সহজেই সমাধান হতো। কিন্তু তারা তা করেনি। বিশেষ করে এ ব্যাপারে সৌদি আরবের ভ‚মিকা নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ। সৌদি জোট ইঙ্গ-মার্কিনি স্বার্থের সঙ্গে এতটাই আঁতাতে জড়িত যে তারা ফিলিস্তিনি আরবদের স্বার্থ অনায়াসে বিকিয়ে দিয়েছে। দিয়েছে তাদের অনুসারী রাজ্যগুলো। তার ফলে ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা বেড়েছে, সমস্যার সমাধান দূরে থাকে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন স্বপ্নের বা কল্পনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

দুই.
রাজনৈতিক ঘটনা বোধহয় ফিলিস্তিনিদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই। তা না হলে ট্রাম্পের মতো ধুরন্ধর বৃহৎ ব্যবসায়ী গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও মার্কিনি নির্বাচনী পদ্ধতির ফাঁকফোকরে এবং শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের টানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কীভাবে? কিন্তু হয়েছেন ঠিকই। এবারো তেমন সম্ভাবনা কম নয় বহু বিতর্কিত ‘ফ্লোরিডা’ ফ্যাক্টরের মাধ্যমে। যে কৌশলে জর্জ বুশ জুনিয়র গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও প্রতিদ্ব›দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আলগোরকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত। আলগোর সুবিচারের জন্য আদালত পর্যন্ত গিয়েও শেষ পর্যন্ত মার্কিনি নির্বাচনী ঐতিহ্য মেনে পিছিয়ে এলেন, স্বীকার করে নিলেন অন্যায় পরাজয়।

যাই হোক, এই ট্রাম্প দুর্বোধ্য কারণে ভয়ানক রকম ইসরাইল-অনুরাগী। এর পেছনে কোনো অর্থনৈতিক তথা গোপন বৈষয়িক ‘স্বার্থ’ লুকানো আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। শুধু প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে তার ইসরাইল প্রীতির কারণে তিনি ফিলিস্তিনি স্বার্থের বিরোধী। তাই কট্টর জাতীয়তাবাদী ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যখন অন্যায়ভাবে, অনেকটা জবরদস্তি করেই বিতর্কিত জেরুজালেমকে ক্ষুদ্র ইসরাইল রাষ্ট্রের রাজধানী ঘোষণা করেন, তখন ট্রাম্প জয়ধ্বনি তুলে তাকে সমর্থন জানান এবং সবাইকে আহ্বান জানান সেখানে তাদের দূতাবাস খুলতে। এ ঘটনা তখন সংবাদ মাধ্যমসহ সর্বত্র বিস্ময় ও চাঞ্চল্য এবং চমক সৃষ্টি করেছিল। বিস্ময়কর ঘটনা যে, আরব-দুনিয়া এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানাতে ব্যর্থ হয়েছে।

এহেন ট্রাম্প যে তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের টানে ইসরাইল তোষণের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রনৈতিক স্বার্থের সর্বনাশ ঘটাবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একদিকে তার ইরানবিরোধী রাজনীতি, অন্যদিকে সৌদি আরব তোষণ নীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনি অবস্থান সুদৃঢ় করার রাজনীতি-ক‚টনীতি ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য। সে ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি স্বার্থ চুলোয় যাক বা তাদের রাজনৈতিক সর্বনাশ ঘটুক, তাতে তার আসে যায় না। সাম্প্রতিক ঘটনা তেমন পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাদের নেপথ্য সহযোগিতায়, তা আমরা জানি। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের পক্ষে চাঞ্চল্যকর একটি ক‚টনৈতিক চুক্তি সম্পাদিত হলো। আর তা হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরাইলের চুক্তি। ফিলিস্তিনির সঙ্গে ইসরাইলের আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে এ চুক্তি রীতিমতো অবিশ্বাস্যই মনে হয়।

ট্রাম্প এ চুক্তিকে শুধু অভিনন্দনই জানাননি, তিনি এই দুই রাষ্ট্রীয় পক্ষে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাই নয়, সেখানে তিনি বক্তৃতাও করেছেন। তিনি এ চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে হোয়াইট হাউসে। অর্থাৎ গোটা ঘটনাটি মার্কিন প্রশাসন পরিচালিত।

তিন.
এখন এ চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় দেখার বিষয় একাধিক। প্রথমত মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর, যাদের অনেকে আগেকার অনড় ইসরাইলবিরোধী অবস্থান থেকে নমনীয় ভূমিকায় নেমে এসেছে। ফিলিস্তিনি আরবদের স্বার্থ তাদের কাছে আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। আরব জাতীয়তাবাদ জর্ডান নদী এবং প্রধানত নীল নদে ভেসে গেছে। অথচ মিসরকে রাজতন্ত্রী শাসন থেকে মুক্ত করে সেনা কর্মকর্তা গামাল আবদুর নাসের ঐক্যবদ্ধ আরব জাতীয়তাবাদের যে আহ্বান জানিয়েছিলেন পঞ্চাশের দশকে, তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল; বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি দেশে। ব্যতিক্রম সৌদি আরবসহ রাজতন্ত্রী দেশগুলো।

নাসেরের মৃত্যু পর তার উত্তরসূরি সেই মিসরকে বিকিয়ে দিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। পরবর্তী পর্যায়ে সেই মিসরই ইসরাইলের সঙ্গে প্রথম ক‚টনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে মার্কিনি ইঙ্গিতে। সঙ্গে জর্ডানের বাদশাহ তার দেশের পক্ষে। আদর্শ চ্যুতির চরম প্রকাশ ঘটায় মিসর এভাবে।

দ্বিতীয়ত দেখার বিষয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দেশ সৌদি আরব এ চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় কী ভ‚মিকা গ্রহণ করে। ইঙ্গ-মার্কিনি তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ইতোপূর্বেই দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের এবং আরব দুনিয়ার অনেক দেশই ইসরাইলের ফিলিস্তিনি গণহত্যা বা অনাচারে গুরুত্ব দিচ্ছে না, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্তটি ধরে রাখা দূরে থাক। দ্রæতই সময় বলে দেবে, ঘটনা কোন দিকে মোড় নেবে।

তৃতীয়ত ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতিক্রিয়া- আব্বাস এবং হামাসসহ। একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘মিত্র হারিয়ে ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি জনগণ’। এটাই স্বাভাবিক। দেখার বিষয় হামাস এবং আব্বাস ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ে প্রস্তুত কিনা- রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকে। আরো দেখার বিষয়, তৃতীয় বিশে্ব গণতন্ত্রী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া।

তবে এ চুক্তির বলে ইসরাইল যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরো কঠোর মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল, ‘চুক্তির দিনই ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা গাজায়’ (প্রথম আলো)। পাঠকের নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, চুক্তি শেষে ইসরাইল ফিলিস্তিনের প্রতি কী সহিংস মূর্তি ধারণ করবে। তখন ওরা দাঁড়াবে কোথায়?

এ ঘটনা লক্ষ্য করে আরব মধ্যপ্রাচ্য কি তাদের ভ‚মিকা নির্ধারণ করার কথা নতুন করে ভাববে?

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়