বিদ্যাসাগর : ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব

আগের সংবাদ

দুই নেত্রীই জেলে আছেন, দেশ চলবে কীভাবে

পরের সংবাদ

বাঙালির মনোলোকের নবরূপকার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ , ৫:৩৪ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ , ৫:৩৫ অপরাহ্ণ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাঙালির পক্ষে কখনোই বিস্মৃত হবার সুযোগ নেই। স্মরণযোগ্য ও শরণাপন্ন হবার মতো অনেক মনীষী থাকা সত্তে্বও যেমন সুযোগ নেই রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভুলে যাওয়া। এঁরা সবাই বাঙালির মানসলোকের বিবর্তনে বিশাল বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছেন। তাই এঁদের জীবতকালও ততকাল, যতকাল জাতি হিসেবে বাঙালির অস্তিত্ব টিকে থাকবে।

এঁরা যখন জন্ম নেন তখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা হারিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল। অবশ্য সেকালে সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্রের যুগের প্রেক্ষাপটে জনগণ, স্বাধীনতা ইত্যকার শব্দ হাস্যকর প্রহসন ছাড়া আর কোনো অর্থ বহন করতো না। কারণ রাজতন্ত্রে ব্যক্তির স্বতন্ত্র সত্তাবোধক কোনো অনুভ‚তিই ছিল না, জনগণ ও স্বাধীনতার ধারণা তো বহু দূরের কথা। ইউরোপে কয়েকশো বছরের সংগ্রামের ফসল রেনেসাঁ এবং শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্যক্তির মধ্যে স্বতন্ত্র সত্তার বোধন ও চৈতন্যোদয় ঘটলে জনগণ, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ইত্যকার শব্দগুলো কার্যকর হয়ে উঠে। ভারতবর্ষে এসব শব্দ, ধারণা ও বোধগুলোর আগমন ঘটে শাসক ইংরেজের বদৌলতে। শাসনতান্ত্রিক প্রয়োজনেই তারা এগুলো ভারতবর্ষে আমদানি করতে বাধ্য হয়। তারা এটা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিল যে শাসন করতে গেলে শাসিতকে সঙ্গী, সহযোগী এবং উপযোগী করে তোলা জরুরি। কিন্তু তারা এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল যে এ বিদ্যা গুরুমারা বিদ্যাও হয়ে উঠতে পারে। বস্তুত রেনেসাঁ ইউরোপে উদার, রোমান্টিক, কল্পনাপ্রবণ ও মানবিকবোধসম্পন্ন মূল্যবোধ এবং শিল্পবিপ্লব বস্তুতান্ত্রিক, বাস্তববাদী জীবনধর্ম ও বিজ্ঞানচেতনা এবং প্রযুক্তিনির্ভরতাকে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনাদর্শ ও আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ইংরেজ শাসক জেনে অথবা না জেনে এ বিদ্যাকেই ভারতবর্ষে শিক্ষার বিষয় হিসেবে চালু করে। এর ফল দাঁড়ায় এই যে অচিরেই এখানে শাসক ইংরেজকে গলাধঃকরণের জন্য অজস্র ফ্রাংকেস্টাইন তৈরি হয়। ইংরেজ প্রবর্তিত এ শিক্ষা ভারতবর্ষে অসংখ্য আত্মসচেতন আধুনিকমনস্ক মানুষের জন্ম দেয়, যারা হাজার হাজার বছরের পুরনো চিন্তার খোলনলচে পাল্টে নতুন চেতনার আলোয় ভারতবর্ষকে উদ্ভাসিত করে তুলেন, শেষতক যা ভারতবাসীকে স্বাধীনতার বোধোদ্বোধিত, ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে জাতীয়তাবাদী এবং রক্তদান ও নেয়ায় প্রতিজ্ঞাদীপ্ত করে তুলে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এরকম একটি প্রতিবেশের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন। সঙ্গতভাবেই তাই তার সময়কাল হয়ে উঠেছিল ভারতবাসীর বিশেষ করে বাঙালির চিন্তা ও চেতনার রূপান্তরের কাল। তিনি বর্ণিত নবজাতকের একজন মাত্র নয়, ছিলেন তাদের নেতা। নতুন প্রজ¦লিত আলোর দীপাধারটি ধরে যারা ঘরে ঘরে আলো পৌঁছে দিয়েছেন তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম দিশারি।

প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও মেধার অধিকারী বিদ্যাসাগর একই প্রাচ্য তথা প্রাচীন ভারতীয় এবং প্রতীচ্য অর্থাৎ ইউরোপীয় এ দু’ধরনের বিদ্যাই অর্জন করেছিলেন। টোল-চতুষ্পাঠীর শিক্ষার ভিত তাঁর ব্রাহ্মণ বাবার কাছ থেকে নিলেও এর মূল ও বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন সংস্কৃত কলেজে বিদ্যা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। আর ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষা ইংরেজি স্কুল ও কলেজ থেকে। তাঁর মতো সে সময়ের অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিই একইভাবে এমনকি শুধু ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও এখন যেমন অনেকেই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়েও ধর্মান্ধ জঙ্গি হয়ে উঠছে তেমনি গুরুতর ও ঘোরতর প্রাচীনপন্থি, রক্ষণশীল, গোঁড়া-ধর্মান্ধই থেকে গেছেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর তেমনটা হননি, বরং আমূল পাল্টে মানুষ হয়ে উঠেছেন। চিন্তার জড়তা, যুক্তির স্থবিরতা, আচারের অসারতার বাইরে মুক্তচেতন, মানবিক, সাহসী, দয়ার্দ্রচিত্ত মানুষে পরিণত হয়েছেন।

দুই. বিদ্যাসাগর বাঙালিকে সবচাইতে বড়ো উপহারটা দিয়েছেন বাংলা গদ্যভাষার বিপুল উন্নতি ঘটিয়ে। কাজটা তিনি শুরু করেছিলেন দায়ে পড়ে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ ও সংস্কৃত কলেজে শিক্ষকতা করার সময় বাংলা গদ্যভাষায় পাঠ্যপুস্তক ও সাহিত্য গ্রন্থের প্রবল অভাব বোধ থেকে। যেমনটা ঘটেছিল ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে চালু বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্রদের বেলায়। পাঠ্যবই রচনা করতে গিয়ে তিনি বাংলা গদ্যের দুরবস্থা দূর করতে ইংরেজি ভাষার আদলে যতিচিহ্নের ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর আগে বাংলা গদ্যের সাহিত্যিক ব্যবহার না থাকায় ও শুধুমাত্র দৈনন্দিন কথন-প্রয়োজন, চিঠিপত্র ও দলিল দস্তাবেজে সীমাবদ্ধ থাকায় এর লেখ্যরূপে যতিচিহ্নের তেমন প্রয়োজন অনুভ‚ত হয়নি। রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ নিবারণ বিষয়ক যুক্তিতর্ক সম্বলিত লেখাগুলোয় এর প্রমাণ মেলে। এ ধরনের লেখাকে স্টেশনহীন সমান্তরাল দূরগামী রেললাইনের সাথে তুলনা করা চলে। অথচ কথা বলার সময় কথাকে অর্থবহ, প্রাঞ্জল ও পাঠকের বোধের সীমানায় পৌঁছে দিতে আমাদের থামতেই হয়। এ বিরতি স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। কখনো তা সরলরৈখিক হয় না; কখনো হ্রস্ব, কখনো দীর্ঘ হয়। কখনো অর্ধ, কখনো সামান্য, কখনো পূর্ণচ্ছেদ ঘটে। এ চ্ছেদগুলোর জন্য ভিন্নাঙ্গিকের চিহ্নের প্রয়োজন। তাছাড়া জগতের যাবতীয় বস্তু, প্রকৃতির বিবিধ উপাচার; মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণীর বিচিত্র আচরণ মানুষের মধ্যে নানাবিধ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

গদ্যভাষাও যে শিল্পের, সাহিত্যের উপকরণ হতে পারে বাংলাভাষায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তা প্রথম প্রমাণ করেন। তাঁর আগে গদ্যের ব্যবহার প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটানোর নীরস মাধ্যম হিসেবেই হতো। দৈনন্দিন কথাবার্তা, চিঠিপত্র দলিল-দস্তাবেজের বাইরে এর কোনো সাহিত্যিক ব্যবহার ও মূল্য ছিল না। যদিও মানুষের মনের কথাটি গদ্যেই সবচেয়ে সুচারু, সাবলীল, বিস্তৃত, ব্যাখ্যাযোগ্য ও শিল্পীত করে ব্যবহার সম্ভব, তবু শিল্পবিপ্লবের আগে যন্ত্রের যন্ত্রণা ও জীবনযাত্রার জটিলতার অনুপস্থিতির কারণে হাজার হাজার বছর ধরে সাহিত্য শুধু কাব্যনির্ভর হয়েছে এবং মনের বিশদ, স্বচ্ছ ও স্বচ্ছন্দ ভাব প্রকাশের এ সৃষ্টিভঙ্গিটি অনুপলব্ধ ও উপেক্ষিত থেকে গেছে। শিল্পবিপ্লব পরবর্তী যান্ত্রিক অভিজ্ঞতাই লেখকদের গদ্যকে সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শিখিয়েছে। বিদ্যাসাগর এটি প্রথম অনুভব করেন এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুকরণে বাংলাভাষায় এর প্রয়োগ করেন। গদ্য ভাষায়ও যে ছন্দ আছে, অন্তর্গূঢ়, সুপ্ত স্পন্দন ইংরেজিতে যাকে রিদম বলে তা আছে বিদ্যাসাগর তা আবিষ্কার করেন এবং তাঁর লেখা সাহিত্যে প্রয়োগ করেন। এটা ভাষাকে স্পন্দিত, ঝংকৃত করে ভাষার শক্তি ও ঐশ্বর্যকে উন্মুক্ত ও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এজন্য তিনি প্রধানত বেছে নেন সাহিত্যের অনুবাদ মাধ্যমকে। সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষার কিছু কালজয়ী সৃষ্টি কাব্য ও নাটককে বাংলায় রূপান্তর করে তিনি কালজয়ী করে তুলেন। আর সে রূপান্তর মুহূর্তেই মৌলিক রচনা হয়ে উঠে। যারাই পাঠ করেছেন তাঁর অনূদিত শকুন্তলা, সীতার বনবাস, আর ভ্রান্তি বিলাস একবাক্যে সবাই এটা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে দেশকালপাত্রের সীমানা ডিঙিয়ে সমকালীন দেশজ আবহে এসব রচনার নবরূপায়ণ ঘটেছে। ভাষার লালিত্য, সৌন্দর্য ও রস সংযোজনায় এগুলো অনবদ্য চিরন্তন সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত হয়েছে। যদিও তাঁর বন্ধু রাজশেখর বসুর অকালপ্রয়াত শিশুকন্যা প্রভাবতী যাকে তিনি অতিশয় স্নেহ ও আদর করতেন, ভালোবাসতেন তার অকাল মৃত্যুতে তিনি ভীষণভাবে মুষড়ে পড়েন এবং তাকে নিয়ে ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’ নামে একটি ছোট্ট বেদনাবিধুর গল্প লেখেন সেটি ছাড়া তাঁর আর কোনো মৌলিক রচনা নেই, তবুও অনুবাদগুলোই নিঃসন্দেহে তাঁর মৌলিক রচনার দাবিদার।

ভারতবর্ষে হিন্দুধর্মে বহুকাল ধরেই ধর্মের নামে নানা অনাচার চলে আসছিল। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা নামে এর একটার মূল উৎপাটন করলেও বিধবাদের বিয়ে নিষিদ্ধের মাধ্যমে অন্য আরেকটা বহাল তবিয়তে চালু ছিল। বিদ্যাসাগর এটা নির্মূল করার জন্য একটা পুস্তিকা লিখে এর সপক্ষে ধর্মীয় যুক্তি এবং এর অমানবিক দিকটি উল্লেখ করে ভারত সরকারের কাছে একটি আইনি বৈধতা দেয়ার দাবিতে আইন সভায় উপস্থাপন করলে রক্ষণশীল ধর্মরক্ষকশ্রেণি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। এটাকে তারা গর্হিত, ধর্মবিরোধী অনাচার হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রবল বিরোধিতায় নেমে পড়ে এবং পাল্টা প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পেশ করে। বিদ্যাসাগর এই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হন গদ্যভাষায় রচিত যুক্তিনির্ভর, তীব্র শ্লেষমিশ্রিত তীক্ষ্ম ব্যঙ্গবিদ্রুপাত্মক রচনাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। অল্প হইল, অতি অল্প হইল, আবার অতি অল্প হইল নামের এসব লেখায় তিনি ভট্টাচার্য মশাইদের বাক্যবাণে জর্জরিত করেন এবং প্রমাণ করে দেন যে বিধবা ধর্মসম্মতই শুধু নয়, বরং তাদের এতাবৎকালের এই বিশ্বাস ও কর্মযজ্ঞ অকাল বিধবা অল্পবয়সী মেয়েদের অধিকার হরণ করে তাদের সাধ-আহ্লাদ, জীবনোপভোগ ও স্বাধীন ইচ্ছা ও সত্তাকে পিষে মেরে ফেলা। এটা অমানবিক, বর্বর প্রথা। শেষতক প্রাচীন ভাঁড়গুলো রণে ভঙ্গ দেয় এবং আইনটি পাস হয়ে যায়। বিদ্যাসাগর উদাহরণ হিসেবে তাঁর নিজের ছেলের সাথে বিধবার বিয়ে দিয়ে মানবিক উদাহরণ স্থাপন করেন। তাঁর এই অবদান বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় ও তাদের অকাল বিধবা মেয়েদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে উপস্থিত হয়।

পুরো উনিশ শতক জুড়ে বাংলায় যে রেনেসাঁ সংঘটিত হয়েছিল বিদ্যাসাগরকে অবলীলায় তাঁর নেতা বলা যায়। এ রেনেসাঁর মূলে ছিল পশ্চিমা বা ইউরোপীয় শিক্ষা। যার চরিত্র এ লেখায় আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিদ্যাসাগর এ শিক্ষা বিস্তারে বিশাল ভ‚মিকা রেখেছেন। সংস্কৃত কলেজে শিক্ষকতা করার সময় এ কলেজের সংস্কারে উদ্যোগ নিলে কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং তিনি এ কলেজের চাকরি ছেড়ে দেন।

ব্যক্তি হিসেবে তিনি সাহসী, উদার ও দয়ার্দ্রচিত্তের মানুষ ছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের আর্থিক সংকটে অকাতর সাহায্য করেছেন। নবীন চন্দ্র সেন তাঁর সহযোগিতায়ই শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বিদ্যাসাগরকে বাঙালি তাই অনন্ত আশীর্বাদ হিসেবে চিরকাল মনের মণিকোঠায় জায়গা দিয়ে রাখবে।

এসআর

মন্তব্য করুন

যে মন্তব্যগুলো খবরের বিষয়বস্তুর সাথে মিল আছে এবং আপত্তিজনক হবে না সেই মন্তব্যগুলোই দেখানো হবে। প্রকাশিত মন্তগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত। পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য ভোরের কাগজ লাইভ কোন দায়ভার গ্রহণ করবে না।

জনপ্রিয়