ইউরোপীয় ক্লাব হোক ‘প্রীতিলতা স্মৃতি জাদুঘর’

আগের সংবাদ

সবার অগোচরে অর্থবিত্তের বৈভব

পরের সংবাদ

প্রগতির সঙ্গে ইসলামের বিরোধ নেই

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ , ৮:৫৮ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ , ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

আল্লামা শাহ আহমেদ শফীর সঙ্গে আমার প্রবল মতভিন্নতা ছিল। বিভিন্ন সময়ে তার নানা বক্তব্য এবং অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছি আমি। মৃত্যুর পরও তার সম্পর্কে আমার অবস্থান বদলায়নি। তবে যতই মতবিরোধ থাকুক, তার এমন অপমানের এবং অসহায় মৃত্যু আমি চাইনি। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী কওমি নেটওয়ার্কের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন। কিন্তু তাকে বিদায় নিতে হয়েছে বড় করুণভাবে। ১০৪ বছর বয়সে কারো মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যেভাবে তার ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, তাকে দিয়েই তার ছেলে আনাস মাদানীকে বহিষ্কারের আদেশ অনুমোদন করানো হয়েছিল, অসুস্থ হলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে দাবি আদায়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল; তা বেদনাদায়ক। সব দাবি আদায়ের পরই কেবল গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। এমনকি চট্টগ্রাম থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনার ক্ষেত্রেও বাধা দিয়ে তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করা হয়েছিল। আল্লামা শফীর সঙ্গে যা হয়েছে তা দুঃখজনক, বেদনাদায়ক ও অনাকাক্সিক্ষত। হাটহাজারী মাদ্রাসায় যা হয়েছে, তা রীতিমতো ক্যু। আর প্রবল দাপুটে আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে এই ক্যুয়ে আড়াল থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একসময় তার ডানহাত জুনায়েদ বাবুনগরী। একসময় সবাই ধরে নিয়েছিলেন বাবুনগরীই হবেন আল্লামা শফীর উত্তরসূরি। হাটহাজারী মাদ্রাসায় তিনি ছিলেন দ্বিতীয় প্রধান। হেফাজতে ইসলামেরও মহাসচিব ছিলেন তিনি। কিন্তু আস্তে আস্তে জুনায়েদ বাবুনগরীকে সবকিছু থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। অনেকেই বলেন, হেফাজতে ইসলামের দুটি ধারা। আল্লামা শফীর নেতৃত্বাধীন ধারাটি অনেকটাই সরকারপন্থি, আর বাবুনগরী বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে এসব বলে আল্লামা শফী আর বাবুনগরীর দ্ব›দ্বকে আদর্শিক আবরণ দেয়ার চেষ্টা করা হলেও দ্ব›দ্বটা আসলে স্বার্থের, জাগতিক প্রাপ্তির। ২০১৩ সালের ৫ মে আল্লামা শফীর ডাকে কয়েক লাখ মানুষ মতিঝিলে সমবেত হয়েছিলেন। তারা তখন সরকার পতনের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার সে রাতেই শাপলা চত্বর খালি করে দেয়। কয়েক লাখ লোককে সমবেত করার যে ক্ষমতা, তা দিয়ে আল্লামা শফী সরকারের সঙ্গে বার্গেইন করেছিলেন, বাণিজ্য করেছিলেন। নগদ টাকা, রেলের জমির নানা কথা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। তবে জাগতিক সে বিনিময়ের ভাগ হেফাজতে ইসলাম বা অন্য কেউ পাননি। আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানীই পুরো সুবিধাটা পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। আর মূল দ্ব›দ্বটা এখানেই। সরাসরি আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে নয় হাটহাজারী মাদ্রাসায় সর্বশেষ ক্যু দৃশ্যত আনাস মাদানীর বিরুদ্ধে। অনেকে বলছেন, আল্লামা শফীর এই পরিণতির জন্য আসলে তার ছেলে আনাস মাদানীই দায়ী। বিশ্বের আরো অনেক মানুষের মতো আল্লামা শফীর পতনও হয়েছে সন্তান স্নেহে অন্ধ হওয়ার কারণে।

বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার ইতিহাস দেড়শ বছরের। তবে বরাবরই তারা রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছে। তবে ২০১০ সালে চট্টগ্রামে কওমি মাদ্রাসার নেতারা হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠন বানিয়ে প্রথম আলোচনায় আসেন। হেফাজতে ইসলামের প্রথম অবস্থান ছিল শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। পরের বছর তারা নারী উন্নয়ন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তবে হেফাজতে ইসলামের উত্থান এবং পতন ঘটেছে ২০?১৩ সালের ৫ মে। ১৩ দফা দাবিতে তারা মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। দিনভর তাণ্ডব চালায়। হেফাজতের সেই ১৩ দফা ছিল দেশকে অন্ধকারে ফিরিয়ে নেয়ার দাবি। দেশের অগ্রগতি রুখে দেয়ার দাবি। তবে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সরকার পতন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থানের ঘোষণা থাকলেও সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে রাতেই শাপলা চত্বর খালি করে দেয়। এক ডাকে কয়েক লাখ লোককে ঢাকায় আনার শক্তিটা হলো তাদের উত্থান এবং রাতেই লেজ গুটিয়ে পালানোটা হলো তাদের পতন। যার ডাকে সারাদেশের কওমি শিক্ষার্থীরা মতিঝিলে এসেছিলেন, সেই আল্লামা শফী নিজেই সমাবেশে আসেননি। এটা হলো বড় নৈতিক পরাজয়।

তবে সরকার হেফাজতে ইসলামের শক্তিকে উপেক্ষা করেনি। এতবড় শক্তিকে শত্রæ না বানিয়ে তাদের কাছে টেনে নিয়েছে। তবে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে গোটা জাতিকে। মূল্যটা নগদ টাকা বা রেলের জমি নয়। হেফাজতে ইসলামের দাবি অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক বদলানো হয়েছে, ভিন্নধর্মী লেখকদের লেখা বাদ দেয়া হয়েছে, হাইকোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে হেফাজত বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র বানানোর দিকে এগিয়ে নিয়েছে। দায়িত্ব ইসলামকে হেফাজত করা হলেও আসলে এই সংগঠনটি বাংলাদেশে ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণকে ইসলামবিরোধী বলে অপপ্রচার চালিয়েছে। বøগারদের ঢালাওভাবে নাস্তিক বলে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের নেতারা ইসলামকে রক্ষার নামে দিনের পর দিন বিদ্বেষ, হিংসা, সহিংসতা ছড়িয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শফী বলেছিলেন, ‘নাস্তিকরা তোমরা মুরতাদ হয়ে গেছো, তোমাদের কতল (হত্যা) করা আমাদের ওপর ওয়াজিব হয়ে গেছে।’ প্রকাশ্যে এমন ঘোষণা দিয়েও বহাল তবিয়তেই ছিলেন আল্লামা শফী। আমার বিবেচনায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শফী আসলে ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামের বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি ভুল ইসলাম প্রচার করেছেন। তার প্রচারিত ইসলাম ইসলামের একটা ভয়ঙ্কর ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল। অথচ ইসলাম শান্তির কথা বলে, ভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্মকে স্বাগত জানায়। আল্লামা শফীদের প্রচারিত ইসলামের সঙ্গে সত্যিকারের ইসলামের ফারাক অনেক।

কওমি নেটওয়ার্কের সঙ্গে মূলধারার যে বিচ্ছিন্নতা তার দায় দুপক্ষেরই আছে। অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি হতে চায়, এমপিওভুক্তি হতে চায়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসায় উল্টো। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আনতে পারেনি। কওমি নেতারা কোনোভাবেই চান না, নিয়ন্ত্রণটা তাদের হাতছাড়া হয়ে যাক। কারণ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে, তাদের বার্গেইন ক্ষমতাও শূন্য হয়ে যাবে। তাই তারা জনগণের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেরা স্বাধীনভাবে চলতে চায়। আবার আমরাও মাদ্রাসা শুনলেই জঙ্গি, মৌলবাদী, দাড়ি-টুপি দেখলেই রাজাকার এমন বলে বলে তাদের দূরে ঠেলে রেখেছি। ইসলাম একটি আধুনিক ধর্ম। প্রগতির সঙ্গে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে ঘরে আটকে রেখে যেমন দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আবার কওমি নেটওয়ার্কের কোটি সদস্যকে পেছনে রেখেও এগিয়ে যাওয়াও উচিত নয়। ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে পুলিশের তাড়া খেয়ে পালাতে থাকা কিশোরদের ভয়ার্ত চোখ দেখে কষ্টে আমার বুক ভেঙে গিয়েছিল। কেন এসেছে জানে না। বড় হুজুর বলেছে বলে হয়তো জীবনে প্রথম ঢাকা এসে সারাদিন অভুক্ত থেকে পুলিশের সঙ্গে মারামারি করেছে। রাতে যখন পুলিশ তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে, তখনো বড় হুজুরদের কেউ পাশে নেই। এভাবেই বারবার কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে। হাটহাজারী মাদ্রাসার সাম্প্রতিক সংঘাতেও শিক্ষার্থীরাই দাবার ঘুঁটি। কওমি নেতারা বারবার শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছেন নিজেদের স্বার্থে। কিন্তু তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কিছু করেননি। আমরাও কিন্তু এই অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করিনি। কিন্তু এই ৩০ লাখ শিক্ষার্থী তো আমাদেরই ভাই বা সন্তান। তাদের পেছনে রেখে আমাদের এগিয়ে যাওয়াটা অন্যায়। উন্নয়নযাত্রায় তাদেরও আমাদের পাশে নিতে হবে। দাবি জানাচ্ছি, সরকার যেন কওমি নেটওয়ার্কে হস্তক্ষেপ করে। তবে সেটা নেতিবাচক হস্তক্ষেপ নয়। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জীবনমান, পড়াশোনার কারিকুলাম উন্নয়নের মাধ্যমে যেন তাদের চোখ খুলে দেয়া হয়। তারা যাতে পড়ালেখা শেষে সব ধরনের প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বোঝাতে এই মাদ্রাসা আর বড় হুজুরই জীবন নয়। জীবনের আরো বৃহত্তর মানে আছে। জন্মের পর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করাটাই জীবন নয়। সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির সেরা জীব করে মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন আরো বড় কাজ করার জন্য, সভ্যতাকে মানবতাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য, মানুষের কল্যাণ করার জন্য। তারা যেন পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, সাহিত্য-শিল্পের রস আস্বাদন করতে পারে। তারা যেন ভিন্নমতকে ধারণ করতে শেখে, কতল নয়। নারীদের যেন তারা ভালোবাসে, মর্যাদা দেয়; অন্তত তেঁতুল যেন মনে না করে।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।
[email protected]

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়