স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক শত কোটি টাকার মালিক

আগের সংবাদ

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি

পরের সংবাদ

কী শিক্ষা দিল করোনা

মহামারি মোকাবিলায় বাড়াতে হবে সক্ষমতা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ , ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ , ১:১২ অপরাহ্ণ

মহামারি কিংবা অতিমারির কবলে বহুবার পড়েছে মানুষ। বিপন্ন হয়েছে জনস্বাস্থ্য। অনেক উন্নত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও ধরাশায়ী হয়েছে এর তাণ্ডবে। শত বছর আগে ম্যালেরিয়া, যক্ষা, কুষ্ঠ, ইনফ্লয়েঞ্জা, গুটিবসন্তসহ ভয়ঙ্কর কিছু ভাইরাস মহামারি রূপ নিয়েছিল। এসব মহামারি প্রাণ কেড়েছে বহু মানুষের। এরপর দেখা দেয় ইবোলা, নিপাহ, সার্স, মার্স। সর্বশেষ কোভিড-১৯ এর মতো সংক্রামক রোগ মহামারি থেকে অতিমারি রূপ নিলে হুমকির মুখে পড়ে জনস্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাসহ নানা অসঙ্গতির কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারায়। কোভিড-১৯ এর তাণ্ডবে এখনো কাঁপছে বিশ্ব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ অসংখ্যবার মহামারির মুখোমুখি হয়েছে এবং ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মহামারি প্রতিরোধ শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ নয়। এর জন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের উপযুক্ত উদ্যোগ নিতে হয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হয়। রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দিতে হয়। বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানকে মাঠপর্যায়ে কাজে লাগাতে হয়। মহামারির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে লড়াই করতে হয়। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি না করে মহামারি মোকাবিলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর প্রমাণ কোভিড-১৯ দিয়েছে। আগামীতে আরো ভয়াবহ কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়তো হতে হবে। তাই মহামারি মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ ভোরের কাগজকে বলেন, এতদিন মনে করা হতো সংক্রামক ব্যধি কমে গেছে। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি প্রমাণ করেছে তা সত্য নয়। অপ্রিয় হলেও এটা সত্য যে সংক্রামক ব্যাধি চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে দুর্বলতা আছে। মনে রাখতে হবে, সংক্রামক ব্যাধি কখনো শেষ হবে না। এর হুমকি সব সময় থেকে যাবে। আবার নতুন একটা ভাইরাস যে আসবে না, তা কিন্তু কেউ বলতে পারে না। ৫০টির বেশি জীবাণুর নাম পাওয়া যাবে যেগুলো নিয়ন্ত্রণ দুরূহ। সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে অত্যাধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে রোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা। আমরা প্রতিরোধে এগিয়েছি, কিন্তু অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা সংক্রামক রোগ নির্ণয়ে ও চিকিৎসায় কিছুটা পিছিয়ে আছি। আমরা কিন্তু কেবল সার্বজনীন চিকিৎসাসেবা নয়, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) গুণগত চিকিৎসা দেয়ার কথা বলেছি। তাই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে সংক্রামক ব্যাধি অধ্যয়ন, নির্ণয় ও চিকিৎসা- তিনটিরই পদ্ধতিগতভাবে ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

পাবলিক হেলথ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মুনীর ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসাই মুখ্য। প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা মহামারি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো ও নীতিগতভাবে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জনস্বাস্থ্যর বিষয়টি উপেক্ষিত। জনস্বাস্থ্যর বিষয়টি উপেক্ষিত রেখে মহামারি প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ধারণার যে খোল সেই ধারণা বদলানোর সময় হয়েছে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধে আমাদের দেশের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গবেষণা কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলাফল এখনো আসেনি। তবে আমার কাজের অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি তাহলে বলব আমাদের মহামারি প্রতিরোধে সক্ষমতা আছে। তবে নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে সেই সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। তার মতে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অবকাঠামোগত সুবিধা খুবই ভালো। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এই সুবিধা রয়েছে। এছাড়া চর, হাওর একং পার্বত্য অঞ্চলের কিছু এলাকাবাদে দেশের যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও অনেকক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এখাতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ জনবল আছে। মহামারি মোকাবিলায় এগুলো অনেক বড় ভ‚মিকা রাখে। তবে এসব ক্ষেত্রে বড় সমস্যা মন্ত্রণায়। বিশিষ্ট এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সেনাপতি হচ্ছেন মন্ত্রী। সেনাপতি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করলে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং এই খাতে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগ্য প্রতিনিধি না থাকায় এই খাতের সক্ষমতা বাড়ছে না।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির এক সদস্য ভোরের কাগজকে বলেন, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে সময়মতো পদক্ষেপ নেয়ায় দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ এবং মৃত্যু কম হয়েছে। কিন্তু আমি বলব দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরুর আগে থেকে এখন পর্যন্ত সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা আমরা দেখাতে পারিনি। শুরু থেকে কমিটির সদস্যরা যেসব পরামর্শ ও সুপারিশ করেছেন তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বদলে আমলানির্ভর প্রশাসনিক পদ্ধতিতে আমরা কোভিড-১৯ মতো মহামারি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। জ্ঞান থাকা সত্তে¡ও আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। সম্পদের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি নেতৃত্বের দুর্বলতা আমাদের স্বাস্থ্য খাতে প্রকট।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোশতাক হোসেনও জানালেন একই কথা। তিনি ভোরের কাগজকে জানান, ২০১৬ সালে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে মহামারি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ১০ পয়েন্টের মধ্যে সাড়ে ৬ দেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা নেই তা বলা যাবে না। তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু তা পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। মহামারি নিয়ন্ত্রণে অনেকগুলো ম্যানুয়েল তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্তি¡ক জ্ঞান আছে। তবে সমন্বয়, সম্পদ ও জনবলের অভাব আছে।

মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. চিন্ময় দাস ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো অন্য দেশের তুলনায় অনেক ভালো যেখানে স্বাস্থ্যের শুরুটা হয় একেবারে বাড়ি থেকে; এখানে প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য ৩/৪ জন কর্মী যা খুব কম দেশেই আছে। রেফারাল সিস্টেমও খুব চমৎকার, মানুষের দোড় গোড়ায় কমিউনিটি ক্লিনিকসহ প্রতিটি সেক্টরে আছে সেবা কেন্দ্র। সমস্যা মূলত ব্যবস্থাপনায়। ঔপনিবেশিক আমলের ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে প্রয়োজন এদেশের মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে একটি জনবান্ধব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়