মহামারি মোকাবিলায় বাড়াতে হবে সক্ষমতা

আগের সংবাদ

চা বাগানে রাবারের বিকল্প কফি চাষে সাফল্য

পরের সংবাদ

৫৬ মামলার তদন্ত

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ , ৯:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ , ১২:১৮ অপরাহ্ণ

গত কয়েক বছরে আর্থিক খাতের অনিয়মের ঘটনাগুলোর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ছিল বহুল আলোচিত। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ৫৬টি মামলা দায়ের করলেও এখনো তদন্ত শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফলে আদালতে একটি মামলারও চার্জশিট দেয়া সম্ভব হয়নি। শিগগিরই তদন্ত শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই বলে জানা গেছে। যদিও স্বাধীন সংস্থাটির আইনে যে কোনো মামলার তদন্ত ৬ মাসের (১৮০ দিনের) মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঝুলে থাকা এসব মামলার তদন্ত শেষ করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।

২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ উঠে। এরপর অনুসন্ধানে নামে দুদক। অনুসন্ধান শেষে ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় ৫৬টি মামলা করে দুদক। পরের বছর আরো পাঁচটি মামলা করে স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানটি। ৬১টি মামলায় মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় বেসিক ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তা, ১১ জরিপকারী ও ৮২ ঋণগ্রহণকারী ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। বেসিক ব্যাংক দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। এর মধ্যে রয়েছেন ৮ জন ব্যবসায়ী, একজন সার্ভেয়ার ও ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের পাঁচ জন কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তাদের সবাই হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এখন কারাগারের বাইরে। এছাড়া আসামিদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। এসব মামলা করার পর পাঁচ বছর পূর্ণ হলেও এখনো আদালতে একটি মামলারও চার্জশিট দাখিল করেনি সংস্থাটি। শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করার কোনো সম্ভাবনাও নেই বলে জানা গেছে।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির মামলার কয়েকজন আসামির জামিন প্রশ্নে রুল শুনানিকালে উচ্চ আদালত ২০১৮ সালের ৩০ মে এসব মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন। আদালত বলেছেন, আপনাদের কথা শুনে লজ্জায় কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলতে ইচ্ছে করছে। দুদকের আইনজীবীর বক্তব্যের মধ্যেই আদালত তাকে বলেন, চার্জশিট দিচ্ছেন না কেন? এ ধরনের মামলায় আড়াই বছর লেগে গেল? তাহলে কেমনে হবে? উচ্চ আদালতের এই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশের পর আরো আড়াই বছর পার হলেও তাতেও কোনো কাজ হয়নি। টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের। আসামিদের সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশ প্রসঙ্গে তখন আদালত বলেছেন, আপনাদের নির্লিপ্ততার কারণে যেসব আসামি ভেতরে আছে তারাও বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে আপনাদের সখ্য আছে বলে মনে হচ্ছে। চার্জশিট দিতে দেরি করছেন, যাতে আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। আমরাও তাদের জামিন দিতে বাধ্য হচ্ছি।

এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বলেন, বেসিক ব্যাংক মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূলত আমরা টাকার উৎস ও গন্তব্যের সন্ধানে আছি। এটি খুঁজতে গিয়েই আমাদের বিলম্ব হচ্ছে। তাই আরো সময় লাগবে। তদন্ত শেষ হলে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে মামলাগুলোর তদন্ত কবে শেষ হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে হাইকোর্ট দুদককে নির্দেশনা দেন। এরপর বাচ্চুকে পাঁচবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। সেই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদেরও সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কেউই গ্রেপ্তার হননি। বরং তাদের বুক ফুলিয়ে চলাফেরার পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। জানা গেছে, সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সময় শেখ আবদুল হাই বাচ্চু দুই মেয়াদে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকলেও তাকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। শুধু তাই নয়, ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের কারো নামই আসামির তালিকায় নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ প্রস্তাব ত্রæটিপূর্ণ থাকায় ওই ৫৬ মামলা করা হয়। ওই সময়ের পর্ষদ সভায় খুব সহজেই প্রস্তাবগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। এর দায় তারা এড়াতে পারেন না।

জানা গেছে, পর্ষদের ১৩ সদস্যের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। এর আগে পর্ষদের সদস্য সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার, সাবেক বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বোস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক নিলুফার আহমেদ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও অর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কামরুন্নাহার আহমেদ, প্রফেসর ড. কাজী আখতার হোসেন, ফখরুল ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন, জাহাঙ্গীর আকন্দ সেলিম, এ কে এম কামরুল ইসলাম, আনোয়ারুল ইসলাম (এফসিএমএ), আনিস আহমেদ এবং এ কে এম রেজাউর রহমানকে জ্ঞিাসাবাদ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পর্ষদের ওইসব সদস্যই বেসিক ব্যাংকের তদন্তে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আত্মসাৎ করা টাকার প্রতিটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ওই সময়ের পর্ষদ। এ কারণে অর্থ আত্মসাতের পেছনে সে সময়ের প্রতিটি সদস্যের দায় রয়েছে। তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেই চার্জশিট দিতে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিলেও এখনো তদন্ত শেষ না হওয়ার দোহাই দিয়ে চার্জশিট দেয়া হচ্ছে না। দুদকের একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেছেন, বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালকদের মধ্যে বেশির ভাগই এখন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করাও এখন দুদকের জন্য চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুদকের তদন্ত থেকে জানা গেছে, ঋণ প্রস্তাবগুলো ছিল ত্রুটিপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ছাড়পত্র না নেয়া, জামানতের মূল্য যাচাই না করা, ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও ঋণের টাকা ফেরত দেয়ার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়নি। অধিকাংশ ঋণ গ্রহীতার কোনো ধরনের ব্যবসা ছিল না। কারো ক্ষুদ্র ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও ব্যাংক থেকে নেয়া কোটি কোটি টাকার ঋণ ফেরত দেয়ার সক্ষমতা ছিল না। ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ প্রস্তাবগুলোতে ওইসব তথ্য উল্লেখ করা হলেও পর্ষদ সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক দুদক কর্মকর্তা বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ত্রæটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের দায় পর্ষদ সদস্যদেরও নিতে হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধ করে কেউ পার পেতে পারে না।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়