করোনাকালে ১৭ হাজার ৩০৬ প্রতিষ্ঠানের পাশে অগ্রণী ব্যাংক

আগের সংবাদ

সিনেমায় অভিনয় করছেন সেলেনা গোমেজ

পরের সংবাদ

ভাঙতে হবে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি-সিন্ডিকেটের চক্র

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ , ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ , ১:২৯ অপরাহ্ণ

কী শিক্ষা দিল করোনা- ৩

দেশের স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। কোভিড-১৯ সংক্রমণের পর থেকেই এক এক করে এ খাতের দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসতে থাকে। মহামারির চরম মুহূর্তে তা যেন আরো বেড়ে যায়। বেপরোয়া হয়ে উঠে সিন্ডিকেট। পর্দা, বই ও বালিশকাণ্ডের ঘটনা থিতু হতে না হতেই মাস্ক-পিপিই, নমুনা পরীক্ষাসহ নানা কেলেঙ্কারি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এপ্রিলের মাঝামাঝিতে মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর বেকায়দায় পড়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) কর্তৃপক্ষ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপ। এন-৯৫ মাস্কের নামে তখন নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহ করা হয়। এপ্রিলে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষার জন্য অনুমতি পায় জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (জেকেজি) হেলথ কেয়ার। শর্ত অনুযায়ী সংগৃহীত নমুনা সরকার নির্ধারিত ল্যাবে পাঠাবে এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু করোনার রিপোর্ট জালিয়াতি ও সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগে ২৪ জুন জেকেজির অনুমোদন বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকার বিষয়টি জেনেও ২১ মার্চ ‘কোভিড ডেডিকেটেড’ হিসেবে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। র‌্যাবের অভিযানে কোভিড-১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট জালিয়াতি, রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর ৭ জুলাই হাসপাতালটির দুটি শাখা (উত্তরা ও মিরপুর) বন্ধ করার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এছাড়া কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে সম্মুখসারির যোদ্ধাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) নিয়েও দুর্নীতি হয়েছে। তাদের দেয়া হয়েছে নিম্নমানের পিপিই। এর ফলে অনেকেই করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। এসব দুর্নীতির সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ঠিকাদার, পিয়ন, সবাই জড়িত- এমন খবরই গণমাধ্যমে এসেছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য

বিভাগের সিন্ডিকেটের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বহুবার। এ কথা সরকারদলীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে সবাই স্বীকার করেন। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কোনো অস্তিত্ব নেই।

করোনাকালের আগেই ২০১৭ সালে টিআইবির খানা জরিপে শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে উঠে আসে স্বাস্থ্য খাতের নাম। জরিপে অংশ নেয়া ৪২ দশমিক ৫ ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। অপরদিকে ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করে। তার মধ্যে বেশি দুর্নীতি হয় কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহ খাতে। এছাড়া আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে দুদকের প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয় দুর্নীতি করার জন্য অনেক অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য নেই দক্ষ জনবল। ফলে দিনের পর দিন সেই সব যন্ত্রপাতি অব্যবহৃতই থেকে যায়। আর পড়ে থেকে নষ্ট হয়। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ করে দুদক। সেই প্রতিবেদন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে জমাও দেয়া হয়। কিন্তু বিষয়টি যে স্বাস্থ্য বিভাগ আমলেই নেয়নি তা করোনাকালে প্রমাণ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ আলো ফেলেছে দেশের স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যদশার ওপর। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বরাদ্দের শতকরা ৮০ ভাগই যায় দুর্নীতিবাজদের পেটে। সীমাহীন এই দুর্নীতির কারণে এ খাতের উন্নতি যে বাধাগ্রস্ত হয়েছে তা আবারো সামনে এসেছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি বন্ধের পাশাপাশি এ খাতের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে যেমন বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সময় এসেছে। অপর দিকে সরকারের পক্ষ থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও সেই অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতা নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব ভোরের কাগজকে বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবায় অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আছে দুর্নীতিও। স্বাস্থ্য খাতে যে নানা ধরনের দুর্নীতি চলছে, কমিশন বাণিজ্য চলছে তা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক অশনি সংকেত। এই চক্র ভাঙা না গেলে এবং ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা দূর করতে না পারলে বরাদ্দকৃত অর্থ জনগণের কাজে লাগবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে বলে মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের কথা; সেখানে আমাদের দেশে বিগত কয়েক দশক ধরে এই বরাদ্দ তার ধারেকাছেও নেই। উল্টো কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা চার শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। এত কম বরাদ্দের মধ্যেও দুর্নীতি থাবা বসায়। অর্থের অপচয়ও আছে। বরাদ্দের ক্ষুদ্র অংশই জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তাই এ খাত থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশাও করা যায় না।

বিএমএ মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরীও মনে করেন স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যদশার জন্য বাজেট স্বল্পতার পাশাপাশি দুর্নীতিও দায়ী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এই অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ভোরের কাগজকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দই মূল নয়। খরচ করতে না পারা, দুর্নীতির ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে না পারলে বরাদ্দ বাড়িয়েও খুব লাভ হবে না। বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এছাড়া এ খাতে যত পরিকল্পনা হয়েছে তা ছিল আমলানির্ভর। ফলে কোথায় কী এবং কী পরিমাণ প্রয়োজন তা সঠিকভাবে নির্ণয় হয়নি।

জুন মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার কথা। কিন্তু সমস্যার মূল যতটা গভীরে পৌঁছেছে সে পর্যন্ত যাওয়ার এবং প্রকৃত সত্য উন্মোচন করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা আদৌ আছে কিনা- তা নিয়েও প্রশ্ন আছে অনেকের মনে।

এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, ক্রয় ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় এই খাতে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি। করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে দুই ধরনের দুর্নীতি প্রকাশ হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুর্নীতি এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো খাতে দুর্নীতি। রিজেন্ট ও জেকেজির হাতে করোনা শনাক্তের পরীক্ষা ও চিকিৎসাকে ঘিরে যে ন্যক্কারজনক জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে তা স্বাস্থ্য খাতে লাগামছাড়া দুর্নীতির খুবই ছোট উদাহরণ। বাংলাদেশে এমন একটি সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে হাতেগোনা দুই একজনের বিরুদ্ধে দুদকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলো তৎপর হয়। অথচ দুর্নীতির মহাসমুদ্রে এসব চুনোপুঁটি ডুবে থাকা হিমশৈলের চূড়ামাত্র, দৃশ্যপট থেকে তাদের সরিয়ে দেয়ায় দুর্নীতির পেছনের মূল সংঘবদ্ধ চক্রটির কোনো ক্ষতি হয় না; বরং তাদের হাতেই দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়। চুনোপুঁটি নিয়ে টানাটানির সুযোগে বড় বড় রুই-কাতলারা আড়ালেই থেকে যায়। আর দুর্নীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে এত যে দুর্নীতি বা অনিয়ম হচ্ছে এ ব্যাপারে কখনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তাই এসব অপকর্মের সঙ্গে যারা জড়িত তারা বেপরোয়া। স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর যে সুযোগ কোভিড-১৯ সামনে এনেছে তা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হবে বলে মনে করেন তারা।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়