ভালো নেই গারো পাহাড়ের কোচ সম্প্রদায়

আগের সংবাদ

হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধে উষ্মা সংসদীয় কমিটির

পরের সংবাদ

পেঁয়াজের ঝাঁজ : অভিজ্ঞতা ও অভ্যাস

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ , ৮:০৩ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ , ৮:০৫ অপরাহ্ণ

ভারত কর্তৃক হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অস্থির ও আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা এবং বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির পর ভারতের মানুুষের মধ্যে আবেগ-উত্তেজনার যে উৎসাহব্যঞ্জক চেহারা দেখা গেছে তার তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘রাজনীতির’ (!) পক্ষে আরো একটু মানবিক হয়ে ওঠার পটভ‚মি তৈরি করে দেয়। আমরা মনে করি, সাধারণের দেহভঙ্গি দেখেও রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবকাশ থাকে।

গত বছর সর্বোচ্চ মূল্যে পেঁয়াজ কেনার ‘অভিজ্ঞতা’ আমাদের হয়েছিল। এ বছরও পেঁয়াজের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। তবে কি গত বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের প্রতি বছরের ‘অভ্যাসে’ পরিণত হতে চলেছে! প্রতি বছর বর্ষা আসে, বন্যা হয়। বর্ষা-বন্যার অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। বাড়তে বাড়তে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। গত বছর অন্যান্য নিত্যপণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাত্রাহীন বেড়ে গিয়েছিল পেঁয়াজের দাম। এবারো বর্ষা এসেছে, বন্যা এসেছে। চারদিকে থৈ থৈ পানি আর পানি দেখেছি। দেখেছি মানুষের অথৈ দুর্ভোগ। চারদিকে পানি কিন্তু এরই মধ্যে পেঁয়াজের বাজারে ক্রমবর্ধনশীল দাউ দাউ ‘আগুন’!

প্রতি বছর বন্যার কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ে, এবারো বেড়েছে। এমনকি একদিনেই কয়েক দফা দাম বৃদ্ধির খবরও আমরা শুনেছি! গত বছরও ঠিক এ রকম মৌসুমেই পেঁয়াজ এতই মূল্যবান ও মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছিল যে, সাধারণ মানুষ পেঁয়াজের সঙ্গে সহজে সাক্ষাৎ করতে পারেনি। পেঁয়াজকে কেন্দ্র করে আমরাও আবার নানা মাত্রিক ‘ডিসকোর্স’ শুরু করে দিয়েছিলাম। এবারো পেঁয়াজ-আলোচনা, পেঁয়াজ-বিতর্ক অর্থাৎ ‘পেঁয়াজ ডিসকোর্স’ গণমাধ্যমে প্রাণ সঞ্চার করে চলেছে। পেঁয়াজই আমাদের সব গণমাধ্যমকে ব্যস্ত রাখছে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের গত কয়েক দিনের অপতৎপরতায় সাধারণ মানুষ দিশাহারা ও বিভ্রান্ত হয়েছে। তারাও ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ থেকে মজুতের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেছে। গুদামভর্তি পেঁয়াজ থাকা সত্তে¡ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কর্পূরের মতো হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে সব পেঁয়াজ! ফলে পেঁয়াজ নিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে ভোক্তা অধিকার সংস্থা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রায় সবারই। ব্যস্ততা বেড়ে গেছে গণমাধ্যমকর্মী ও এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীও। পেঁয়াজ তার ঝাঁজে সবাইকে ত্রস্ত করে তুলেছে! এসব দেখে আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ভাষ্য হলো- এখন থেকে প্রতি বছরই ভোক্তা অধিকার সংস্থা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী মহল পর্যন্ত সবারই অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মতো পেঁয়াজও এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে, পাবেই, পেয়ে গেছেও বলা যায়!

ইতোমধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যেই পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হবে। আমরা আশাবাদী মানুষ, মন্ত্রীর ঘোষণায় আশাবাদী হয়ে থাকলাম, কিন্তু পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারি না। মনের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে। দ্বিধা এ জন্য যে, গত বছরও আমরা হাতে ‘কড়কড়ে’ ৩০০ টাকা নিয়ে ছুটেছিলাম এক কেজি পেঁয়াজের পেছনে। তবু পেঁয়াজের স্বচ্ছন্দ নাগাল পেতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছিলÑ পেঁয়াজ খাওয়া সম্ভব হয়নি! তবে ভরসা একটাই, আমাদের কাছে এবার গত বছরের ‘অভিজ্ঞতা’ আছে। গত বছর আমরা এ বিষয়ে কোনোরূপ অভিজ্ঞ ছিলাম না। বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে আমাদের চাওয়া এইটুকু যে, গত বছরের সেই তিক্ত ‘অভিজ্ঞতা’ যেন এ বছর কিংবা ভবিষ্যৎ বছরগুলোর ‘অভ্যাসে’ পরিণত না হয়, ৩০০ টাকা নিয়ে এক কেজি পেঁয়াজের পেছনে ছুটতে না হয় সে দিকে নজর রাখবেন। আর বাজারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবেন। একদিনের মধ্যে বারবার মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারকে মুহুর্মুহু এতটা অস্থির-চঞ্চল হতে দেবেন না।

মূল্যবান ও মহার্ঘ্য পেঁয়াজের ঝাঁজে বাজারের পাশাপাশি গণমাধ্যমও অস্থির। অস্থির হয়ে উঠেছে মধ্যবিত্তের ড্রয়িং রুম। বিগত কয়েক দিন খবরের বিশাল অংশজুড়ে থাকছে পেঁয়াজ ও পেঁয়াজকাণ্ড! আবার টেলিভিশনের টকশোগুলোও পেঁয়াজের কল্যাণে রাত-বিরাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অনলাইন বা অফলাইনের দৈনিক পত্রপত্রিকাগুলো পেঁয়াজের মতিগতি দেখে অস্থির! এসব অস্থিরতা মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকেও আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। এই আতঙ্কও যেন করোনার মতোই সংক্রামক! আমাদের এই ‘হুজুগে’ আতঙ্কের কারণেও কোথাও কোথাও লাগামহীন হয়ে পড়েছে পেঁয়াজের বাজার মূল্য! সাধারণের এমন আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার পেছনে পেঁয়াজ, পেঁয়াজ রাজনীতি, পেঁয়াজ ব্যবসায়ী না গণমাধ্যমের অস্থির হৈচৈ কে বেশি সংক্রামক ভ‚মিকা রাখছে তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব বাজার-গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা বাজার বিশ্লেষকদের নিতে হবে।
১৪ সেপ্টেম্বর ভারত হঠাৎ করে তাদের ভাষায় ‘বিদেশে’ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের এই ঘোষণায় বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজার একেবারে অস্থির হয়ে পড়েছে। কিন্তু ভারতের এরূপ তাৎক্ষণিক ঘোষণার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে উভয় দেশের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কেননা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণায় দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতের ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করেছেন। তবে এও ঠিক যে, আমাদের দেশের কোনো কোনো ব্যবসায়ী যেন ভারতের ঠিক এই মহার্ঘ্য ঘোষণাটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন! তা বোঝা যায়, ভারতের ঘোষণার পরই পেঁয়াজ নিয়ে সৃষ্ট তাদের কর্মকাণ্ড দেখেই! ভারতের এই ঘোষণায় তাদের ‘পোয়াবারো’ অবস্থাও আমরা দেখেছি। পেঁয়াজ বাজার এতটাই অস্থির হয়ে পড়েছিল যে, বাজার বিশেষজ্ঞের পক্ষেও ইতি-নেতি মন্তব্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এরূপ অবস্থায় সাধারণ মানুষ পেঁয়াজ বাজারের গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে এবার বাংলাদেশের পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি তীর্যক অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন।

আমদানি-রপ্তানি নীতিমালা অনুযায়ী ভারত বা অন্য যে কোনো রাষ্ট্রই যখন-তখন যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা সে প্রশ্নও সাধারণের মনে জেগেছে। ভারতের এই হঠাৎ ঘোষণা অমানবিক তো বটেই, আমরা মনে করি বাণিজ্য চুক্তিরও লঙ্ঘন ছিল। রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার আগে কিছুটা সময় উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের মানবাধিকারের মধ্যেই পড়ে। আমরা দেখলাম যখন বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে বৈধ উপায়েই পেঁয়াজ বোঝাই কয়েকশ ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখনই ভারতের এই ঘোষণা আসে। ফলে সীমান্তলগ্ন স্থলবন্দরগুলোতে আটকে পড়ে পেঁয়াজ বহনকারী শত শত ট্রাক। আর এই খবরটি যখন গণমাধ্যমে চাউর হয় তখন আমাদের দেশের এক শ্রেণির পেঁয়াজ ব্যবসায়ীর উলঙ্গ উল্লাসে বাজার আরো অস্থির হয়ে ওঠে! মুহুর্মুহু লাফতে লাফাতে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। যা হোক অবশেষে ৬ দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর নানামুখী সমালোচনা ও ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলের ক্ষোভের মুখে বন্দরে বন্দরে আটকে থাকা পেঁয়াজ বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি পায়। তারা জানায় ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যারা আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তাদের পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসতে পারবে। এই লেখা (১৯ তারিখ মধ্যরাত) পর্যন্ত সোনা মসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় পেঁয়াজ বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করেছে এবং অন্যান্য বন্দর দিয়েও পেঁয়াজ আসার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে সেই খবরেই নাকি কোথাও কোথাও কেজিতে পেঁয়াজের মূল্য ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত হ্রাসও পেয়েছে! পেঁয়াজ নিয়ে গত বছরে আমাদের ‘চরম শিক্ষা’ হওয়ার পরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কেন আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করল না তাও আমাদের বিস্মিত করে! ‘সরকারি প্রেসনোটে’র মতো আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা পাই, ভারত রপ্তানি বন্ধ করলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির দরজা উন্মুক্ত আছে! কিন্তু সেই দরজা খোলার আগেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সাধারণের চোখে ঝাঁজালো পানি ঝরিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে, নিচ্ছে। ‘চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে’- এই প্রবাদ কতবার কত মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে কতভাবেই না প্রযোজ্য ও জীবন্ত অর্থ নিয়ে হাজির হয় তা বলে শেষ করা যায় না! বিগত ছয় মাসের অধিক সময় ধরে সমগ্র বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর মতো বাংলাদেশকেও করোনা ভাইরাস একেবারে স্থবির করে দিয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও তাদের গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে নানাজনের ভাষ্যে উপরোক্ত প্রবাদটি কতবার ব্যবহৃত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ভারত রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির দরজা উন্মুক্ত আছে বললে উপরোক্ত প্রবাদটি নিজেই যেন নিজেকে ব্যঙ্গ করে!

করোনা মহামারির এই স্থবিরতার মধ্যে পেঁয়াজ, পেঁয়াজ রাজনীতি, পেঁয়াজ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কিছুটা উদাসীনতা এবং সর্বোপরি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের লোভী মানসিকতা আমাদের ভাবিত করে। নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতায় সাধারণ মানুষের মজুতপ্রীতিও কম চিন্তার বিষয় নয়। অর্থাৎ পেঁয়াজকে কেন্দ্র করে সর্বস্তরেই এক প্রকার অস্বাস্থ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রæত পদক্ষেপে অস্বাস্থ্যকর অবস্থা থেকে আমরা মুক্ত হতে চাই। গত বছরের অভিজ্ঞতা এ বছরের অভ্যাসে পরিণত হবে না সে বিষয়েও আশ্বস্ত হতে চাই।

পুনশ্চ : ভারত কর্তৃক হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অস্থির ও আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা এবং বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির পর ভারতের মানুুষের মধ্যে আবেগ-উত্তেজনার যে উৎসাহব্যঞ্জক চেহারা দেখা গেছে তার তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘রাজনীতির’ (!) পক্ষে আরো একটু মানবিক হয়ে ওঠার পটভ‚মি তৈরি করে দেয়। আমরা মনে করি, সাধারণের দেহভঙ্গি দেখেও রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবকাশ থাকে। সভ্য ও মানবিক রাজনীতির আড়ালে কেবল ‘ব্যবসায়’ যেন বড় হয়ে না ওঠে তাও দেখতে হয়, দেখতে হবে।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়