প্রণোদনা থেকে বাদ পড়ছেন প্রকৃত শিল্পীরা

আগের সংবাদ

হাসপাতাল-ক্লিনিক ঘিরে ফের সক্রিয় দালাল চক্র

পরের সংবাদ

বয়স্ক পুরুষরাই টার্গেট লাস্যময়ী জান্নাতের

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ , ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ

হাতিয়ে নিয়েছেন ৩০ কোটি টাকা

মাধ্যমিক পাস হলেও চাল-চলনে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি দেশেই বড় হয়েছেন। ভিকটিমদের সঙ্গে দেখা হলে কথাও বলতেন অনবরত ইংরেজিতে। সহজে ফাঁদে ফেলতে বয়স্ক পাত্রদের জন্যই প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকায় বিয়ের বিজ্ঞাপন দিতেন। বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী বয়স্করা যোগাযোগ করলে রাজধানী গুলশানসহ যমুনা ফিউচার পার্কের দামি রেস্টুরেন্টে তাদের সঙ্গে দেখা করতেন তিনি। সে সময় তার সঙ্গে থাকতেন বাংলার শিক্ষক অথবা আইনজীবী। ভিকটিমদের আস্থায় নিতেই এ কৌশল নিতেন তিনি। যাতে বোঝানো যায়, ভালো বাংলা না জানায় শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে চলেন তিনি।

পরে আলোচনায় জানান, কানাডায় তার ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা রয়েছে। বিয়ে হলে স্বামীকে তিনি সেখানে নিয়ে যাবেন। স্বামীই তার ব্যবসা পরিচালনা করবেন। এসব কথাবার্তায় লোভে পড়ে অধিকাংশই রাজি হয়ে যেতেন। আর তখনই বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রসেসিং ফিসহ নানা কথা বলে হাতিয়ে নিতেন টাকা। এভাবে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৩০ কোটি টাকা। শুধু এক ভিকটিমের কাছ থেকেই হাতিয়ে নিয়েছেন পৌনে ২ কোটি টাকা। এছাড়াও এক ভিকটিমকে কানাডার ভিসার ভুয়া সিল লাগিয়ে দিয়েও প্রতারণা করেছেন তিনি।

পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিয়ে করে কানাডা ও আমেরিকা নেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়া চক্রের অন্যতম হোতা সাদিয়া জান্নাত ওরফে জান্নাতুল ফেরদৌসকে (৩৮) গ্রেপ্তারের পর ভুক্তভোগী ও সিআইডির কাছ থেকে উঠে আসে এমন তথ্য। সিআইডি ঢাকা মেট্রো পশ্চিম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জাকির হোসেনের নেতৃত্বে গত বৃহস্পতিবার রাজধানী গুলশান-২ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।

এ বিষয়ে শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন ভুক্তভোগীও উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে সিআইডি ঢাকা মেট্রোর অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, দেশের প্রথম সারির পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিয়ে করে কানাডা-আমেরিকা নেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। আটক ওই নারী গত ৬ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয় যে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কানাডার সিটিজেন ডিভোর্সি সন্তানহীন নামাজি পাত্রীর জন্য ব্যবসার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী বয়স্ক পাত্র চাই। সেখানে ২৩/২/এ বারিধারা, মোবাইল নং-০১৩০৯ ২৫৪ ৯৪২-এ যোগাযোগ করতে বলা হয়।

বিজ্ঞাপনটি দেখে আগ্রহী হয়ে মো. নাজির হোসেন মোবাইলে যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে গত ১২ জুলাই গুলশানে থাই সিগনেচার নামের রেস্টুরেন্টে দেখা করেন। সেখানে আলোচনায় সব ঠিক হয়ে গেলে ট্যাক্স-ভ্যাট ও ডিএইচএল খরচের নামে সর্বমোট ১ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে ফোন বন্ধ করে দেয় জান্নাতুল।

জান্নাত

তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে সিআইডিতে অভিযোগ আসলে আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করি। পরবর্তীতে আবার অন্য ভিকটিমের কাছ থেকে টাকা নেয়ার জন্য দেখা করতে এলে সাদিয়া জান্নাতুলকে আটক করা হয়। সে সময় তার কাছ থেকে ৩ ভিকটিমের ১০টি পাসপোর্ট, ৩টি মোবাইল ফোন, ৩টি মেমোরি কার্ড, ৭টি সিল, ব্যবহৃত সিম ও হিসাবের খাতাসহ গত ৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংক এশিয়ায় ৪৮ লাখ টাকা জমা দেয়ার স্লিপ উদ্ধার করা হয়।

আসামি প্রায় ১০ বছর ধরে এইভাবে অসংখ্য ভিকটিমের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কুমিল্লার মেয়ে জান্নাত মাধ্যমিক পাস হলেও পোশাক ও কথাবার্তায় স্মার্টনেসের কারণে কানাডা প্রবাসী বলে ভিকটিমরা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে এনামুল হাসান ওরফে জিহাদকে বিয়ে করেন তিনি। ওই স্বামীও এই প্রতারক চক্রের সদস্য। তার কাছে কিছু কাগজ পাওয়া গেছে। যেখানে কোথা থেকে টাকা এসেছে হিসাব লেখা রয়েছে। একপর্যায়ে আমরা দেখতে পাই এইভাবে অনেকের কাছ থেকে ২৫-৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। এছাড়াও ঢাকা ও এর আশপাশে ২০ কোটি টাকার জমিসহ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এ চক্রের আরো সদস্য গ্রেপ্তারের জন্য তদন্ত অব্যাহত আছে।

এদিকে সিআইডি কার্যালয়ে আসা ভুক্তভোগী মোশাররফ হোসেন জানান, বিজ্ঞাপন দেখে তিনি যোগাযোগ করেন। তার সঙ্গে দেখা হলে জান্নাত নিজেকে কানাডিয়ান পরিচয় দেন। লন্ডনের অক্সফোর্ডে ইংরেজিতে স্নাতক বলে জানান। ভুক্তভোগীর সঙ্গে দেখা করার সময় জান্নাতের সঙ্গে তার লিগ্যাল এডভাইজারও ছিলেন। কথা ঠিক হয়ে গেলে বিভিন্ন ফরম পূরণের নামে ৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন জান্নাত। একইভাবে ভুক্তভোগী রবিউল ইসলাম প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন। তার কাছ থেকেও ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় জান্নাতুল। বিদেশে পাঠানোর নাম করে মোক্তার হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ভুয়া ভিসা লাগিয়ে হাতিয়ে নেন ৩০ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, এ ঘটনায় মানিলন্ডারিংয়ের ধারায় মামলা হবে। আমরা তাদের ব্যাংক একাউন্টের সন্ধান পেয়েছি। ভুক্তভোগীরা প্রমাণ দেখাতে পারলে আইনানুযায়ী টাকা ফেরতের সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও গতকাল জান্নাতের দুই দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ-উর রহমান শুনানি শেষে দুদিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে আরো তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছি আমরা।

এমআই