ইবিতে ক্যাম্পাসিয়ান উদ্যোক্তা সংগঠনের যাত্রা শুরু

আগের সংবাদ

শুক্রগ্রহ রাশিয়ার! তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনটি?

পরের সংবাদ

আ.লীগের রাজনীতির আগুণে ঘি ঢালছে বিরোধিরা!

অতুল পাল, বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ , ৯:২০ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগের দুর্গ বলে দেশব্যাপি খ্যাতি আছে। স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৭০ সালের ১৮ জুলাই প্রাদেশিক নির্বাচনী প্রচারাভিযান এবং ১৯৭০ সালের ২১ নভেম্বর স্বরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাড়াতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুইবার বাউফলে এসেছিলেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দৃঢ় কণ্ঠের প্রতি বাউফলের সর্বস্তরের মানুষ পাগলপ্রায় হয়ে আওয়ামী লীগের পতাকা তলে আসেন। ওই সময় বরিশাল ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি আ.স.ম ফিরোজের কালাইয়াস্থ বাড়িতে বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে আ.স.ম. ফিরোজের পথচলা শুরু হয়।

১৯৭৯ সালের সাধারন নির্বাচনে আ.স.ম. ফিরোজ বাংলাদেশে সর্বকণিষ্ঠ এমপি হিসেবে সংসদে বাউফলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এরপর থেকে আ.স.ম. ফিরোজের হাতে বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভীত তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত শক্ত শিকড় ছড়িয়েছেন। প্রায় চারযুগ ধরে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে আ.স.ম ফিরোজ বাংলাদেশে আওয়ামী রাজনীতির একটি কিংবদন্তী হিসেবেই নিজের অবস্থান সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের এই দুর্গে ক্রমান্বয়ে প্রতিপক্ষ সৃষ্টি হতে থাকায় আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যে হতাশার ছাপও পড়তে শুরু করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়, ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত বাউফল পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওই নির্বাচনে নিজেকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী বলে দাবি করে আওয়ামী লীগ বিরোধি বিএনপি-জামাতের সমর্থন ও তাদের ভোটে জিয়াউল হক জুয়েল। আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। ধীরে ধীরে জিয়াউল হক জুয়েল আ.স.ম. ফিরোজের বিরোধি বলয়কে হাত করে তার রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরী করতে থাকেন। ১৯৭০ ও ১৯৭২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে গিয়ে আ.স.ম. ফিরোজ অনেক সিনিয়র নেতারই বিরাগভাজন হন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগে আ.স.ম. ফিরোজকে টেনে নিচে নামাতে পারেননি কেউ। এই ক্ষোভ থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখনো আ.স.ম. ফিরোজের ওপর বিরাগভাজন।

এই সুযোগগুলোই মেয়র জুয়েল কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের পটুয়াখালী জেলা কমিটিতে প্রথমে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ২০১৮ সালে যুগ্ন সাধারন সম্পাদক পদ লাভ করেন। এক পর্যায়ে নিজের পছন্দ মোতাবেক করা বাউফল উপজেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি করে সেটি অনুমোদনও করিয়ে নেন। মেয়র জুয়েলের একাজে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী বেশ কয়েক নেতা সহায়তা করে আসছেন। এরফলে বাউফলে বিরোধি বিএনপি ও জামাতের সমর্থকদের মধ্যে উৎফুল্লতা অনেকটাই বেড়ে গেছে। কারণ, তাদের কাছে আ.স.ম. ফিরোজ এমন একজন তৃণমূলের নেতা যাকে নির্বাচনে সরাসরি দমানো কোনভাইে সম্ভব নয়। তাই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে তারা মেয়র জুয়েলকে সমর্থন জানিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের আগুণে ঘি ঠেলে যাচ্ছেন এবং ক্রমান্বয়ে বিরোধ প্রকাশ্য রুপ পাচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২৪ মে দুপরে বাউফল পৌর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বাউফল থানা সংলগ্ন ডাকবাংলোর মোরে একটি তোরণ নির্মাণ করতে গেলে মেয়র জুয়েল ও তার সমর্থকরা তোরণ নির্মাণে বাধা দেন। এনিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথমে তর্কাতর্কি, হাতাহাতি এবং শেষে লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারামারি হয়। ওই সময় মেয়র সমর্থকদের চাকুর কোপে তাপস দাস নামের এক যুবলীগ কর্মী খুন হয়। ওই খুনে মেয়র জুয়েলের নির্দেশনা রয়েছে বলে অভিযোগ এনে তাকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। অপরদিকে, উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মধ্যে কিছু নতুন আওয়ামী লীগার ঢুকে পড়ে। এনিয়ে সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে ৩১ আগস্ট কেশবপুর বাজারে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।

গত ২ আগষ্ট সন্ধায় কেশবপুর বাজারে ওই ইউনিয়নের যুবলীগের সহসভাপতি রকিব উদ্দিন রুমন ও যুবলীগ কর্মী ইশাত তালুকদার একটি দোকানে চা খাওয়ার সময় সন্ত্রাসিদের হাতে খুন হয়। ওই খুনের ঘটনায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন লাভুর সম্পৃক্ততা রয়েছে অভিযোগ এনে তাকে প্রধান আসামি করে ৫৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়। চার মাসের মধ্যে তিন যুবলীগ কর্মী খুন হওয়ায় সাধারন মানুষের মধ্যে আতংঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এসকল ঘটনায় প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আওয়ামী বিরোধিদের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করছেন। তবে কি পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনকে লক্ষ্য করে বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগকে ধংস কিংবা ব্যাকফুটে নেয়ার পায়তারা চলছে? এমন প্রশ্ন এখন হরহামেসাই আওয়ামী লীগের সমর্থক ও সাধারন মানুষের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাড়িয়েছে।

বাউফলের প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতে, আ.স.ম. ফিরোজ প্রতিযোগিতা পছন্দ করেন কিন্তু প্রতিহিংসা পছন্দ করেন না। প্রায় ৪০ বছরের রাজনীতিতে এমনটাই বাউফলবাসি দেখে আসছেন। তারা মনে করছেন, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে আ.স.ম. ফিরোজ বিরোধি গ্রুপটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে বার্তা দিতে চাচ্ছেন যে, আ.স.ম. ফিরোজকে বাদ দিয়ে নৌকার কান্ডারী অন্য কাউকে করা হোক। এরকমটা ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়ই উন্মূক্ত হয়েছে। ওই সময় আ.স.ম. ফিরোজের প্রার্থীতার বৈধতা চ্যালেঞ্চ করে মেয়র জুয়েলের করা রীট তার প্রমান। বাউফলের সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, ধারাবাহিকভাবে চলে আসা এরকম ঘটনায় আওয়ামী লীগ লাভবান না হলেও বিরোধি বিএনপি-জামাত জোট লাভের হিসেব-নিকেশ কষে যাচ্ছেন। কারণ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ আরো উসকে দিয়ে নিজেদের ঘরে জয়ের ফসল তোলবেন এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। কিন্তু বিষয়টিকে এতো সহজভাবে মানতে নারাজ তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

তাদের মতে, সাতবার এমপি নির্বাচিত হয়ে এখনো আ.স.ম. ফিরোজ কোন মন্ত্রীত্ব পায়নি। এটা নিয়ে তৃণমূলে আবেগ-কষ্ট রয়েছে। কেউ কেউ কিছুটা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই আ.স.ম ফিরোজকে মূল্যায়ণ করবেন এখনো সে বিশ্বাস তাদের মধ্যে রয়েছে। তাদের মতে, পৌরসভা কেন্দ্রিক রাজনীতি এবং উপজেলাব্যপি রাজনীতি এক নয়। আ.স.ম. ফিরোজের নেতৃত্বে তৃণমূলে যে সাংগঠনিক ভীত রয়েছে সেখানে ভাঙ্গন ধরানো সম্ভব নয়। সেটা ইতি পূর্বে স্থানীয় নির্বাচনসহ জাতীয় নির্বাচনেও প্রমানিত হয়েছে। অপরদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেয়র জুয়েলের কিছু সমর্থকরা জানান, জিয়াউল হক জুয়েল যাদের ভোটেই মেয়র নির্বাচিত হোক না কেন, নির্বাচিত হওয়ার পর সে দেখা করার জন্য আ.স.ম. ফিরোজের কাছে গেলে তাকে উষ্ণভাবে গ্রহণ করেননি। যেটা আ.স.ম. ফিরোজের ভুল ছিল বলেই মনে করছেন তারা।

তবে এর সমাধান কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তৃণমূলসহ উপজেলার প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করেন, এর সমাধান কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীই করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী বাউফলের সকল খবরই রাখেন। বাউফলের প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনেক সোর্স রয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব যারা পালন করছেন তারাও পক্ষপাত করছেন এমন জনশ্রæতিও রয়েছে। আ.স.ম. ফিরোজ নালিশি রাজনীতি করেন না। তিনি যদি নালিশি রাজনীতি করতেন তবে বাউফলের প্রকৃত ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনেক আগেই বলতে পারতেন। তার সাফ কথা “যে সহে-সে রহে”। তৃণমল নেতাকর্মীরা মনে করেন, বাউফলের শান্তি ও শৃঙখলা ফিরিয়ে আনতে নিশ্চই প্রধানমন্ত্রী দ্রুতই যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

এসএইচ