ট্রাকেই পচবে পেঁয়াজ!

আগের সংবাদ

অ্যাটর্নি জেনারেল আইসিইউতে

পরের সংবাদ

পুরনো সিন্ডিকেটের হাতে ফের জিম্মি পেঁয়াজবাজার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ , ২:৪৬ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ , ৫:২১ অপরাহ্ণ

যে যার ইচ্ছেমতো মুনাফা লুটছে : ক্যাব

অপরাধ করেও সাজা না পাওয়ার সুবিধা নিয়ে ফের অপরাধে জড়িয়েছে দেশের পেঁয়াজ সিন্ডিকেট। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত পেঁয়াজ বন্ধ করার পর যেভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা অর্থ লুটেছিল, এবারো সেই একই প্রেক্ষাপটে দেশের মধ্যে ফের অর্থ লোটায় মেতেছে সেই পুরনো সিন্ডিকেট। গত বছরের পেঁয়াজকাণ্ডের নেপথ্যের কারিগরদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আর মন্ত্রণালয়ের এই ভুলের মাশুল দিচ্ছেন কোটি কোটি সাধারণ ভোক্তা। জরুরি এই ভোগ্যপণ্য বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পেঁয়াজের বাজার এখন সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। ফলে সরকারি নানা উদ্যোগের পরও দাম কমছে না পেঁয়াজের। বিপাকে পড়েছেন দেশের কোটি কোটি ভোক্তা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশন বলছে, সাড়ে পাঁচ মাস পর ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে নতুন পেঁয়াজ উঠবে। বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ১১ লাখ টন। অন্যদিকে পেঁয়াজের মজুত আছে ৫ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে এখনো আড়াই মাস চলার মতো পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসার আগে আরো ৬ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে। তবে গত বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, এক মাসের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।

গত বছরের পেঁয়াজের সংকট শুরু হলে এমনি ভরসা দিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। পরে পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজির ঘটনা খতিয়ে দেখতে শুরু করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এতে সারাদেশের প্রায় অর্ধশতাধিক পেঁয়াজ আমদানিকারককে শুনানিতে ডাকে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ১৩ প্রতিষ্ঠানকে কারসাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হলেও কার্যত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে পেঁয়াজের সেই পুরনো চক্রই আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের আগ পর্যন্ত ভারত থেকে ৪২ হাজার ১৭৬ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। শুল্কসহ চলতি মাসের প্রথম দিনে পেঁয়াজের আমদানিমূল্য ছিল ১৭ টাকা। সর্বশেষ গত সোমবার বন্ধের আগ পর্যন্ত প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমদানিতে খরচ পড়েছে ২৬ টাকা। এই ২৬ টাকায় কেনা পেঁয়াজ খুচরা বাজারে এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭৫ টাকা পর্যন্ত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, যে যার মতো মুনাফা লুটছে। ইচ্ছেমতো মুনাফা করছে। সরকারের উচিত সরবরাহ বাড়ানো। যত তাড়াতাড়ি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তত তাড়াতাড়ি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পেঁয়াজের বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করলেও আইনি কিছু জটিলতা আছে। ভোক্তা অধিকার আইনে কেউ যদি অতিরিক্ত দাম নেয়, অভিযানে কাজ হয়। যেহেতু পেঁয়াজের নির্ধারিত কোনো মূল্য নেই, তাই অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়াতে গতকাল বৃহস্পতিবার ন্যূনতম টাকা জমা রেখে পেঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র খোলার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পেঁয়াজসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি ঋণপত্র স্থাপনের ক্ষেত্রে মার্জিনের হার নূ্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়- যা গত ৩০ মে পর্যন্ত বহাল ছিল। এ নির্দেশনা এখন থেকেই কার্যকর হবে এবং ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই এলসির সুদ হার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। এদিকে পেঁয়াজের সংকট উত্তরণে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের ইঙ্গিতও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তবে এসব বিষয়ে কথা বলতে বারবার বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীনের সেল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর বাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১১০ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে দেশি পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা ও আমদানি করা পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, গত দুদিনেই ভোক্তাদের বড় অংশ পেঁয়াজ কিনে ঘরে মজুত করেছেন। এ কারণে পেঁয়াজের বিক্রি কমেছে। পেঁয়াজের বিক্রি কমলেও পাইকারি বাজারে দাম কমেনি। যে কারণে খুচরা বাজারেও পেঁয়াজের দাম কমেনি। সহসা পেঁয়াজের দাম কমার সম্ভাবনাও কম। ভারত যদি বাংলাদেশকে পেঁয়াজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে দাম কিছুটা কমতে পারে। ভারত পেঁয়াজ না দেয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে দাম আরো বাড়তে পারে বলে মনে করেন খুচরা বিক্রেতারা।

স্থলবন্দর সূত্রে জানা গেছে, মহালয়ার কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার বেনাপোলের অপরপ্রান্ত অর্থাৎ ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের আটকে আছে শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক। এর মধ্যে পেঁয়াজের ট্রাকও রয়েছে। বেনাপোলের আমদানিকারকরা বন্ধের কারণে পেঁয়াজ পঁচে যাওয়ারও আশঙ্কা করছেন। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমার ইয়ুথ বাংলাদেশের (সিওয়াইবি) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ ভোরের কাগজকে বলেন, গত বছরে পেঁয়াজের সিন্ডিকেট চিহ্নিত হলেও তাদের এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই শিথিলতার জন্য পেঁয়াজের সিন্ডিকেট ফের সক্রিয় হয়েছে। সংকট উত্তরণে দেশীয় পেঁয়াজে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা উচিত, যাতে কেউ চাইলেই অতিরিক্ত দাম নিতে না পারে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়