স্বর্ণের দাম ফের বাড়িয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ

আগের সংবাদ

একজন তারিক আলী

পরের সংবাদ

একা ভালো থাকার দিন শেষ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০ , ৯:১৩ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০ , ৯:১৩ অপরাহ্ণ

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘তোমার সমাজ তোমার শিশুকে দেখে রাখবে’। বহু বছরের স্মৃতিমাখা সেই প্রবাদবাক্য চলছিল বছরের পর বছর। মূল প্রবাদটি আফ্রিকান ‘ইট টেকস এ ভিলেজ টু রেইজ এ চাইল্ড’। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে গোটা গ্রামেরই দায়িত্ব তোমার শিশুকে ভালোভাবে মানুষ করার। আফ্রিকার অনেক প্রবাদেই এ বিষয়টির উল্লেখ আছে। এর সারমর্ম হচ্ছে আনন্দে বাঁচতে হলে গোটা গ্রামটাকেই আপন করে পেতে হবে। সন্তান প্রথমে মায়ের, তারপর পরিবারের এবং তারপর গ্রামের ও দেশের। যদি এভাবে দেখি, তবে একটা দেশ হলো পৃথিবীর সন্তান। পৃথিবী মহাবিশ্বের। প্রত্যেকের পরিভ্রমণ, বিচরণ একটি বলয়ের ভেতর। সংশ্লিষ্ট বলয়ের সবারই একে অপরকে সহযোগিতা ছাড়া কারো পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। হাজার বছর ধরে এভাবেই পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও সমাজ। কিন্তু ঝড়ের মতো আধুনিক সভ্যতার নাম করে বিচ্ছিন্নতার সুযোগে এর বিপরীত বাতাস বইছে আমাদের চারদিকে কিছুদিন থেকে। সমাজ, দেশ, মহাদেশ সব যেন এখন একা একা খাপছাড়া। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী, মহাবিশ্ব সব জায়গাতেই যেন একা চলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আত্মনির্ভরতা ভালো কথা কিন্তু তার অর্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানে একা হয়ে যাওয়া। তাদের স্লোগান এসেছো একা, যাবে একা, তবে কীসের এসব মায়াকান্না! তাই কি জীবনের সত্য কথা? তাই কি আমাদের শান্তির জায়গাটুকু নির্ধারণ করার সঠিক বার্তা?
সভ্যতা বিকাশের একটি অন্যতম শর্ত নগরায়ন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, জলাধার বন্ধ করে ইট-বালু-পাথরের নগর তৈরি করতে হবে। যে গ্রামে উর্বর মাটি, তা ইট তৈরি করে নষ্ট করার নাম প্রগতি হতে পারে না। ঠিক তেমনি যে দেশে যে ধরনের চাষ, শিল্প, ব্যবসা, পরিষেবায় সহজে উন্নতির সুযোগ রয়েছে, সেখানে সেটাই বেশি করে করা লাভজনক। অন্য দেশ থেকে কাঁচামাল, প্রযুক্তি আনা যেতে পারে। এক ঘরে নয়, বরং বিশ্ব সমাজের সদস্য হিসেবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েই উৎপাদন, আয় এবং সম্পদ বৃদ্ধির কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। এটাই আজকের এবং আগামী দিনের বিজ্ঞান। এটাই আগামী প্রজন্মের উন্নতির সবচেয়ে সহজ পথ।
ইরানে চীনের বিপুল বিনিয়োগে ভারতের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সমস্যা অধুনাকালে সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রসায়ন বর্তমানে খুবই মধুর তালে এগোচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের লেখচিত্র ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে। চীন বাংলাদেশকে তার পাকিস্তান-নেপাল-ইরান বলয়ের মধ্যে পেতে চাচ্ছে। পাকিস্তান এবং চীনের পররাষ্ট্র সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষের পর ক্রমশ দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। ইতোমধ্যে চীন পাকিস্তান নৌবাহিনীকে একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ দিয়েছে। আরো তিনটি যুদ্ধজাহাজ পাকিস্তান নৌসেনার জন্য তৈরি করছে বেইজিং। মিয়ানমার, পাকিস্তান ও ইরানের বন্দরগুলোর সাহায্যে চীনা নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরে আধিপত্যের জন্য অবস্থান নিয়েছে। এদিকে লাদাখ সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত আছে। প্রায় তিন মাস ধরে ভারত-চীনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঘাঁটি গেড়েছে চীন। আলোচনার সুবাদে ইতোমধ্যে গালোয়ান, হট স্প্রিং, ফিঙ্গার পয়েন্ট ফোর থেকে চীনা সেনা সরালেও ভারতীয় ভূখণ্ডের প্যাংগং, দেপসাঙে এখনো ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে চীনা সেনারা। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যায় জর্জরিত। দ্বিপক্ষীয়ভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে অনেক দেন-দরবারের পরও রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এখন মনে হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় নয়, বহুপক্ষীয় সমঝোতা প্রয়োজন। মিয়ানমার যেন কিছুই শুনছে না। চীন এবং ভারত তাদের নিজেদের স্বার্থে মিয়ানমারের হাতের কাছে থাকতে চায়। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ না ভারত, না চীন কারো কাছ থেকেই ফলপ্রসূ সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে জব্দ করার সুযোগ খুঁজছিল। হংকং সেই সুযোগ এনে দিল। গত এক বছর ধরে হংকংয়ে চলা চীনবিরোধী গণতন্ত্র কর্মী আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্র ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছে। চীন জোরেশোরে হুঁশিয়ারি দিয়েছে হংকংকে। এরই মধ্যে তাইওয়ান ভয়ে আছে কখন চীনের আগ্রাসনের শিকার হয়ে তাদের দেশটিও হংকংয়ের পরিণতিতে এসে যায়। ১৯৭৯ সালের পর থেকে তাইওয়ানের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখেনি যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন পরিস্থিতিতে চীনের পক্ষ নিয়েই এই পদক্ষেপ নিয়েছিল তারা। তবে ইদানীং চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতির পর এই চিত্র বদলে গেছে। তাইওয়ান চীনেরই অংশ বলে বরাবরই দাবি করে আসছে বেইজিং। প্রয়োজনে জোর খাটিয়ে তাইওয়ানকে নিজেদের শাসনে আনার হুমকি দিয়ে আসছে চীন। সেই আবহে তাইওয়ানকে দলে টানতে মার্কিন প্রশাসন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে তিন দিনের ক‚টনৈতিক সফরে তাইওয়ানে গিয়েছিলেন মার্কিন স্বাস্থ্য সচিব।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কেমিস্ট্রি কখনো মধুময় ছিল না। এখনো তেমনটাই। সুযোগ পেলেই একে অপরকে জব্দ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাশিয়া তার প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়ে সবসময় অস্থির থাকে কখন আবার কোন প্রতিবেশীর ঘরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত থাবা বসে যায়। সিরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইসরাইল নিয়ে মতপার্থক্য এবং যুদ্ধংদেহী মনোভাব আছে এই দুই মোড়ল দেশের মধ্যে। সম্পর্কের টানাপড়েন থেকে কেন যেন এই দুটি দেশ বেরই হতে পারছে না! সব কিছু মিলিয়ে পৃথিবী আজ স্বস্তির জায়গায় নেই। অধিকাংশ রাষ্ট্রই যেন আজ আঞ্চলিক আর বিশ্ব ঝামেলার সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী এবং মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখার এবং অনুভব করার সময় এসেছে। করোনা এবার নতুন শিক্ষা দিয়ে গিয়েছে পৃথিবীর মানুষকে। একা কোনো রাষ্ট্রই নিরাপদ নয়। রাষ্ট্র হোক আর পরিবার হোক ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সহযোগিতার সেতুবন্ধন। একজন ব্যক্তি তার পরিবারে একা হয়ে গেলে তার যেটুকু লাভ হয়, তার থেকে অনেকগুণ ক্ষতি তার ভাগ্যে চলে আসে। ভিন্নতা আর বিচ্ছিন্নতার মধ্যে নয়, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির নৈকট্য বৃদ্ধি করে সমৃদ্ধি আর সম্ভাবনা। দেশ আলাদা হয়ে নয় বরং বিশ্ব দরবারে অন্য দেশের প্রতিবেশী হয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েই লাভ করতে পারে সমৃদ্ধি। যুদ্ধ করে নয়, ঘৃণা করে নয় বরং হাতে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই উন্নয়নের উচ্চ শিখরে যাওয়া যেতে পারে। এটাই শান্তি, সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের সবচেয়ে সহজ পথ। অবিশ্বাস, হিংসা আর বিদ্বেষ দিয়ে শুধু অশান্তি বাড়ানো যেতে পারে। প্রকৃত শান্তি খুঁজতে একে অপরের সহযোগিতার বিকল্প নেই। শুধু চীন কিংবা ভারত নয়, আজ এ অঞ্চলে প্রয়োজন চীন এবং ভারত উভয়েরই। চীন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, ইরান, জাপান, মিয়ানমার সবারই প্রয়োজন সবাইকে। সীমান্ত বিরোধকে সামনে রেখে বাচ্চাসুলভ ‘দেখে নেব’ প্রতিযোগিতা নয় প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলুক সহযোগিতার। হিংসা আর বিদ্বেষের চোরাবালিতে আটকে থাকার যুগ নিশ্চয়ই ২০২০ নয়। গঙ্গা, পদ্মা, সিন্ধু দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। সেদিন এবং তারপর অনেক সুযোগ হারিয়েছে উপমহাদেশ, অনেক সুযোগ হারিয়েছে পৃথিবী। কিন্তু আজ তেমন ভুল করার দিন নেই। আজ প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাতে হবে আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে। তাদের সামনে আর অর্থহীন হিংসার উত্তরাধিকার নয়। ট্রাম্পকে খুশি করতে আর রাশিয়ার ভ্যাকসিন ফিরিয়ে দেয়া নয়, ভারতকে খুশি করতে আর চীনের ভ্যাকসিন নিতে অপারগতা নয়। ক‚টনৈতিক অসাফল্য বা ব্যর্থতার দায় নিষ্পাপ মানুষগুলোর ওপর আর চাপিয়ে দেয়া নয়। চীন, ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও ভুটান একে অপরের সঙ্গে আর বিভেদ নয়। বরং সবার সঙ্গে সবার সুসম্পর্ক উন্নয়নে নিয়োজিত থাকার নাম হবে আগামী দিনের প্রগতির স্লোগান। আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, জার্মানি, যুক্তরাজ্য যদি একে অপরের দিকে আর বাঁকা চোখে না তাকায়, তবে সুবাতাস ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে এই দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষকে। উন্নতি আর শান্তি হয়ে উঠতে পারে মানুষের পথ ও পাথেয়। একা নয়, এবার বাস করতে হবে সকলের তরে সকলকে। একা পথ চলার দিন শেষ। এবার পথ চলতে হবে একে অপরের সহায়তার দীপ্ত পদভারে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়