দিনে আরবের সঙ্গে শান্তি চুক্তি, রাতে ফিলিস্তিনে হামলা

আগের সংবাদ

এক সপ্তাহের মধ্যে উপকমিটির তালিকা জমা দেয়ার আহবান

পরের সংবাদ

৭০ বছরেও বেতন-স্বীকৃতি মেলেনি বনপ্রজাদের

আনোয়ার হোসেন আনু, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০ , ৪:২২ অপরাহ্ণ

নিজ বনভূমেই এখন পরবাসী কুয়াকাটার বনপ্রজারা

পটুয়াখালী বনবিভাগের কুয়াকাটা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৭০ বছর ধরে বিনা বেতনে কাজ করার পরও স্বীকৃতি দেয়া হয়নি বনপ্রজাদের। উল্টো অবৈধ দখলদার আখ্যা দিয়ে ভোগদখলীয় জমি ও বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদে নোটিশ দিয়েছে বনবিভাগ ও ভূমি প্রশাসন। পাকিস্তান আমলে ৩৩ বনপ্রজাকে ৪ একর করে জমি বরাদ্দ দিলেও সত্তর বছর পর বনবিভাগ তাদের বাড়িঘর ও ভোগদখলীয় জমি থেকে উচ্ছেদে ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এনিয়ে বনবিভাগ ও ভূমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বনপ্রজাদের বিরোধ চলছে। এমন পরিস্থিতিতেব ভূক্তভোগী বনপ্রজারা বৈধতা পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

বনপ্রজাদের সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৫ ও ১৯৫০ সালের দিকে পাকিস্তান আমলে কুয়াকাটা সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার বিরাণভূমিতে বাগান তৈরির জন্য কক্সবাজারের মহেষখালীর সোনাদিয়ায় সমুদ্র ভাঙ্গণে সহায়-সম্বলহীন ২৩ পরিবার ও বরগুনার কাকচিরা এলাকার ১০টি পরিবারকে বনসৃজন করার শর্তে ৪ একর করে জমি বরাদ্দ দেয় তৎকালীন মহিপুর বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা গোলাম কাদের সিকদার।

এরপর থেকে সেসব বনপ্রজা বরাদ্দ করা জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস ও চাষাবাদ করে আসছে। বনবিভাগের শর্তানুযায়ী বনপ্রজারা পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার কুয়াকাটা, লেম্বুর চর, গঙ্গামতির চর, কাউয়ার চর, চর মৌডুবী, চর মোন্তাজ, সোনার চর, ফাতরার বনসহ বিভিন্ন স্থানে কাকড়া চারা, গোলগাছ, কেওড়া, কড়াই, রেইন ট্রি, নারিকেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির চারা রোপণ করে আসছেন।

তবে এসব কাজের জন্য বনপ্রজাদের কোনো পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। তাদের সৃজনকরা বনের বয়স প্রায় ৬০-৬৫ বছর হয়ে গেছে। যার অধিকাংশই সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। তাছাড়া গেল সাত দশক ধরে ৩৩ বনপ্রজা থেকে সন্তান ও নাতিসহ এখন ৬৭ পরিবার হয়ে গেছে। আবার বনপ্রজাদের মধ্যে বেশিরভাগই মারা গেছেন। দুএকজন বেঁচে থাকলেও বয়সের ভারে নড়াচড়াই করতে পারেন না।

কুয়াকাটার সংরক্ষিত বনাঞ্চল বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

বনপ্রজারা হিংস্র জীবজন্তুর সঙ্গে লড়াই করে বিনা বেতনে বন পাহারা, বাগান সৃজন করার মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রায় সত্তর বছর ধরে স্ত্রী সন্তান ও পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছেন। এর মধ্যে গেল ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাসে তাদের পরিবারের অনেক সদস্যই মারা গেছেন। আবার কেউ কেউ বাগান সৃজন করতে গিয়ে বাঘের শিকারে জীবন দিয়েছেন। জীবনযুদ্ধে লড়াই করা বনপ্রজারা পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতেই বসবাস করে আসছিলেন। এত বছর পর হঠাৎ করেই বনবিভাগ এসব বনপ্রজাকে অবৈধ উল্লেখ করে বাড়িঘর ও চাষাবাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতে চাইছেন।

বনপ্রজারা কাগজ কলমে বৈধতা পেতে জনপ্রতিনিধি, বনবিভাগ, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। দেশের বৈধ নাগরিক হিসেবে নিজেদের মৌলিক অধিকার আদায়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আবেদনও করেছেন।

কুয়াকাটা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসবাসরত বনপ্রজারা অবৈধভাবে বন দখল ও বন উজাড় করছে মর্মে উল্লেখ করে তাদের উচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত ৩ মার্চ প্রতিবেদন চেয়ে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জগৎবন্ধু মণ্ডল গত ৬ আগস্ট ২০ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের ভোগদখলীয় জমির স্বপক্ষীয় কাগজপত্র ও স্বাক্ষী প্রমাণসহ ৩ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে তদন্তকালে উপস্থিত থাকার জন্য নোটিশ দেন। স্থানীয় ভূমি প্রশাসন বিষয়টি তদন্তও করে।

বনপ্রজাদের লাগানো বনভূমি ও বরাদ্দ দেয়া জমিতে ধানের ক্ষেত বনপ্রজাদের হেডম্যান আব্দুল কাদের, বনপ্রজা আব্দুস সোবাহান, গনেশ চন্দ্র মিস্ত্রী, মৌলভী জবেদ আলী, মতিউর রহমান, নজীর মাঝিসহ একাধিক বনপ্রজা অভিযোগ করেন, তৎকালীন খুলনা বনবিভাগের আওতাধীন মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা গোলাম কাদের সিকদার অবৈতনিক বনপ্রজা হিসেবে ৩৩ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সে সময় বন সৃজন করার শর্তে বাড়িঘর নির্মাণ ও চাষাবাদ করার জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ৪ একর করে জমি দিয়েছিলেন।

বনপ্রজারা আরো বলেন, বন সৃজন ও পাহারার পাশাপাশি প্রায় ৭০ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন তারা। ঐ সময়ে বনবিভাগ থেকে তাদের একটি টোকেন দেয়া হলেও ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাসে তা হারিয়ে যায়। বনপ্রজারা বলেন, এতো বছর পর বনবিভাগ তাদের অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে ভোগদখলীয় জমি ও বাড়িঘর ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। বনপ্রজাদের অভিযোগ, একদিকে তাদের অবৈধ দখলদার বলা হচ্ছে, আবার অন্যদিকে বনবিভাগ থেকে তাদের বনপ্রজা হিসেবে উল্লেখ করে বন সৃজনের জন্য চিঠি দেয়া হচ্ছে। আর বনপ্রজারা এখনও বন সৃজন করে চলেছেন।

কুয়াকাটার সংরক্ষিত বন আকর্ষণ করছে পর্যটকদের।

কাগজ কলমে তাদের বৈধতার দাবিতে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে। এ সময় বৈধতা দেয়ার কথা বলে সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদসহ একাধিক কর্মকর্তা দফায় দফায় মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তারপরও বৈধতা দেয়া হয়নি তাদের। এ সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী বনপ্রজারা।

এবিষয়ে মাঠ পর্যায়ের তদন্ত কর্মকর্তা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জগৎবন্ধু মণ্ডল বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে বনপ্রজারা দীর্ঘ বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছে। বনবিভাগের বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে না পারলেও নিজেদের বনপ্রজা হিসেবে দাবি করেছে তারা। তাদের দাবিনামা সম্বলিত তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, বনপ্রজারা বছরের পর বছর বসবাস করে এলেও তাদের স্ব-পক্ষে কোনো কাগজপত্র নেই। আইন অনুযায়ী তারা অবৈধভাবে বসবাস করছে। তিনি আরও বলেন, বনপ্রজারা জেলা প্রশাসক, বনবিভাগ ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর বৈধতার জন্য আবেদন করেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

ডিসি