আবরার হত্যা: বিচার শুরু, সাক্ষ্যগ্রহণ ২০ অক্টোবর

আগের সংবাদ

জয় বাংলা টেলিমেডিসিন অ্যাপ উদ্বোধন

পরের সংবাদ

রংপুরের শিল্পীরা অনেকে পেশা বদল করছেন

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ , ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

স্থবির জেলাভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড-৩

‘রঙ্গঁরসে ভরপুর এই রঙ্গঁপুর’। ঐতিহাসিকরা বলেছেন, বাংলা সাহিত্যের আদিনীড় রংপুর। যেখান থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের ৫১টি অখণ্ডিত ৪৭ পদের রচয়িতা ২৪ জন কবি। সপ্তম শতাব্দী হতে ১০ শতাব্দীর মধ্যে চর্যাপদের ওই কবিদের অনেকের পদচারণা ঘটেছিল রংপুরে! রঙ্গঁরসে ভরপুর প্রাচীন এই শহরটির রঙ যেন মুছে দিয়েছে করোনা!

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির এই উর্বর ভূমিজুড়ে কেবলই নীরবতা! এর মঞ্চে নেই নাটকের উদ্দাম প্রতিবাদ, নূপুরের ঝংকার অথবা বাচিক শিল্পীদের সম্মিলিত কোনো কোরাস! গেল ছয় মাসে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থমকে আছে। এর সঙ্গে যেন থমকে গেছে জীবনগাড়ির চাকাও। যদিও সংস্কৃতি কর্মীরা ভার্চুয়ালি নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাতে যেন ছন্দ নেই, নেই আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যও।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রংপুর শহরে সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত ১২০টি সংগঠনের প্রায় চার হাজার কর্মী রয়েছেন। যাদের মধ্যে ১৪ সংগঠন জোটভুক্ত। যারা ছয় মাস ধরে করোনা সংকটে সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি পড়েছেন সীমাহীন অর্থ সংকটে। এদের মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ের শিল্পীরা আরো প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রেসিডিয়াম সদস্য রাজ্জাক মুরাদ ভোরের কাগজকে বলেন, গান গেয়ে সংসার চালায় যন্ত্রী থেকে শুরু তবলচি তাদের পরিস্থিতি ভয়াবহ খারাপ। তাদের দিন কিভাবে কাটছে একমাত্র আল্লাই জানেন। এদের অনেককে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।

এ অবস্থা চলতে থাকলে এ অঙ্গনের ভবিষ্যৎ চিত্র কতোটা ভয়াবহ হবে তা ভেবে এখনই শিউরে উঠছি। হয়তো সংস্কৃতি চর্চাই থাকবে না। যাদের মধ্যে মাত্র ১৫০ জনকে মাত্র সরকারি প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পুণরায় সরকারি প্রণোদনা দেয়ার আহবান জানাচ্ছি।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার সংগীত ও যাত্রা শিল্পী আব্দুর রাজ্জাকের সংসারই চলে শিল্পচর্চা করে। কিন্তু এই শিল্পী গত ছয় মাস ধরেই বেকার আছেন। পাননি কোনো সরকারি প্রণোদনা। তিনি বললেন, করোনার কারণে সব বন্ধ। টেনে টুনে চলছি। বলতে পারেন আল্লায় চালাচ্ছে। শহর থেকে দূরে আছি বলে কেউ খোঁজও রাখে না! পরিবার নিয়ে কষ্টে পড়ে গেছি। লজ্জায় কাউকে বলতেও পারছি না!

রংপুর টাউন হল

সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও ক্রীড়া সংগঠন বাংলার চোখ-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তানবীর হোসেন আশরাফী বলেন, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পীরা সরকারি প্রণোদনা অনেকেই পাননি। যাদের পাওয়ার কথা তারা পায়। যারা এসি রুমে থাকে অধিকাংশ অর্থ সাহায্য তাদেরই হাতে গেছে। ঠিক অস্বচ্ছতা বলব না। বলব ক্ষতিগ্রস্তদের দিকে নজর দেয়া হয়নি।

মুক্তাঙ্গন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি ও সাংবাদিক মেরিনা লাভলী জানালেন, করোনার ধাক্কায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকার কারণে অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এমনকি শিল্পীরা অনেকে পেশা বদলও করছেন।

কারমাইকেল কাইজেলিয়া শিক্ষা সংস্কৃতি সংসদের (কাকাশিস) সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, করোনা ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি আমরা। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছি। তবে যারা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের অবস্থা বেহাল। তাদের অনেকে সরকারি প্রণোদনাই পাননি।

বীকন নাট্য কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মিজান তালুকদার বললেন, রংপুর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অফিস কার্যত বন্ধই রয়েছে। অন্য পেশায় থেকেও সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করছি। কিন্তু ছয় মাস ধরেই অফিস ভাড়া গুনতে হচ্ছে। যেখানে কাজের পরিধিই কমে গেছে, অনেকের বেতনও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেরই অবস্থা নাজুক। তার ওপর এ যেন মরার ওপর খাড়ার ঘা। তবে এর মধ্যেও কাউকে কাউকে প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। সরকারের এই সমর্থন বা সদিচ্ছা সংস্কৃতি কর্মীদের জন্য মাইলফলক। যদি ওই প্রণোদনা আরও বাড়ানো যায় রক্ষা পায় এ অঙ্গনের মানুষরা।

রংপুরের মঞ্চ, বেতার নাট্য নির্দেশক ও পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ জানান, মনের মধ্যে ভয়, উৎকণ্ঠা আর আশংকা। তবু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে নানা আয়োজনের চেষ্টা করছেন। অপেক্ষা করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার।

এ প্রসঙ্গে রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার নুজহাত তাবাসসুম রিমু বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রংপুরের ১৫০ জন শিল্পীর হাতে সরকারি প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। যারা সংস্কৃতি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যাছাই বাছাই করে তাদেরই ৫ হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে।

এমএইচ