বাংলাদেশের অবস্থান আবারো শীর্ষে

আগের সংবাদ

আরো ৯টি আঞ্চলিক অফিসে পাওয়া যাবে ই-পাসপোর্ট

পরের সংবাদ

করোনাকালের কড়চা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ , ৮:১২ অপরাহ্ণ

মহামারি আকার ধারণ করে মানবজাতি বিনাশে তৎপর এই করোনা ভাইরাস থেকে অনেক দেশ ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণে সাফল্য লাভ করেছে। যেটি আমরা পারিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সীমাহীন দায়িত্বহীনতা, দুর্নীতি, বাক-সর্বস্ব কথার বাহারে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছে। তাদের অপকীর্তি গোপন থাকেনি যেমন তেমনি সরকারের চরম ব্যর্থতার বিষয়টিও। সরকারি দলের লোকেরা করোনাকালে নানা উপায়ে অনৈতিক ব্যবসা ফাঁদিয়ে মুনাফার অবাধ বাণিজ্য চালিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যে ক’জন শনাক্ত ও আটক হলেও দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা যেমন বিস্তৃত তেমনি শক্ত-পোক্তও। বলির পাঁঠা হিসেবে ক’জন আটক হলেও সেটা যে এক প্রকার ‘আইওয়াগ’ সেটা কিন্তু দেশবাসীর বুঝতে কষ্ট হয়নি। ভুক্তভোগী দেশবাসী সবই বুঝেও নিশ্চুপ। কেবল নিজেদের ভাগ্যের পরিহাস বলেই ভাবছে।
দেশে যে একটি সরকার আছে এবং সরকারি দলের সাংসদ, মন্ত্রিপরিষদ আছে, আছে ছাত্র-যুবসহ অসংখ্য গণসংগঠন তারাও সবাই আত্মগোপনে চলে গেছে। মানুষের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় তাদের কারো তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। একমাত্র রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভূমিকা চোখে পড়েছে।
আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা কেবল সেকেলে নয়, পুরোপুরি ঔপনিবেশিক-আমলাতান্ত্রিক এবং গণবিরোধীও বটে। অপরদিকে রাজনৈতিক দলীয় সরকার কিন্তু দেশ-রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। দেশ-জাতির এই ক্রান্তিকালে সরকার আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যে দেশে সরকারের দৃশ্যমান প্রমাণ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক অব্যবস্থার শিকার হয়ে মানুষের দুরবস্থার অন্ত নেই। কিন্তু সরকার নির্লিপ্ত-নির্বিকার। যেন কথার ফানুস দিয়েই এই ক্রান্তিকালের অবসান তারা ঘটাতে সক্ষম হবে। সরকারের মন্ত্রী-নেতারাও নিরাপদে নেই। ইতোমধ্যে ক’জন করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনার ভয়ে সরকারের মন্ত্রী, সাংসদেরা আত্মগোপনে নিভৃতে চার দেয়ালে বন্দিত্ব জীবন কাটাচ্ছেন। দেশ বা দেশের মানুষের প্রতি যেন তাদের কোনো দায় নেই, নেই দায়িত্ব ও কর্তব্যও। রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রও যে জনগণের দুর্দশা লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটা সঠিক নয়। বরং বিদ্যমান ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র অতীত নিয়মেই জনগণের দুরবস্থা মোচন তো পরের কথা, বরং দুর্দশা বৃদ্ধিতে শোষকের ভূমিকায় চিরাচরিত নিয়মে অবতীর্ণ রয়েছে। সোজা ও সত্য কথাটি হচ্ছে দেশ-জাতির এই ক্রান্তিকালে দেশবাসী সরকার বা রাষ্ট্রপক্ষের কারো থেকে ন্যূনতম নাগরিক অধিকার, সুযোগ, সহানুভূতি কোনোটি পায়নি। বিদ্যমান ব্যবস্থা যতদিন অক্ষুণ্ণ থাকবে ততদিন দেশবাসীর নাগরিক অধিকার ও সুযোগের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হবে না। এজন্যই ব্যবস্থা বদল ভিন্ন বিকল্প উপায় আমাদের সামনে নেই। মানুষ যখন সব ক্ষেত্রে আস্থা, ভরসা হারিয়ে ফেলে তখন ধর্মের কাছে আশ্রয় খোঁজে। সুযোগটির যথার্থ ব্যবহার করতে পিছ পা হয়নি ধর্মান্ধ-মৌলবাদী গোষ্ঠী। ইতোমধ্যে নানা সূত্র থেকে জেনেছি আমাদের ধর্মীয় ব্যক্তিরা বলে বেড়াচ্ছেন, সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানুষের ইমানহানির কারণে আল্লাহর-গজব এই করোনা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা পাঠিয়েছেন। নূহ নবীর আমলের প্রলয়ের ঘটনাকে তুলনা করে মানুষের ইহজাগতিকতাকে তুলাধুনা করছেন। আস্থা-ভরসাহীন মানুষ নিরুপায়ে ধর্মের কাছেই নিজেদের সমর্পণ করে আস্থা-স্থল খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী কেন্দ্রীয় সরকার করোনাকালে নানা উছিলায় ধর্মকে টেনে আনছে। অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণেই নাকি করোনা ধ্বংস হবে। দেশে হাসপাতালের প্রয়োজন পড়বে না, মন্দির নির্মিত হলে। বহু অর্থ ব্যয়ে মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ তাই জোরেশোরে শুরু করেছে। পতঞ্জলির রামদেবকে মাদ্রাজ হাইকোর্ট ১০ লাখ রুপি জরিমানা করেছে। পতঞ্জলি গ্রুপের ‘করোনিল’ নামক বটিকাকে করানোর ওষুধ প্রচার করে মানুষ ঠকানোর অজুহাতে রামদেব দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। পতঞ্জলি গ্রুপের পতঞ্জলি অ্যালোভেরা জেল নামক রং ফর্সাকারী ওই জেল তৈরিতে গো-মূত্র মেশানোর কথাও পূর্বে রামদেব বলার পর ওই জেলের চাহিদা প্রচণ্ডভাবে হ্রাস পেয়েছে। পতঞ্জলি গ্রুপের পণ্যে গরুর মল-মূত্রের ব্যবহারের কথা স্বয়ং রামদেব মিডিয়ায় বলার পর প্রতিষ্ঠানটির পণ্য-বাজারে ধস নেমেছে।
আমাদের পার্শ্ববর্তী পশ্চিম বাংলাজুড়ে হিন্দু মৌলবাদীরা গরু নিয়ে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে করোনার অব্যর্থ ওষুধ রূপে গো-মূত্র জনতাকে পান করানোর ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে গেরুয়াধারী আরএসএস এবং বিজেপির কর্মীরা মিলে গরু নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গো-মূত্র পাত্রে নিয়ে সাধারণ মানুষের মুখে ঢেলে দিচ্ছে। এবং তারা এটাকেই করোনা রোগের উপশমের একমাত্র মহৌষধ দাবি করছে। ভঙ্গুর এবং অবাধ বাণিজ্যের চিকিৎসাসেবা নিতে অক্ষম অসহায় জনগণ নিরুপায়ে করোনা থেকে রক্ষা পেতে ওই ধর্মান্ধদের ক‚টচালে আত্মসমপর্ণে বাধ্য হচ্ছে। কেননা ভারতের রাষ্ট্র, সরকারও করোনা মোকাবিলায় আমাদের দেশের মতো সমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে হিন্দুত্ববাদকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে তৎপর হয়ে উঠেছে মোদি সরকার। ভারতের সচেতন মানুষ সরকারের ব্যর্থতার বিষয়ে প্রকাশ্যে আঙুল তুলেছে। দাবি করছে মন্দির নয় হাসপাতাল নির্মাণ করা হোক। অযোধ্যায় পাঁচ একর জায়গায় সুন্নি বোর্ড ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তাদের দেয়া ওই পাঁচ একর ভ‚মিতে তারা হাসপাতাল নির্মাণ করবে। এতে সুন্নি বোর্ডের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে দেশটির প্রগতিশীল-সচেতন নাগরিকরা। পাশাপাশি তারা সরকার কর্তৃক রাম-মন্দির নির্মাণের উদ্যোগকে সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকারের মন্দির নির্মাণের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কে শোনে কার কথা। নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে আমাদের সরকারের চেয়েও অধিক মাত্রায় তৎপর বিজেপি সরকার ধর্মের তুরুপের তাস প্রয়োগ করতে কসুর করছে না।
সারকথা হচ্ছে করোনাকালে আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার চরমভাবে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে এসেছে, এতে তো সন্দেহের অবকাশ নেই। করোনায় আক্রান্তরা সমাজে, পরিবারে এমনকি রাষ্ট্রের কাছেও ব্রাত্য। তাদের পাশে কেউ নেই। সবার একই চিন্তা ‘চাচা আপন পরাণ বাঁচা’। মানুষের সহজাত মানবিকতা বলে অবশিষ্ট কিছু থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে না। আমাদের সামষ্টিক সামাজিকতা করোনাকালে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে, করোনা থেকে রক্ষার উপায় হিসেবে। মানুষ একাকী বাঁচতে পারে না। মরতে পারে। কিন্তু বাঁচতে হলে তো সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হয়। সামাজিকতা তো মনুষ্য জীবনের প্রধান অবলম্বন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তো এমনিতেই মানুষের সামাজিক জীবনকে ক্রমাগত ভাঙছে। করোনা সেটিকে আরো শক্ত-পোক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে দিল। করোনা এবং পুঁজিবাদ যে এক এবং অভিন্ন তাতে তো সন্দেহ নেই। করোনার আগমন যে পুঁজিবাদের হাত ধরেই এসেছে সেটা তো অত্যন্ত নির্ভুল কথা। তাই পুঁজিবাদকে নির্মূল করা সম্ভব হলেই করোনার মতো সব ধরনের মনুষ্য ধ্বংসকারী মহামারির আগমন রোধ করা সম্ভব হবে। এছাড়া তো বিকল্প কোনো উপায় নেই। তাই সম্মিলিতভাবে পুঁজিবাদবিরোধী সংহতি যেমন জরুরি তেমনি পুঁজিবাদবিরোধী বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করে আন্দোলন গড়ে তোলাও অপরিহার্য।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।
[email protected]

ডিসি