দেশের নৃত্যশিল্পে নারী পাচারকারীদের থাবা

আগের সংবাদ

সরে দাঁড়ালেন বাদল রায়

পরের সংবাদ

সীমাহীন সংকটে বগুড়ার ১০ হাজার সংস্কৃতিকর্মী

শরীফা বুলবুল:

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ , ১০:২১ পূর্বাহ্ণ

স্থবির জেলাভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক নিদর্শন ও শিল্পের শহর বগুড়া। এখানে রয়েছে প্রাচীন বাংলার রাজধানী মহাস্থানগড়। আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী এই মহাস্থানগড়। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড পার্ক, ভাসু বিহার, বেহুলার বাসরঘর। বগুড়ার সাত মাথাকে শহরের প্রাণকেন্দ্র বলা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সাত সড়কের মিলিত স্থান এটি। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মিলনকেন্দ্রও এটি। এখানেই রয়েছে বগুড়া জিলা স্কুল, শহীদ খোকন পার্ক, জিপিও, সার্কিট হাউসসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর সবই যেন এখন চুপ! শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি কর্মকাণ্ডের প্রাণবন্ত এই শহরের সাত মাথায় এখন আর সংস্কৃতি কর্মীরা চায়ের কাপে ঝড় তোলেন না। ওঠে না সম্মিলিত কোরাসও! করোনা সবই থামিয়ে দিয়েছে। সীমিত পরিসরে সবকিছু খুলে দেয়া হলেও এখানে এখনো পৌরসভার অনুমতি মেলেনি! ফলে স্থবির হয়ে আছে এর সব কর্মকাণ্ড।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বগুড়া শহরে সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত ১৮০টি সংগঠনের প্রায় ১০ হাজার কর্মী। যাদের মধ্যে ৮০ সংগঠন জোটভুক্ত। যারা ৬ মাস ধরে অস্থিতিশীল এ পরিস্থিতিতে সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি সীমাহীন সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের শিল্পীদের জীবনধারণই কঠিন হয়ে পড়েছে এই দুর্যোগে। স্থবিরতা নেমে এসেছে সংস্কৃতি চর্চায়ও। সংশ্লিষ্টরা আরো বলেছেন, সরকার এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিভিন্ন সংগঠন এবং বিত্তবান শিল্পীরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের পাশে দাঁড়ালেও তা পর্যাপ্ত নয়।

জানতে চাইলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি তৌফিক হাসান ময়না ভোরের কাগজকে বলেন, বগুড়ায় সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই বন্ধ। যদিও আমরা ভার্চুয়ালি কিছু কিছু কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। ফলে এর সঙ্গে যুক্ত যাত্রা, আবৃত্তি, নাটক, বাউল গানের শিল্পীরা বেকার হয়ে গেছে। যাদের দ্বিতীয় পেশা নেই। আমরা সরকারের কাছে ১ হাজার জন দুস্থ শিল্পীদের একটা তালিকা দিয়েছিলাম। তাদের মধ্যে পেয়েছে মাত্র ৫০ জন।

প্রণোদনা পদ্ধতির সমালোচনা করে জোটের এই নেতা বলেন, বগুড়ায় ১০ হাজার সংস্কৃতি কর্মী রয়েছেন। যাদের অধিকাংশেরই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ নাজুক। এক্ষেত্রে প্রণোদনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত থাকলে পারলে যাদের অবস্থা প্রকৃত অর্থেই নাজুক তাদের অগ্রাধিকার দেয়া যেত।

তিনি বলেন, সারাদেশে সীমিত আকারে সবই খুলে দেয়া হয়েছে, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হোক। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারবে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তিনি বগুড়ার সংস্কৃতি কর্মীদের মিলনকেন্দ্র টিটু মিলনায়তন খুলে দেয়ারও আহ্বান জানান পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে।

চর্চা সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিচালক আবদুল আওয়াল বলেন, বগুড়ার সব সংগঠনেরই কার্যক্রম কার্যত বন্ধই। পৌর মেয়র টিটু মিলনায়তন খোলার অনুমতি দিচ্ছেন না বিধায় আমাদের সব কর্মকাণ্ড বন্ধ। অথচ মার্কেটে, বাজারে কোনো নজরদারি নেই। কেবল নজরদারি সংস্কৃতিতে কেন?

তিনি বলেন, অবশ্য সব বন্ধ থাকলেও সংগঠনের অফিস ভাড়া প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে।

বগুড়ার উচ্চারণ একাডেমির পরিচালক পলাশ খন্দকার বলেন, সারাদেশে সীমিত আকারে সবই খুলে দেয়া হলেও বগুড়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখনো লকডাউন। পৌরসভার আওতায় টিটু মিলনায়তন। যেটা সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। যেখানে অধিকাংশ সাংস্কৃতিক সংগঠনের অফিস। সেই টিটু মিলনায়তনই পৌর মেয়র বন্ধ রেখেছেন। ফলে সাংস্কৃতিক কর্মীদের নাভিশ্বাস উঠেছে।

এই সংস্কৃতিজন বলেন, প্রতিদিন সংগঠনে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও আসে। ৫ মাস ধরে শিশুরা গৃহবন্দি। বদ্ধ ঘরে থাকতে থাকতে তাদের মানসিক বৈকল্য শুরু হয়েছে। অন্তত দুদিনের জন্য হলেও সংগঠন খুলে দেয়া উচিত।

বগুড়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সাইদ সিদ্দিকী বলেন, ভার্চুয়ালি কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। মঞ্চে ওঠা দূরে থাক আমরা একত্রিতভাবে বসতে পারছি না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো অনুমতি মিলছে না। আমরাও ঝুঁকি নিতে চাই না। তবে জীবনের ঝুঁকিতে পড়ে গেছে এর সঙ্গে যুক্তরা।

বগুড়া লেখক চক্রের সভাপতি কবি ইসলাম রফিক বলেন, আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কবিতা পাঠের পাশাপাশি নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনের চেষ্টা করছি।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান দেয়া হয়েছে। তবে দেশের গ্রামগঞ্জে অসংখ্য লোকশিল্পী, বাউলশিল্পী, যাত্রাশিল্পী, পুতুল খেলনা বানায়- এমন অনেকে রয়েছেন, যাদের জীবনযাত্রা সংকটে। এদের জেলা শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে খুঁজে বের করে সরকার আর্থিকভাবে অনুদান দিলে উপকার হবে।

আমরা জোটের নেতারা নিজেরা কিছু অর্থ সংগ্রহ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল সাংস্কৃতিক কর্মী, যন্ত্রশিল্পী, বাউল, টেকনিক্যাল শিল্পী- যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।

গোলাম কুদ্দুস বলেন, জোটের নিজস্ব কোনো ফান্ড নেই। জোটের মধ্যে আর্থিকভাবে যারা সচ্ছল তারা কাজ করছেন। আমরা সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের দাবি জানিয়েছি।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকী বলেন, কর্মহীন শিল্পীদের প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। সংগঠন-প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকে অসচ্ছল শিল্পীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রায় ১০০ জন বাউলশিল্পীর তালিকা করেছিলাম- যারা সংকটে রয়েছেন। আমরা শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১ দিনের বেতন দিয়ে সামান্য সহায়তা করার চেষ্টা করেছি।

এমআই