সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়েই ঘূর্ণায়মান করোনা

আগের সংবাদ

চুরির গল্প থেকে এবার প্রতিশোধের কাহিনী

পরের সংবাদ

বহুরূপে রহস্যময়ী লুপা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ , ১০:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ , ২:২১ অপরাহ্ণ

বেরিয়ে আসছে একের পর এক কাহিনী

অগ্নি টিভির ম্যানেজিং ডিরেক্টর তিনি। আওয়ামী পেশাজীবী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক। নবচেতনা পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার তিনি। মোহনা টিভির সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার। শীর্ষ টিভির ডিরেক্টর এবং সাপ্তাহিক শীর্ষ সমাচার পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তিনি। বাংলাদেশ কবি পরিষদেরও সদস্য। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি থেকে মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে ছবিতে তার ফেসবুক প্রোফাইলে ছয়লাব। তিনি লুপা তালুকদার। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তুলে ধরেছেন এসব পরিচয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকা থেকে ৯ বছর বয়সি ফুল-বিক্রেতা শিশু জিনিয়াকে অপহরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার নাজমা আক্তার লুপা তালুকদার ওরফে লুপা বেগম (৪২) এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। কে এই লুপা তালুকদার? কী তার প্রকৃত পরিচয়? তার ক্ষমতার উৎসই বা কী? তিনি কি লেডি সাহেদ? এসব প্রশ্ন নিয়ে সর্বত্র চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

পুলিশ বলছে, লুপা একজন অপহরণকারী ও মাদকসেবী। ঢাবির টিএসসি থেকে শিশু জিনিয়া অপহরণের ঘটনায় গত সোমবার মধ্য রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে লুপা তালুকদারকে গ্রেপ্তার করে ডিবির রমনা জোনাল টিম। পরে তাকে ২ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এখন কারাগারে রয়েছেন তিনি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবির একাধিক সূত্র জানায়, লুপা তালুকদার ও তার মেয়ে দুজনেই মাদকাসক্ত। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন, তার ১৯ বছর বয়সি মেয়ে নদীর ওপর ভূতের আছর পড়েছে। আগুন ছাড়া থাকলেই জিন-ভূত ভর করে। এজন্য সব সময়ই তার হাতে সিগারেট কিংবা গাঁজার বিড়ি থাকত। তিনিও বসতঘরে জিন-ভূত মুক্ত রাখার জন্য নেশা করতেন। এছাড়া জিনিয়াকে দত্তক নেয়ার দাবি করলেও তার স্বপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেননি লুপা।

গোয়েন্দাদের ধারণা, জিনিয়াকে অপহরণের পেছনে লুপা ও তার মেয়ে নদীর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল। কারণ মেয়েটিকে নিয়ে তারা উঠেছিল রাজধানীর প্রেস ক্লাব সংলগ্ন নিউইয়র্ক হোটেলে। সেখানে ২৮ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করেন তারা। তারপর সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়

নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে জিনিয়ার নাম বদলে ফেলেন। এ বিষয়ে ডিবির রমনা জোনাল টিমের উপকমিশনার মো. আজিমুল হক গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা তাকে অপহরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করি। তবে জিজ্ঞাসাবাদে কখনো তিনি বলছেন, মেয়ের ভূত তাড়ানোর কাজে বা দত্তক নেয়ার জন্য জিনিয়াকে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেননি। আমরা ধারণা করছি, লুপা তালুকদার একজন অপহরণকারী।

পুলিশ বলছে, প্রতারণাও লুপার এক ধরনের পেশা। সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসএসসি পাস লুপা নিজেকে অগ্নি টিভির কর্ণধার পরিচয়ে অসংখ্য মানুষের কাছে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র বিক্রি করেও অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে পটুয়াখালীর ২ ব্যক্তির কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে লুপা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে গ্রামের বাড়িতে গৃহকর্মী হত্যার অভিযোগ রয়েছে। পরে রাজনৈতিক সহায়তায় ওই অভিযোগ থেকে মুক্তি পান তারা। পুলিশ ও পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গোলকালী গ্রামের বাসিন্দারা জানান, কাজের মেয়ে শাহিনুর লুপার স্বামীর ও ভাইয়ের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেলে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যার পর নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হলে লুপা তালুকদার, তার বাবা হাবিবুর রহমান নান্না মিয়া তালুকদার, দুই ভাই লিকন, লিটন ও স্বামীসহ ১১ জন অভিযুক্ত হন। পরে নিজেদের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকার প্রচার চালিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি নেন। ওই হত্যা মামলা চলাকালে আদালতের বাথরুমে স্ট্রোক করে মারা যান লুপার বাবা নান্না তালুকদার ও ভাই লিটন নেশাগ্রস্ত হয়ে মারা যান। বর্তমানে লুপার ভাই লিকন তালুকদার পারিবারিক বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাদের পরিবারের ৩ সদস্য ছিলেন শান্তি কমিটির সদস্য। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি দখলের পাশাপাশি বিভিন্ন চর দখল করে তারা বিপুল ভূসম্পত্তির মালিক বনে যান।

সূত্র জানায়, বহুবিবাহ ও মাদকাসক্ত হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লুপার তেমন যোগাযোগ নেই। সাংবাদিক পরিচয়ে লুপা বেপরোয়া জীবনযাপন করতেন। মোতালেব প্লাজার পেছনে একটি ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি। বছরখানেক আগে ওই বাসা থেকে এক ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়। তখন লুপা বলেছিলেন, ছেলে আত্মহত্যা করেছে।

এ বিষয়ে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সাইন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, আদর্শের জন্য রাজনীতি এ বিষয়টি এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। অধিকাংশই নানা সুবিধা পেতে রাজনীতিতে জড়াচ্ছেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধপ্রবণ মস্তিষ্কধারীরা সে সুযোগ নিতে গায়ে মুজিব কোর্ট জড়িয়ে নানা জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন ও দাপুটেদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে বাহবা নেয়াসহ নিজেদের দাপুটে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। এমন শাহেদ বা লুপাদের দৌরাত্ম্যরোধে আদর্শবান রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়